ইসলামী শরিয়াহ বা ফিকহে “রজম” শব্দটি একটি গুরুতর শাস্তির সাথে যুক্ত, যা প্রধানত “জিনা” (অবৈধ যৌন সম্পর্ক) এর মতো অপরাধের জন্য প্রয়োগ হয়।
সূচীপত্র
Toggleরজম অর্থ পাথর মারা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। এটি ইসলামের “হুদুদ” (নির্দিষ্ট শাস্তি) এর অংশ, যা আল্লাহর নির্দেশিত সীমা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে প্রণীত। তবে রজমের প্রয়োগ অত্যন্ত কঠোর শর্তসাপেক্ষ এবং ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে।
এই নিবন্ধে আমরা রজমের সংজ্ঞা, ইসলামী উৎস (কুরআন ও হাদিস), ফিকহী মতামত, ঐতিহাসিক প্রয়োগ, আধুনিক অবস্থা, বিতর্ক এবং ভুল ধারণাসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করব। রজম শুধু একটি শাস্তি নয়, এটি সমাজে নৈতিকতা রক্ষা, ন্যায়বিচার এবং রহমতের প্রতীক। কিন্তু আধুনিককালে এটি মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। চলুন বিস্তারিত জানি।
রজমের সংজ্ঞা ও ধারণা
রজম (আরবি: الرجم) হলো একটি শাস্তি যেখানে অপরাধীকে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুবরণ করানো হয়। ইসলামে এটি প্রধানত “জিনা” (অবৈধ যৌন সম্পর্ক) এর জন্য প্রযোজ্য, বিশেষ করে বিবাহিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। অবিবাহিতদের জন্য সাধারণত বেত্রাঘাত (১০০টি) নির্ধারিত। রজমের উদ্দেশ্য হলো সমাজ থেকে অসামাজিক কার্যকলাপ দূর করা এবং আল্লাহর নির্দেশিত সীমা রক্ষা করা।
ইসলামী দৃষ্টিকোণে, রজম কোনো নির্দয় শাস্তি নয়, বরং এটি “হুদুদুল্লাহ” (আল্লাহর সীমা) এর অংশ, যা সমাজকে পাপমুক্ত রাখে। তবে এর প্রয়োগের জন্য প্রমাণ অত্যন্ত কঠোর: চারজন সাক্ষী যারা অপরাধের সরাসরি চাক্ষুষ প্রমাণ দিতে পারেন, অথবা অপরাধী নিজে চারবার স্বীকারোক্তি দিলে। সন্দেহ (শুবুহাত) থাকলে শাস্তি স্থগিত হয়, যেমন হাদিসে বলা: “হুদুদকে সন্দেহের মাধ্যমে দূর করো।” এটি রহমতের উপর জোর দেয়, কারণ ইসলামে শাস্তির চেয়ে পাপ ক্ষমা ও তওবা প্রাধান্য পায়।
বাংলাদেশী প্রেক্ষাপটে, রজমের ধারণা প্রায়শই ভুল বোঝা যায়। অনেকে এটিকে “পুরনো যুগের শাস্তি” মনে করেন, যা আধুনিক আইনের সাথে সংঘর্ষ করে। কিন্তু ইসলামী আলেমরা বলেন, এটি শুধুমাত্র সম্পূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রযোজ্য, যেখানে সমাজ নৈতিকতার উচ্চতর স্তরে থাকে।
এই আর্টিকেলে আমরা এই বিধানগুলোর উৎস, প্রয়োগযোগ্য ক্ষেত্র এবং যেসব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা জুলুম (অন্যায়) সে বিষয়ে সহীহ সোর্স থেকে অবিকল টেক্সট সহ আলোচনা করব।
ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণে পর্যায়ক্রমিক বিধান

ইসলামের বিধানসমূহ সাধারণত ধাপে ধাপে এবং পর্যায়ক্রমে প্রবর্তিত হয়েছে। যেমন— মদ্যপান নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান একাধিক পর্যায়ে এসেছে, তেমনি ব্যভিচারের শাস্তিও ক্রমান্বয়ে নির্ধারিত হয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজকে হঠাৎ কঠোর শাস্তির মুখোমুখি না করে ধীরে ধীরে নৈতিক ও আইনগত সংস্কারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে কঠোর দণ্ড নয়; বরং সামাজিক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা অশ্লীল কাজ (ব্যভিচার) করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করো। তারা যদি সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদেরকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখো— যতক্ষণ না মৃত্যু এসে যায় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো পথ নির্ধারণ করে দেন।”
(সূরা নিসা: ১৫)
মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেন, এই আয়াতে উল্লেখিত ‘অন্য কোনো পথ’ (সাবিলা) দ্বারা পরবর্তীতে নির্ধারিত চূড়ান্ত শরয়ি শাস্তিকেই বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে এই শাস্তিগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়— অবিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য একশত বেত্রাঘাত এবং বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য রজমের বিধান।
এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে একটি সুস্পষ্ট হাদিসও বর্ণিত হয়েছে। উবাদা ইবনে সামেত (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
“আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো, আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের জন্য একটি পথ নির্ধারণ করেছেন। কুমার-কুমারীর জন্য একশত বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন; আর বিবাহিতদের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও রজম।”
(গ্রন্থের নাম: সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) অধ্যায়: ২৯/ দণ্ডবিধি (কিতাবুল হুদুদ) হাদীস নং: ৪৩২০ (অন্যান্য সংস্করণে ১৬৯০ বা ৪১৯১ হতে পারে); সুনানে আবু দাউদ (৪৪১৫), জামে তিরমিযী (১৪৩৪) এবং সুনানে ইবনে মাজাহ (২৫৫০))
এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ব্যভিচারের শাস্তি হঠাৎ প্রবর্তিত হয়নি; বরং সমাজকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে তা পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত হয়েছে এবং শেষপর্যায়ে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কুরআন, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রে রজমের বিধান:
কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
ক. কুরআন মfজীদ ও রজমের বিধান

উসুল-উল-ফিকহ বা কুরআন গবেষণায় ‘নাসখ’ একটি স্বীকৃত বিষয়। তিন প্রকার নাসখের বর্ণনা, ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আল-ইতকান ফী উলুমিল কুরআন’-এ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন:
- ১ম প্রকার: শব্দ ও হুকুম উভয়ই রহিত (নাসখ আল তিলাওয়াহ ওয়া আল হুকুম)।
- ২য় প্রকার: হুকুম রহিত কিন্তু শব্দ রয়ে গেছে (নাসখ আল হুকুম দুনা আল তিলাওয়াহ) – যেমন মদ্যপান বিষয়ক প্রাথমিক আয়াতসমূহ।
- ৩য় প্রকার: শব্দ রহিত কিন্তু হুকুম বলবৎ আছে (নাসখ আল তিলাওয়াহ দুনা আল হুকুক) – রজমের আয়াতটি এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি, তাতে সরাসরি ‘রজম’ শব্দ বা এই শাস্তির কোনো আয়াত লিখিত নেই। তবে এ বিষয়ে ইসলামের ইতিহাস ও হাদীস শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো:
১) মানসুখুত তিলাওয়াত (সূরা নূর ও সূরা আহযাব) [তিলওয়াত রহিত আয়াত]:
হযরত ওমর (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত যে, রজমের আয়াতটি নাযিল হয়েছিল এবং তা কুরআনের অংশ ছিল। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর হুকুমে এর ‘তিলওয়াত’ বা পাঠ করার বিধান রহিত হয়ে যায়, কিন্তু এর ‘হুকুম’ বা বিধানটি কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়েছে।
i. হযরত আয়েশা (রা:) বলেন –
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৩৬. বয়স্ক লোকে দুধ পান করলে।
২/১৯৪৪। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম সম্পর্কিত আয়াত এবং বয়স্ক লোকেরও দশ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা একটি সহীফায় (লিখিত) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে।
মাজাহ ১৯৪৪ সহীহুল বুখারী ১৪৫২, নাসায়ী ৩৩০৭, ২০৬২, মুয়াত্তা মালেক ১২৯৩, দারেমী ২২৫৩, তা’লীক ইবনু মাজাহ।
তাহকীক আলবানীঃ হাসান। উক্ত হাদিসের রাবী মুহাম্মাদ বিন ইসহাক সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন মাঈন ও আজালী বলেন, তিনি সিকাহ। আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, তিনি হাসানুল হাদিস। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, তিনি সালিহ। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৫০৫৭, ২৪/৪০৫ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

ii) হযরত ওমর (রা.) খুতবায় বলেছিলেন:
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৩০। অপরাধের (নির্ধারিত) শাস্তি
পরিচ্ছদঃ ৪. ব্যভিচারের জন্য বিবাহিতকে রজম করা
৪৩১০-(১৫/১৬৯১) আবূ তাহির ও হারমালাহ্ ইবনু ইয়াহইয়াহ্ (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর ইবনু খাত্তাব (রাযিঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিম্বারের উপর বসা অবস্থায় বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন এবং তার উপর কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়ের মধ্যে آيَةُ الرَّجْمِ (ব্যভিচারের জন্য পাথর নিক্ষেপের আয়াত) রয়েছে। তা আমরা পাঠ করেছি, স্মরণ রেখেছি এবং হৃদয়ঙ্গম করেছি। সুতরাং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যভিচারের জন্য রজম করার হুকুম বাস্তবায়ন করেছেন। তার পরবর্তী সময়ে আমরাও (ব্যভিচারের জন্য) রজমের হুকুম বাস্তবায়িত করেছি। আমি ভয় করছি যে, দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর কেউ এ কথা হয়তো বলবে যে, আমরা আল্লাহর কিতাবে (ব্যভিচারের শাস্তি) রজমের নির্দেশ পাই না। তখন আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত এ ফরয কাজটি পরিত্যাগ করে তারা মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর কিতাবে বিবাহিত নর-নারীর ব্যভিচারের শাস্তি رجم (পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা) এর হুকুম সাব্যস্ত। যখন সাক্ষ্য দ্বারা তা প্রমাণিত হয়, কিংবা গর্ভবতী হয়, অথবা সে নিজে স্বীকার করে।* (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২৭১, ইসলামিক সেন্টার ৪২৭১)
* এ আয়াতটি তিলাওয়াত মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে কিন্তু আয়াতটির হুকুম এখনো বহাল রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ
বুখারী ২৪৬২, ৩৪৪৫, ৩৯২৮, ৪০২১, ৬৮৩০, মুসলিম ১৬৯১, তিরমিযী ১৪৩২, আবূ দাঊদ ৪৪১৮, ইবনু মাজাহ ২৫৫৩, আহমাদ ১৫১, ১৫৫, মালেক ১৫৫৮, দারেমী ২৩২২।একই রকমের হাদিস মুসনাদে আহমাদে ৩৯১ এ উবাইদুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহর রেওয়াতে এসেছে।

ইমাম নববী (রহ.) ব্যাখ্যা করে উল্লেখ করেন যে, রহিত (নসখকৃত) আয়াতে এভাবে বলা হয়েছিল—
“الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة”
অর্থাৎ, কোনো বিবাহিত পুরুষ ও নারী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তবে তাদের অবশ্যই পাথর নিক্ষেপ করে শাস্তি দিতে হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই আয়াতের লফ্য বা পাঠ রহিত করা হয়েছে, কিন্তু এর হুকুম বা বিধান রহিত হয়নি; বরং তা শরিয়তে কার্যকর রয়েছে।
খলিফা উমর (রা.) যখন জনসমক্ষে রজমের বিধান ঘোষণা করেন, তখন উপস্থিত সাহাবিদের কেউই এর বিরোধিতা করেননি। বরং তাদের নীরব সম্মতিই প্রমাণ করে যে, রজমের বিধান সাহাবায়ে কিরামের কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সর্বসম্মত ছিল। কারণ, যদি তারা এতে কোনো শরয়ি ত্রুটি দেখতে পেতেন, তবে অবশ্যই তা সংশোধন করতেন।
উমর (রা.) তাঁর খুতবায় যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন— “আমি আশঙ্কা করি, ভবিষ্যতে কেউ এসে বলবে যে রজমের বিধান কুরআনে নেই”— তা পরবর্তীকালে বাস্তবেই ঘটেছে। তাঁর পরবর্তী সময়ে খারিজি গোষ্ঠীসহ কিছু ভ্রান্ত মতাবলম্বী রজমের বিধান অস্বীকার করে বসে। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, উমর (রা.)-এর এই আশঙ্কা খারিজিদের মাধ্যমেই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
উক্ত খুতবায় উমর (রা.) আরও বলেন— “যখন ব্যভিচারের সাক্ষ্য পাওয়া যাবে, অথবা নারী গর্ভবতী হবে, অথবা তারা নিজেরাই অপরাধ স্বীকার করবে— তখন শাস্তি প্রযোজ্য হবে।”
গর্ভধারণ প্রসঙ্গে উমর (রা.)-এর মত হলো— যদি কোনো নারী গর্ভবতী হয় অথচ তার কোনো স্বামী বা বৈধ মালিক না থাকে, তাহলে এই গর্ভধারণকেই ব্যভিচারের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার উপর রজমের বিধান কার্যকর হবে। ইমাম মালিক (রহ.) এই মতের পক্ষে ফতোয়া প্রদান করেছেন।
তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর মতে, শুধুমাত্র গর্ভধারণের ভিত্তিতে রজম প্রযোজ্য নয়। কারণ ইসলামী শরিয়তের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— “সন্দেহ থাকলে হুদুদ শাস্তি প্রয়োগ করা হয় না।”
টিকা: সহিহ বুখারী হাদিস নং ৬৮৩০ এর পাদটীকায় বলা হয়েছে,
খারেজী এবং কিছু মু‘তাযিলা সম্প্রদায় কোরআনে উল্লেখিত রজমের আয়াতকে অস্বীকার করে, যার তেলাওয়াত মানসুখ হলেও হুকুম অবশিষ্ট আছে।
আয়াতটি হলঃ الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة [আশ-শাইখু ওয়াশ-শাইখাতু ইযা ঝানায়া ফারঝুমুহুম আলবাত্তাহ”] (বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অর্থাৎ বিবাহিত পুরুষ-নারী ব্যভিচার করলে তাদের পাথর মেরে হত্যা করো)।
অথচ আয়াতটি কোরআনের অংশ এবং হুকুমটি অবশিষ্ট আছে এর অনেক প্রমাণ রয়েছে।
(১) আব্দুর রাজ্জাক ও ইমাম ত্ববারী ইবনে আববাসের সূত্রে বর্ণনা করেন: উমর (রাঃ) বলেন: سيجيء قوم يكذبون بالرجم
(২) সুনানে নাসায়ীতে ওবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনু উতবার সূত্রে উমর (রাঃ) এর হাদীস :
وأن ناسا يقولون ما بال الرجم وانما في كتاب الله الجلد ألا قد رجم رسول الله সাঃ
(৩) মুয়াত্তা মালেক সা‘য়ীদ বিন মুসায়্যিব এর সূত্রে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস :
إياكم أن تهلكوا عن آية الرجم أن يقول قائل لا أجد حدين في كتاب الله فقد رجم
(৪) বুখারীতে বর্ণিত ৬৮১৯ নং হাদীসে ইয়াহুদী পুরুষ ও একজন মহিলার রজমের ঘটনা। মায়েয বিন মালিকের রজমের ঘটনা, হাদীস নং ৬৮১৪, ৬৮২৪।
কেন এটি তিলাওয়াত রহিত করা হলো? (হিকমত)
উলামায়ে কেরাম এই নাসখ-এর (শব্দ নেই কিন্তু আইন আছে) পেছনে বেশ কিছু কারণ দর্শিয়েছেন:
- উম্মতের পরীক্ষা: আল্লাহ দেখতে চান মুমিনরা কি কেবল লিখিত কাগজের অনুসারী, নাকি তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং সাহাবীদের ইজমার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে।
- বিধানের কঠোরতা: রজম একটি অত্যন্ত কঠোর দণ্ড। মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমতে তিলাওয়াতের মাধ্যমে এই কঠোর শব্দগুলো কুরআনে স্থায়ীভাবে রাখেননি, কিন্তু ব্যভিচারমুক্ত সমাজ গড়তে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বিধানটি সুন্নাহর মাধ্যমে টিকিয়ে রেখেছেন।
২) কুরআনের বর্তমান আয়াত (অবিবাহিতদের জন্য)
কুরআনের যে আয়াতটি বর্তমানে লিখিত আছে (সূরা নূর, আয়াত: ২), সেটি মূলত অবিবাহিত ব্যভিচারীদের শাস্তির কথা বলে:
“ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত করো…” (সূরা নূর, আয়াত: ২)
এটি কুরআনে জিনার শাস্তির সবচেয়ে সরাসরি এবং স্পষ্ট বিধান। এখানে রজমের কোনো উল্লেখ নেই; বরং শাস্তি হলো ১০০টি বেত্রাঘাত, যা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য। কিছু আলেম (যেমন: তাফসীর মারিফুল কুরআন) বলেন যে, এটি অবিবাহিতদের জন্য, এবং বিবাহিতদের জন্য রজম হাদিস থেকে যোগ হয়েছে।
অর্থাৎ ইসলামী ফিকহবিদদের মতে, এই আয়াতটি অবিবাহিতদের জন্য, আর বিবাহিতদের ক্ষেত্রে সুন্নাহর দ্বারা রজমের বিধান নির্ধারিত।
খ. সুন্নাহ বা হাদীসের প্রমাণ

১. উবাদাহ বিন সামিত (রা.): বিবাহিতদের জন্য রজমের স্পষ্ট বিধান
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হুদুদ (১৬৯১এ); সুনান আবু দাউদ।
“عَنْ عُبَادَةَ بْنَ الصَّامِتِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خُذُوا عَنِّي خُذُوا عَنِّي قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا الْبِكْرُ بِالْبِكْرِ جَلْدُ مِائَةٍ وَنَفْىُ سَنَةٍ وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَرَجْمٌ”
অনুবাদ: “রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা আমার নিকট হতে আল্লাহর বিধান গ্রহণ কর, কথাটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দু’বার বললেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন, অবিবাহিত নারী-পুরুষকে একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন করতে হবে। আর বিবাহিত নারী-পুরুষকে রজম করতে হবে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫৫৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত ৭ম খণ্ড, হা/৩৪০২)।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
(মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫৫৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত ৭ম খণ্ড, হা/৩৪০২)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি রজমের বিধানের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। এটি দেখায় যে রজম শুধুমাত্র বিবাহিত (থায়্যিব বা মুহসান) ব্যক্তিদের জন্য, যখন অবিবাহিতদের জন্য বেত্রাঘাত এবং নির্বাসন। নবী (সা.) এর মাধ্যমে এটি আল্লাহর বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম এটিকে সহীহ বলে সংকলিত করেছেন, এবং এটি সকল মাজহাব (হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী) দ্বারা স্বীকৃত। এর উদ্দেশ্য সমাজে জিনার প্রতিরোধ।
২. মা’ইজ বিন মালিক (রা.): স্বীকারোক্তির উপর রজমের প্রয়োগ
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী (৬৮২৪); সহীহ মুসলিম (১৬৯১)।
“عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ جَاءَ مَاعِزُ بْنُ مَالِكٍ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ فَأَعْرَضَ عَنْهُ فَعَادَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ فَأَعْرَضَ عَنْهُ فَعَادَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ فَأَعْرَضَ عَنْهُ فَعَادَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ فَأَمَرَ بِهِ فَرُجِمَ”
অনুবাদ: “জাবির বিন সামুরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত: মা’ইজ বিন মালিক নবী (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি জিনা করেছি।’ নবী (সা.) মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি আবার বললেন, নবী আবার মুখ ফিরালেন। চতুর্থবারে নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি পাগল? তুমি কি বিবাহিত?’ তিনি বললেন, ‘না, বিবাহিত।’ তাহলে নবী (সা.) আদেশ দিলেন যে তাকে রজম করা হোক।”
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি রজমের প্রয়োগের একটি বাস্তব উদাহরণ। মা’ইজ বিবাহিত ছিলেন এবং স্বেচ্ছায় চারবার স্বীকার করেছেন। নবী (সা.) প্রথমে তাকে তওবা করার সুযোগ দেন, যা দেখায় যে রজম প্রয়োগে রহমতের উপর জোর। এটি প্রমাণ করে যে স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করা যায়, এবং প্রয়োগ শুধুমাত্র যখন স্পষ্ট প্রমাণ থাকে। ইমাম বুখারী এবং মুসলিম এটিকে সহীহ বলে সংকলিত করেছেন।
একই হাদিস আরও বর্ণনায় এসেছে –
বুরায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা মায়েয ইবনে মালেক (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমাকে পবিত্র করুন। তিনি বললেন, ‘আক্ষেপ তোমার প্রতি, চলে যাও, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তওবা কর’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি চলে গেলেন এবং সামান্য একটু দূরে গিয়েই পুনরায় ফিরে আসলেন এবং আবারও বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমাকে পবিত্র করুন। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবারও তাঁকে পূর্বের ন্যায় বললেন। এইভাবে তিনি যখন চতুর্থবার এসে বললেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা! আমি তোমাকে কোন্ জিনিস হতে পবিত্র করব? তিনি বললেন, যিনা হতে। তাঁর কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (ছাহাবাদেরকে) জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকটি কি পাগল’? লোকেরা বলল, না তো? তিনি পাগল নন। তিনি আবার বললেন, ‘লোকটি কি মদ পান করেছে’? তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তাঁর মুখ শুঁকে দেখেন; কিন্তু মদের কোন গন্ধ তাঁর মুখ হতে পাওয়া গেল না। অতঃপর তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যই যিনা করেছ’? তিনি বললেন, জি হ্যাঁ। এরপর তিনি রজমের নির্দেশ দিলেন, তখন তাঁকে রজম করা হল। এই ঘটনার দুই/তিন দিন পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (ছাহাবাদের সম্মুখে) এসে বললেন, তোমরা মায়েয ইবনে মালেকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। কেননা সে এমন তওবাই করেছে, যদি তা সমস্ত উম্মতের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়, তবে তা সকলের জন্য যথেষ্ট হবে।
(মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫৬২)।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৩. গামেদিয়া (রা.): গর্ভবতী নারীর উপর রজম
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম (১৬৯৫); সহীহ বুখারী (৬৮৩০)।
“عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ أَتَتْ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهِيَ حُبْلَى مِنَ الزِّنَا فَقَالَتْ يَا نَبِيَّ اللَّهِ أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَيَّ فَدَعَا نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلِيَّهَا فَقَالَ أَحْسِنْ إِلَيْهَا فَإِذَا وَضَعَتْ فَأْتِنِي بِهَا فَفَعَلَ فَأَمَرَ بِهَا نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَشُدَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَرُجِمَتْ”
অনুবাদ: “ইমরান বিন হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত: জুহাইনাহ গোত্রের এক নারী নবী (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আমি হদ (জিনা) করেছি, আমার উপর হদ কায়েম করুন।’ তিনি গর্ভবতী ছিলেন। নবী (সা.) তার অভিভাবককে বললেন, ‘তার সাথে ভালো ব্যবহার করো, সন্তান জন্মের পর তাকে নিয়ে এসো।’ জন্মের পর নিয়ে আসলে নবী (সা.) আদেশ দিলেন যে তার কাপড় শক্ত করে বেঁধে রজম করা হোক।”
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি দেখায় যে গর্ভধারণও জিনার প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় যদি স্বীকারোক্তি থাকে বা স্বামী অস্বীকার করে। নবী (সা.) শিশুর জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং শাস্তির পর তার জানাযা পড়ান, যা দেখায় যে রজম পাপের ক্ষমা করে। এটি মালেকী মাজহাবে গর্ভধারণকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের ভিত্তি।
একই রকম বর্ণনা আরও এসেছে –
…… অতঃপর আয্দ বংশের গামেদী গোত্রীয় একটি মহিলা এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমাকে পবিত্র করুন। তিনি বললেন, তোমার প্রতি আক্ষেপ! চলে যাও, আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার কর এবং তওবা কর। তখন মহিলাটি বলল, আপনি মায়েয ইবনে মালেককে যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাকেও কি সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান? দেখুন, আমার এই গর্ভ যিনার! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি (সত্যই গর্ভবতী)? মহিলাটি বলল, জি হ্যাঁ।
অতঃপর তিনি বললেন, যাও, তোমার পেটের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আনছারী এক লোক মহিলাটির সন্তান প্রসব হওয়ার সময় পর্যন্ত তাকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে গেলেন। সন্তান প্রসব হওয়ার পর ঐ লোকটি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে বলল, হুযুর! গামেদী মহিলাটির গর্ভ খালাছ হয়ে গিয়েছে। এবার তিনি বললেন, এই শিশু বাচ্চাটিকে রেখে আমরা মহিলাটিকে রজম করতে পারব না। এমতাবস্থায় যে, তাকে দুধ পান করাবার মত কেউই নেই। এমন সময় আর একজন আনছারী দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমিই তার দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করব। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তাকে রজম করলেন ।
অন্য এক রেওয়ায়াতে আছে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মহিলাটিকে বললেন, ‘তুমি চলে যাও এবং সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর’। অতঃপর সন্তান প্রসবের পর যখন আসল, তখন বললেন, আবারও চলে যাও এবং তাকে দুধ পান করাও এবং দুধ ছাড়ান পর্যন্ত অপেক্ষা কর। পরে যখন বাচ্চাটির দুধ খাওয়া বন্ধ হয়, তখন মহিলাটি বাচ্চার হাতে এক খণ্ড রুটির টুকরা দিয়ে তাকে সঙ্গে করে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হল। এইবার মহিলাটি বলল, হে আল্লাহর নবী! এই দেখুন (বাচ্চাটির) দুধ ছাড়ান হয়েছে, এমনকি সে নিজের হাতের খানাও খেতে পারে। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বাচ্চাটিকে একজন মুসলমানের হাতে তুলে দিলেন। পরে মহিলাটির জন্য গর্ত খোঁড়ার নির্দেশ দিলেন। অতএব তার জন্য বক্ষ পর্যন্ত গর্ত খনন করা হল। তৎপর লোকদেরকে নির্দেশ করলেন, তারা মহিলাটিকে রজম করল। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তার মাথায় একখণ্ড পাথর নিক্ষেপ করতেই রক্ত ছিটে এসে তাঁর মুখমণ্ডলের উপর পড়ল। তাই তিনি মহিলাটিকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করে গাল-মন্দ করলেন। (এটা শুনে) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে খালেদ, থাম! সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! মহিলাটি এমন (খালেছ) তওবা করেছে, যদি কোন বড় যালেমও এই ধরনের তওবা করে, তারও মাগফেরাত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি তার জানাযা পড়ার আদেশ করলেন। অতঃপর তার জানাযা পড়লেন এবং তাকে দাফনও করা হল’।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
(মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫৬২)
আরও আছে –
বুলুগুল মারাম
১০ দণ্ড বিধি
পরিচ্ছেদ ০৮.
সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত গর্ভবতীর ‘রজম’ (পাথর নিক্ষেপ করা) বিলম্বিত করা
১২১২। ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
জুহাইনাহ গোত্রের কোন এক স্ত্রীলোক যিনার দ্বারা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থয় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকটে হাজির হয়ে বললঃ হে আল্লাহর নাবী! আমি হদ্দের উপযুক্ত হয়েছি, আপনি আমার উপর যিনার হদ্দ ক্বায়িম করুন । নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ওয়ালীকে (অভিভাবককে) ডাকালেন ও বললেন, তার সাথে ভাল ব্যবহার কর, সন্তান প্রসব করলে আমার নিকট তাকে নিয়ে এসো।
অভিভাবক তাই করলো (সন্তান প্রসব করার পর তাকে নাবীর দরবারে নিয়ে এলো); রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পরনের কাপড় শক্ত করে বেঁধে দিতে আদেশ করলেন, তারপর তার আদেশক্রমে তাকে রজম করা হলো। তারপর তার জানাযা নামায পড়ালেন।উমার (রাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর নাবী! সে ব্যভিচার করেছে তবু আপনি তার জানাযা নামায পড়লেন? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বলেনঃ সে তো এমন তাওবাহ করেছে যে, যদি তা মাদীনাসীর ৭০ জনের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয় তবে তাদের জন্য তার এ তাওবাহ যথেষ্ট হয়ে যাবে। (হে উমার!) তুমি কি এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কোন ব্যক্তি পেয়েছ? যে স্বয়ং আল্লাহর জন্য প্রাণ বিসর্জন করেছে।
– সহীহ মুসলিম (১৩১৯), মুসলিম ১৬৯৬, তিরমিযী ১৪৩৫, নাসায়ী ১৯৯৭, আবূ দাঊদ ৪৪৪০, ইবনু মাজাহ ২৫৫৫, আহমাদ ১৯৩৬০, ১৯৪০২, দারেমী ২৩২৫।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি ইসলামি পারিবারিক আইন ও দণ্ডবিধির একটি মৌলিক ভিত্তি। এর দুটি প্রধান দিক রয়েছে:
- সন্তানের বৈধতা: কোনো বিবাহিত নারী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং সন্তান জন্ম দেয়, তবে সেই সন্তান আইনত তার স্বামীর বলেই গণ্য হবে (যদি না স্বামী নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তা অস্বীকার করেন)। অর্থাৎ, জেনার মাধ্যমে সন্তানের বংশপরিচয় নষ্ট হতে দেওয়া হয় না।
- ব্যভিচারীর শাস্তি: “জিনাকারীর জন্য পাথর” (Al-Hajar) বাক্যটি দ্বারা উলামায়ে কেরাম ‘রজম’ বা পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ডকে বুঝিয়েছেন। এটি একটি রূপক এবং সরাসরি অর্থ—উভয়ভাবেই রজমের বিধানকে সমর্থন করে। ইমাম বুখারী (রহ.) এই হাদিসটিকে ‘রজম’ অধ্যায়ে সংকলন করে প্রমাণ করেছেন যে, বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তিই হলো রজম।
৪. হাদিস আবু হুরায়রাহ (রা.) এর বর্ণনা
শিশু স্বামীর এবং জিনাকারীর জন্য পাথর:
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম (১৬৯৫); সহীহ বুখারী।
“عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ”
অনুবাদ: “নবী (সা.) বলেছেন: ‘শিশু বিছানার (স্বামীর) জন্য, আর জিনাকারীর জন্য পাথর।'”
ব্যাখ্যা: এটি রজমের সাধারণ নির্দেশ। এর অর্থ যে, অবৈধ সন্তান স্বামীর বলে গণ্য হয়, কিন্তু জিনাকারীকে রজম করা হয়। এটি দেখায় যে রজম জিনার প্রতিরোধক।
রাসূল সা: এর ব্যভিচার সংক্রান্ত বিধান কার্যকরের আর কিছু উদাহরণ:
সহিহ বুখারী
হাদিস নম্বর ২৭২৪
আবূ হুরায়রা ও যায়দ ইব্নু খালিদ জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তাঁরা বলেন, এক বেদুঈন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনাকে আল্লাহ্র শপথ দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহ্র কিতাব মত ফয়সালা করুন।’ তখন তার প্রতিপক্ষ, যে তার তুলনায় বেশি জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন সে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি আমাদের মধ্যে আল্লাহ্র কিতাব মত ফয়সালা করুন এবং আমাকে বলার অনুমতি দিন।’ আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘বল’। সে বলল, আমার ছেলে এর নিকট মজুর ছিলো। সে তার স্ত্রীর সঙ্গে যিনা করেছে। আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, আমার ছেলের প্রাপ্য দণ্ড হল রজম। তখন আমি তাকে (ছেলেকে) একশ’ বকরী এবং একটি বাঁদীর বিনিময়ে তার নিকট হতে ছাড়িয়ে এনেছি। পরে আমি আলিমদের জিজ্ঞেস করলাম। তাঁরা আমাকে জানালেন যে, আমার ছেলের দণ্ড হল একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। আর এই লোকের স্ত্রীর দণ্ড হল রজম। আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, অবশ্যই আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করব। বাঁদী এবং একশ’ বকরী তোমাকে ফেরত দেয়া হবে। আর তোমার ছেলের শাস্তি একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। হে উনায়স! আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর নিকট যাবে। যদি সে স্বীকার করে তাহলে তাকে রজম করবে। রাবী বলেন, উনায়স (রাঃ) পরদিন সকালে সে স্ত্রীলোকের নিকট গেলেন। সে অপরাধ স্বীকার করল। তখন আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশে তাকে রজম করা হল।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
সহিহ বুখারী ২৭২৪, ২৭২৫
সহিহ বুখারী ৫২৭১
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর নিকট এল, তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। লোকটি তাঁকে ডেকে বলল, হে আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! হতভাগা ব্যভিচার করেছে। সে এ কথা দিয়ে নিজেকে বোঝাতে চাইল। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি যেদিকে ফিরলেন সে সেদিকে গিয়ে আবার বলল, হে আল্লাহ্র রসূল! হতভাগা ব্যভিচার করেছে। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অতঃপর সেও সে দিকে গেল যে দিকে তিনি মুখ ফিরালেন এবং আবার সে কথা বলল। তিনি চতুর্থবার মুখ ফিরিয়ে নিলে সেও সেদিকে গেল। যখন সে নিজের ব্যাপারে চারবার সাক্ষী দিল, তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে ডেকে বললেনঃ তুমি কি পাগল হয়েছ? সে বলল, না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাকে নিয়ে যাও এবং রজম কর। লোকটি ছিল বিবাহিত। (৬৮১৫, ৬৮২৫, ৭১৬৭; মুসলিম ২৯/৫, হাঃ ১৬৯১, আহমাদ ১৪৪৬৯) আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৮৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৮০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
সহিহ বুখারী ৫২৭০, ৫২৭১, ৫২৭২
৫. উমর (রা.): রজমের আয়াত এবং বিধানের ধারাবাহিকতা
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী (৬৮২৯); সহীহ মুসলিম।
“عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ عُمَرُ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ يَطُولَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ حَتَّى يَقُولَ قَائِلٌ لاَ نَجِدُ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ أَنْزَلَهَا اللَّهُ أَلاَ وَإِنَّ الرَّجْمَ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى وَقَدْ أَحْصَنَ إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَمْلُ أَوْ الاِعْتِرَافُ”
অনুবাদ: “উমর (রা.) বলেছেন: ‘আমি ভয় করি যে সময়ের সাথে সাথে লোকেরা বলবে, আমরা কুরআনে রজম পাই না, এবং তারা আল্লাহর ফরজ পরিত্যাগ করে পথভ্রষ্ট হবে। রজম হক, যে বিবাহিত ব্যক্তি জিনা করে, যদি প্রমাণ থাকে, গর্ভধারণ হয় বা স্বীকারোক্তি থাকে।'”
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি দেখায় যে রজমের একটি আয়াত কুরআনে ছিল, কিন্তু টেক্সট অবরোহিত হয়েছে, কিন্তু বিধান রয়ে গেছে। উমর (রা.) এটিকে সুন্নাহ থেকে নিশ্চিত করেন। এটি রজমের প্রমাণের তিনটি উপায় (সাক্ষী, গর্ভধারণ, স্বীকারোক্তি) নির্দেশ করে।
সুনানে তিরমিজিতে হযরত উমর (রা) এর এরকম আর একটি হাদিস এসেছে –
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ১৭/ দন্ডবিধি
পরিচ্ছেদঃ ‘রজম’-এর প্রমাণ।
১৪৩৭। আহমাদ ইবনু মানী (রহঃ) … উমার ইবনু খাত্তব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘রজম’-এর বিধান দিয়েছেন, আবূ বাকরও ‘রজম’-এর বিধান দিয়েছেন আর আমিও ‘রজম’-এর বিধান দিয়েছি। আল্লাহর কিতাবে অতিরিক্তকরণ যদি আমি হারাম মনে না করতাম তবে অবশ্যই আমি এই বিধানটি আল্লাহর কিতাবে লিখে দিতাম। কারণ আমি আশংকা করি (ভবিষ্যতে) একদল লোক হয়ত এমন আসবে তারা যখন ‘‘রজম’’-এর বিধান আল্লাহর কিতাবে পাবে না তখন তা অস্বীকার করে বসবে।
সহীহ, তা’লীক আলা ইবনু মাজাহ, ইরওয়া ৮/৫০৪, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৪৩১ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ। একাধিক সূত্রে এটি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণিত আছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)
একই রকমের হাদিস সহীহ বুখারী ৬৩৬২; মিশকাতুল মাসাবীহ ৩৫৫৯-(৫); বুখারী ৬৮৪১, মুসলিম ১৬৯৯, আবূ দাঊদ ৪৪৪৯, আহমাদ ৪৪৯৮ এ পাওয়া যায়।
৬. তাওরাত থেকে রজমের নিশ্চিতকরণ
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী (৬৮১৯)।
“عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ يَهُودِيًّا وَيَهُودِيَّةً أُتِيَا بِهِمَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ زَنَيَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا تَجِدُونَ فِي التَّوْرَاةِ لِمَنْ زَنَى قَالُوا نُسَوِّدُ وُجُوهَهُمَا وَنُحَمِّلُهُمْ قَالَ ائْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاقْرَءُوهَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ فَجَاءُوا بِهَا فَقَرَءُوهَا حَتَّى إِذَا مَرُّوا بِآيَةِ الرَّجْمِ وَضَعَ الْيَهُودِيُّ يَدَهُ عَلَيْهَا فَقَالَ ابْنُ صُورِيَّا ارْفَعْ يَدَكَ فَإِذَا آيَةُ الرَّجْمِ تَحْتَ يَدِهِ فَأَمَرَ بِهِمَا فَرُجِمَا”
অনুবাদ: “ইবন উমর (রা.) থেকে: এক ইহুদী পুরুষ এবং নারী নবী (সা.) এর কাছে আনা হয় যারা জিনা করেছে। নবী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাওরাতে জিনার বিধান কী?’ তারা বলল, ‘মুখ কালো করে এবং লজ্জা দেওয়া।’ নবী বললেন, ‘তাওরাত নিয়ে এসো।’ তারা পড়তে শুরু করলে রজমের আয়াতে হাত রাখল। ইবন সুরিয়া বললেন, ‘হাত সরাও।’ তাহলে রজমের আয়াত দেখা গেল। নবী (সা.) আদেশ দিলেন যে তাদের রজম করা হোক।”


একই রকমের বর্ণনা, মুয়াত্তা মালিকেও এসেছে –
গ্রন্থের নামঃ মুয়াত্তা মালিক
অধ্যায়ঃ ৪১. হুদুদের অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রস্তরাঘাত করা
রেওয়ায়ত ১. আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রাঃ) বলেন, ইহুদীদের একদল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট আসিয়া বলিল, তাহাদের একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক ব্যভিচারে লিপ্ত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন : রজম বা প্রস্তরাঘাতের ব্যাপারে তাওরাতে কি আদেশ রহিয়াছে? তাহারা বলিলঃ আমরা ব্যভিচারকারীকে লজ্জিত করি এবং বেত্ৰাঘাত করিয়া থাকি। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলিলেন, তোমরা মিথ্যা বলিতেছ। তাওরাতে প্রস্তরাঘাতের শাস্তি রহিয়াছে। তাওরাত আনয়ন কর, উহা পড়িয়া দেখ। অতঃপর তাহারা তাওরাত খুলিল এক ব্যক্তি বেত্রাঘাতের উপর হাত রাখিয়া পূর্বাপর অবশিষ্ট আয়াত পড়িয়া শুনাইল। আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাহাকে বলিলঃ তোমার হাত উঠাও তো। সে তাহার হাত উঠাইলে দেখা গেল উহাতে প্রস্তরাঘাতের আয়াত রহিয়াছে। অতঃপর সকল ইহুদীই স্বীকার করিল যে, আবদুল্লাহ ইবন সালাম ঠিকই বলিয়াছে তাওরাতে প্রস্তাঘাতের আয়াত বিদ্যমান রহিয়াছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়কে প্রস্তরাঘাতের আদেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশে উভয়কে প্রস্তরাঘাত করা হইল। আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রাঃ) বলেনঃ আমি দেখিলাম, পুরুষটি ঐ নারীকে আঘাত হইতে রক্ষা করিতে তাহার উপর ঝুঁকিয়া পড়িতেছিল।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ উহার উপর ঝুঁকিয়া পড়িতেছিল অর্থ পুরুষ নিজে প্রস্তরাঘাত সহ্য করিয়াও ঐ নারীকে প্রস্তরাঘাত হইতে রক্ষা করিতে যাইয়া তাহার উপর উপুড় হইয়া পড়িয়ছিল।
হাদিসের মানঃ সহীহ;মুত্তাফাকুন আলাইহি: এই একই ঘটনা ইমাম বুখারী (হাদীস নং ৩৬৩৫) এবং ইমাম মুসলিম (হাদীস নং ১৬৯৯) তাঁদের কিতাবে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
একইরকম আরেকটি হাদিস পাওয়া যায় –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ২৩১৩. বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তাওরাত আন এবং পাঠ কর (সূরাহ আলে-‘ইমরান ৩ঃ ৯৩)
৪২০০। ইবরাহীম ইবনু মুনযির … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে এমন দু’জন পুরুষ ও মহিলা নিয়ে ইহুদীগণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উপস্থিত হল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, তোমাদের ব্যভিচারীদেরকে তোমরা কিভাবে শাস্তি দাও? তারা বলল, আমরা তাদের চেহারা কালিমালিপ্ত করি এবং তাদের প্রহার করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপের বিধান পাও না? তারা বলল, আমরা তাতে এতদ সম্পর্কিত কোন কিছু পাই না। তখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাত আন এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তা পাঠ কর।
এরপর তাওরাত পাঠের সময় তাদের পন্ডিত-পাঠক প্রস্তর নিক্ষেপ বিধির আয়াতের উপর স্বীয় হস্ত রেখে তা থেকে কেবল পূর্ব ও পরের অংশ পড়তে লাগল। রজমের আয়াত পড়ছিল না। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) তার হাতটি তুলে ফেলে বললেন, এটা কি? যখন তারা পরিস্থিতি বেগতিক দেখল তখন বলল, এটি রজমের আয়াত। অনন্তর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে রজম করার নির্দেশ দিলেন। এবং মসজিদের পার্শ্বে জানাযাগাহের নিকটে উভয়কে ‘রজম’ করা হল। ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, আমি সেই পুরুষটিকে দেখেছি যে নিজে মহিলার উপর উপুড় হয়ে তাকে প্রস্তরাঘাত হতে বাচানোর চেষ্টা করছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন উমর (রাঃ)
ব্যাখ্যা: এটি দেখায় যে, নবী (সা.) তাওরাতের রজমকে নিশ্চিত করে মুসলিমদের জন্যও গ্রহণ করেন। এটি রজমের ইজমা (সম্মতি) এর ভিত্তি।
৭. আব্দুল্লাহ ইবনে আওফ (রা) এর স্বীকারোক্তি
আল লু’লুওয়াল মারজান
অধায় : হুদুদ
হাদীস নং : ১১০৫
শায়বানী (রহ.) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু আবূ আওফা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রজম করেছেন কি? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, সূরায়ে নূর-এর আগে না পরে? তিনি বললেন, আমি অবগত নই। (বুখারী পর্ব ৮৬ অধ্যায় ২১ হাদীস নং ৬৮১৩; মুসলিম ২৯/৬, হাঃ ১৭০২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
(বুখারী পর্ব ৮৬ অধ্যায় ২১ হাদীস নং ৬৮১৩; মুসলিম ২৯/৬, হাঃ ১৭০২)
ব্যাখ্যা: এই হাদীসটির মাধ্যমে মূলত রজমের বিধানের অকাট্য প্রমাণ এবং সাহাবায়ে কেরামের সততা ও আমানতদারিতা ফুটে উঠেছে।
৮. আবু বকর ইবনে আবু শাইবা (রহ) থেকে খুনের শাস্তি স্বরূপ জরিমানার হাদিস
গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৯। কাসামাহ্ (খুন অস্বীকার করলে হলফ নেয়া), মুহারিবীন (লড়াই), কিসাস (খুনের বদলা) এবং দিয়াত (খুনের শাস্তি স্বরূপ জরিমানা)
হাদিস নম্বরঃ ৪২৬৭
৬. মুসলিম ব্যক্তির হত্যা কি অবস্থায় বৈধ
৪২৬৭-(২৫/১৬৭৬) আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন মুসলিমকে হত্যা করা বৈধ নয়, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল। কিন্তু তিনটি কাজের যে কোন একটি করলে (তা বৈধ)।
১. বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হলে; ২. জীবনের বিনিময়ে জীবন, অর্থাৎ কাউকে হত্যা করলে; ৩. এবং স্বীয় ধর্ম পরিত্যাগকারী, যে (মুসলিমদের) দল থেকে বিচ্ছিন্ন (মুরতাদ) হয়ে যায়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২২৮, ইসলামিক সেন্টার ৪২২৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহিহ মুসলিম ৪২৬৭
৯. জাবির ইব্নু ‘আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) এর স্বীকারোক্তি
সহিহ বুখারী ৫২৭২
যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
যুহরী (রহঃ) বলেন, জাবির ইব্নু ‘আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) থেকে যিনি শুনেছেন, তিনি আমাকে বলেছেন, রজমকারীদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। আমরা মাদীনাহ্র মুসল্লায় (অর্থাৎ ঈদগাহে) তাকে রজম করলাম। পাথর যখন তাকে অতিষ্ঠ করে তুলল, সে তখন পালিয়ে গেল। হাররায় আমরা তাকে পাকড়াও করলাম এবং রজম করলাম। অবশেষে সে মৃত্যু বরণ করলো। (৫২৭০; মুসলিম ২৯/৫, হাঃ ১৬৬১, আহমাদ ১৪৪৬৯) আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৮৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৮০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
সহিহ বুখারী ৫২৭০, ৫২৭১, ৫২৭২
১০. রজমের গুরুত্ব সংক্রান্ত হাদিস
মুসনাদে আহমাদ
মুসনাদে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) (উমারের বর্ণিত হাদীস)
পরিচ্ছেদঃ
৩৫২। আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) বলেন, উমার (রাঃ) একবার হজ্জ করলেন। ঐ সময় তিনি জন সমক্ষে একটা ভাষণ দিতে চাইলেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ বললেন, আপনার নিকট উচ্ছৃংখল জনতা উপস্থিত। এমতাবস্থায় আপনার ভাষণ দান মদীনায় আসা পর্যন্ত স্থগিত রাখুন। পরে তিনি যখন মদীনায় পৌছলেন, আমি তার নিকট মিম্বারের কাছেই উপস্থিত হলাম। শুনলাম, তিনি বলছেনঃ অনেকেই বলে থাকে, রজম আবার কী? আল্লাহর কিতাবে তো ব্যভিচারের শাস্তি হিসাবে কেবল বেত্ৰাঘাতেরই উল্লেখ রয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম (পাথর মেরে হত্যা) করেছেন এবং তার পরে আমরাও রজম করেছি। এমন আশঙ্কা যদি না থাকতো যে, মানুষ অভিযোগ তুলবে যে, উমার আল্লাহর কিতাবে এমন জিনিস সংযোজন করেছে, যা তাতে নেই, তাহলে আমি রজম সংক্রান্ত আয়াতটি যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে কুরআনে সংযোজন করতাম। (৩৯১ নং হাদীস দ্রষ্টব্য)
হাদিসের মানঃ সহিহ ।
১১. খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল
হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর আমলে রজম কার্যকর করার বহু ঘটনা হাদীস ও আসারের কিতাবে বর্ণিত আছে। হযরত আলী (রা.) যখন শরাহা নাম্মী (শারাহা আল হামদানিয়া) নামক এক নারীকে রজম করেন, তখন তিনি বলেছিলেন:
“আমি তাকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী চাবুক মেরেছি এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী রজম করেছি।” রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮১২।
গ. ইমামদের মতামত

চারটি প্রধান সুন্নি মাজহাবের (হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী) ইমামরা সর্বসম্মত যে রজম সুন্নাহভিত্তিক এবং মুহসান জিনাকারীদের জন্য ওয়াজিব, কিন্তু প্রয়োগের শর্ত অত্যন্ত কঠোর (চারজন সাক্ষী বা চারবার স্বীকারোক্তি)। তবে খারেজী এবং মুতাযিলাদের একটি ছোট অংশ এটি অস্বীকার করত।
নিম্নে প্রত্যেক ইমামের মতামত সহীহ ফিকহ গ্রন্থ থেকে রেফারেন্স, মূল আরবি টেক্সট (যেখানে উপলব্ধ) এবং ব্যাখ্যাসহ দেওয়া হলো। এগুলো ইজমা (সম্মতি) ভিত্তিক, এবং রজমের উদ্দেশ্য সমাজে নৈতিকতা রক্ষা, কিন্তু প্রয়োগ বিরল।
১. ইমাম আবু হানিফা (হানাফী মাজহাব, মৃ. ১৫০ হি./৭৬৭ সি.ই.)
ইমাম আবু হানিফা রজমকে মুহসান জিনাকারীদের জন্য ওয়াজিব মনে করেন, কিন্তু এটিকে সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের (সুরা নুর: ২) বেত্রাঘাতের বিধানের অবরোহন (পার্শিয়াল অ্যাব্রোগেশন) হিসেবে দেখেন। প্রমাণের জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী বা স্বীকারোক্তি দরকার, এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য অভিন্ন হতে হবে। তিনি ব্যানিশমেন্ট (নির্বাসন) যোগ করেন না, এবং গর্ভধারণকে স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেন না যদি রেপ বা সন্দেহ থাকে।
মূল: “فَإِنْ كَانَ الزَّانِي مُحْصَنًا فَحَدُّهُ الرَّجْمُ لِحَدِيثِ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ خُذُوا عَنِّي خُذُوا عَنِّي قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا الْبِكْرُ بِالْبِكْرِ جَلْدُ مِائَةٍ وَنَفْىُ سَنَةٍ وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَرَجْمٌ”
(অনুবাদ: যদি জিনাকারী মুহসান হয়, তাহলে তার হদ হলো রজম, উবাদাহ বিন সামিতের হাদিস অনুসারে… বিবাহিতের সাথে বিবাহিতের জন্য ১০০ বেত্রাঘাত এবং রজম।)
গ্রন্থ: বাদায়িউস সানায়ি ফিল তারতিবিশ শারায়ি (আল-কাসানী, হানাফী ফকিহ, মৃ. ৫৮৭ হি.), খণ্ড ৭, পৃ. ৩৩।
ব্যাখ্যা: ইমাম আবু হানিফা রজমকে সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের বিধানের অবরোহন হিসেবে দেখেন, কারণ কুরআনে বেত্রাঘাত উল্লেখিত, কিন্তু সুন্নাহ মুহসানদের জন্য রজম যোগ করে। তিনি সন্দেহ (শুবুহাত) থাকলে হুদুদ এড়িয়ে যাওয়ার উপর জোর দেন, যাতে শাস্তি বিরল হয়। প্রয়োগের জন্য সাক্ষীদের সাক্ষ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলে বাতিল।
২. ইমাম মালেক (মালেকী মাজহাব, মৃ. ১৭৯ হি./৭৯৫ সি.ই.)
ইমাম মালেক রজমকে মুহসান জিনাকারীদের জন্য অপরিহার্য মনে করেন এবং গর্ভধারণকে (যদি স্বামী অস্বীকার করে) প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেন। তিনি লাশিং বা বেত্রাঘাত এবং রজম যুক্ত করেন না, বরং রজমকে একমাত্র শাস্তি হিসেবে দেখেন। পুরুষদের জন্য নির্বাসন যোগ করেন, কিন্তু নারীদের জন্য না।
“قَالَ مَالِكٌ: الرَّجْمُ لِلْمُحْصَنِ الزَّانِي وَالزَّانِيَةِ إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَمْلُ أَوِ الْإِقْرَارُ وَلَا يُجْلَدُ مَعَ الرَّجْمِ وَيُنْفَى الرَّجُلُ وَلَا تُنْفَى الْمَرْأَةُ”
(অনুবাদ: ইমাম মালেক বলেন: মুহসান জিনাকারী পুরুষ ও নারীর জন্য রজম, যদি প্রমাণ থাকে, গর্ভধারণ হয় বা স্বীকারোক্তি থাকে। রজমের সাথে লাশিং যোগ হয় না, পুরুষকে নির্বাসিত করা হয় কিন্তু নারীকে না।)
গ্রন্থ: আল-মুদাওয়ানাহ (ইমাম মালেকের সংকলন, সংগ্রহকারী সাহনুন, মৃ. ২৪০ হি.), খণ্ড ১৫, পৃ. ৩০১।
ব্যাখ্যা: ইমাম মালেক মদীনার আমল (প্র্যাকটিস) এর উপর ভিত্তি করে রজমকে সমর্থন করেন। তিনি গর্ভধারণকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন (যা অন্য মাজহাবে বিতর্কিত), কিন্তু গর্ভকাল সাত বছর পর্যন্ত মেনে নেন যাতে নারীদের রক্ষা হয়। রজমের উদ্দেশ্য পাপের ক্ষমা এবং সমাজীয় শান্তি।
৩. ইমাম শাফেয়ী (শাফেয়ী মাজহাব, মৃ. ২০৪ হি./৮২০ সি.ই.)
ইমাম শাফেয়ী রজমকে সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের স্পেসিফিকেশন (তাখসীস) হিসেবে দেখেন, যা মুহসানদের জন্য। তিনি লাশিং এবং রজম কম্বাইন করেন (প্রথমে লাশিং, তারপর রজম), এবং সমকামিতা (লিওয়াত) কে জিনার অংশ হিসেবে দেখে রজম প্রয়োগ করেন। প্রমাণ: চার সাক্ষী যারা পেনিট্রেশন দেখেছে।
“الرَّجْمُ وَاجِبٌ عَلَى الْمُحْصَنِ الزَّانِي وَلَا يُجْلَدُ إِلَّا مَعَ الرَّجْمِ وَالْحُدُودُ تُقَامُ بِأَرْبَعَةِ شُهُودٍ عُدُولٍ يَشْهَدُونَ عَلَى الْفِعْلِ الْمُبَاشِرِ”
(অনুবাদ: রজম মুহসান জিনাকারীর উপর ওয়াজিব, এবং বেত্রাঘাত রজমের সাথে যোগ হয়। হুদুদ চারজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যে কায়েম হয় যারা সরাসরি অপরাধ দেখেছে।)
গ্রন্থ: আল-উম্ম (ইমাম শাফেয়ীর নিজস্ব গ্রন্থ), খণ্ড ৬, পৃ. ১৪৮।
ব্যাখ্যা: ইমাম শাফেয়ী সুন্নাহকে কুরআনের ব্যাখ্যাকারী হিসেবে দেখেন, যা লাশিংকে অবিবাহিতদের জন্য সীমাবদ্ধ করে। তিনি সমকামিতাকে জিনার অন্তর্ভুক্ত করে রজম প্রয়োগ করেন, কিন্তু সন্দেহে হুদুদ এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
৪. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (হাম্বলী মাজহাব, মৃ. ২৪১ হি./৮৫৫ সি.ই.)
ইমাম আহমাদ রজমকে কঠোরভাবে সমর্থন করেন এবং লাশিং এবং রজম কম্বাইন করেন। তিনি হিরাবাহ (রোড রবারি) এর সাথে জিনাকে যুক্ত করে রজম দেখেন যদি অপরাধ গুরুতর হয়। প্রমাণ: চার সাক্ষী বা স্বীকারোক্তি, এবং গর্ভধারণ প্রমাণ হিসেবে গণ্য।
সহীহ রেফারেন্স:
“الْمُحْصَنُ إِذَا زَنَى يُرْجَمُ وَيُجْلَدُ مَعَ الرَّجْمِ وَالْبَيِّنَةُ أَرْبَعَةُ شُهُودٍ أَوْ إِقْرَارٌ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ وَالْحَمْلُ بَيِّنَةٌ إِنْ أَنْكَرَ الزَّوْجُ”
(অনুবাদ: মুহসান যদি জিনা করে তাহলে রজম হয় এবং রজমের সাথে বেত্রাঘাত। প্রমাণ চারজন সাক্ষী বা চারবার স্বীকারোক্তি, এবং গর্ভধারণ প্রমাণ যদি স্বামী অস্বীকার করে।)
গ্রন্থ: আল-মুগনী (ইবন কুদামাহ, হাম্বলী ফকিহ, মৃ. ৬২০ হি.), খণ্ড ৯, পৃ. ৩৭।
ব্যাখ্যা: ইমাম আহমাদ হাদিসের লিটারাল ইন্টারপ্রিটেশনের উপর জোর দেন, যা রজমকে কঠোর করে। তিনি সন্দেহে হুদুদ স্থগিত করার নির্দেশ দেন, এবং রজমকে সমাজীয় ফাসাদ (অশান্তি) প্রতিরোধক হিসেবে দেখেন।
সারকথা
চার ইমাম সর্বসম্মত যে রজম মুহসান জিনাকারীদের জন্য, কিন্তু প্রয়োগের শর্ত (প্রমাণের কঠোরতা, সন্দেহ এড়ানো) দিয়ে এটিকে বিরল করেছেন। এটি সুন্নাহভিত্তিক, এবং ইজমা দ্বারা নিশ্চিত। আধুনিক আলেমরা (যেমন: ইউসুফ কারযাভী) বলেন যে বর্তমানে স্থগিত থাকা উচিত।
রজমের বিধান অস্বীকার করার পরিণতি:
ইসলামে ব্যভিচারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং একে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর মূল কারণ হলো— ব্যভিচার পারিবারিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে এবং সমাজের নৈতিক পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করে। এ ধরনের সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানরা সামাজিকভাবে নানাবিধ জটিলতা ও বঞ্চনার মুখে পড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পরিবার ও সমাজে অস্বস্তিকর ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
রজমের বিধান প্রয়োগের বিষয়ে রাসুল (সা:) এর স্পষ্ট হাদিস হচ্ছে যারা রজমের বিধান অস্বীকার করে তারা কাফের, জুলুমকারী, পথভ্রষ্ট এবং পাপাচারী।
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ২৬. দু’ ইয়াহুদীকে রজম করার ঘটনা
৪৪৪৮। আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, বেত্রাঘাতকৃত জনৈক ইয়াহুদীর মুখমন্ডল কালিমালিপ্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি তাদের ডেকে প্রশ্ন করলেনঃ তোমরা কি যেনাকারীর এরূপ শাস্তির হুকুম পেয়েছ? তারা বললো, হ্যাঁ। অতএব তিনি তাদের একজন আলিমকে ডেকে বললেনঃ তোমাকে সেই আল্লাহর কসম করে বলছি যিনি মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত কিতাব নাযিল করেছেন! তোমাদের কিতাবে যেনাকারীদের এরূপ শাস্তির কথা উল্লেখ পেয়েছে কি? সে বললো, হে আল্লাহ! না। আপনি যদি এ বিষয়ে আমাকে আল্লাহর কসম না দিতেন, তাহলে আমি অবশ্যই আপনাকে বলতাম না।
আমরা আমাদের কিতাবে যেনাকারীর শাস্তি রজমের উল্লেখ পেয়েছি। কিন্তু আমাদের অভিজাত সমাজে যেনার বিস্তার ঘটলে আমরা কোনো মর্যাদাসম্পন্ন লোককে এ অপরাধে ধরতে পারলেও ছেড়ে দিতাম; তবে দুর্বলদের কাউকে পেলে তার উপর শাস্তি বাস্তবায়িত করতাম। অতঃপর আমরা সকলকে আহবান করে বললাম, চলুন, আমরা যেনার শাস্তির ব্যাপারে সকলে ঐকমত্যে পৌঁছে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই, যাতে সকল শ্রেণীর লোকদের উপর তা বাস্তবায়িত করা যায়। অতঃপর আমরা এর শাস্তিস্বরূপ মুখমন্ডল কালিমালিপ্ত করে অপমান করা এবং বেত্রাঘাত করাতে একমত হই এবং ‘রজম’ পরিত্যাগ করি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আল্লাহ! আমিই প্রথম ব্যক্তি যে তোমার নির্দেশকে পুনর্জীবন দান করেছি, তারা একে প্রাণহীন করার পর। অতঃপর তাঁর নির্দেশে অপরাধীকে রজম করা হয়। অতঃপর মহান আল্লাহ ইয়াহুদীদের সম্পর্কে এ আয়াতগুলো নাযিল করেনঃ ‘‘হে রাসূল! তোমাকে যেন দুঃখ না দেয় যারা কুফরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয় … তারা বলে, তোমাদেরকে এরূপ বিধান দেয়া হলে তোমরা তা গ্রহণ করো অন্যথায় তোমরা বর্জন করো … আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফির (ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে) … আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই যালিম (ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে) … আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারা পাপাচারী’’ (সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪১-৪৭)। তিনি বলেন, এ আয়াতগুলো কাফির অবাধ্যদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।(1)
সহীহ।
(1). এর পূর্বেরটি দেখুন।
হাদিসের মানঃ সহিহ।
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)
আরও এসেছে –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
পরিচ্ছদঃ ২৩. রজম সম্পর্কে
৪৪১৮। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তার ভাষণে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন এবং তাঁর উপর কিতাব নাযিল করেছেন। আর তিনি তাঁর উপর যা নাযিল করেছেন, রজম সংক্রান্ত আয়াত তার অন্তর্ভুক্ত। আমরা তা পাঠ করেছি এবং সংরক্ষণ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম করেছেন আর আমরাও তাঁর পরে রজম করেছি। তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কাল প্রবাহের দীর্ঘতায় কেউ হয় তো বলবে, আমরা তো আল্লাহর নাযিলকৃত তিাবে রজমের আয়াত পাইনি।
ফলে তারা আল্লাহর নাযিলকৃত একটা ফরজ পরিত্যাগ করে পথভ্রষ্ট হবে। জেনে রাখো বিবাহিত নারী-পুরুষ ব্যভিচারের অপরাধে দায়ী প্রমাণিত হলে অথবা অন্তঃসত্তা হলে অথবা স্বীকারোক্তি করলে তাদেরকে রজম করা অবধারিত। আল্লাহর কসম! লোকেরা যদি একথা না বলতো যে, উমার আল্লাহর কিতাবে কিছু বর্ধিত করেছেন। তাহলে আমি অবশ্যই এ আয়াত লিখে দিতাম।(1)
সহীহ।
(1). বুখারী, মুসলিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ।
রজম কার্যকর করার কঠিন শর্তাবলী
ইসলামে রজমের শাস্তি কার্যকর করার জন্য কিছু কঠোর ও সুস্পষ্ট শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বপ্রথম, রজমের বিধান বাস্তবায়নের জন্য বিষয়টি এমন একজন শরয়ী বিচারকের নিকট উপস্থাপন করতে হবে, যিনি ইসলামি শাসনব্যবস্থার অধীনে হুদুদ প্রয়োগের আইনগত ক্ষমতা রাখেন। কারণ নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর যুগে এবং পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে সকল প্রকার হুদুদ শাস্তি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী শাসকদের মাধ্যমেই কার্যকর করা হয়েছে।
এছাড়া ইসলামে কাউকে এ ধরনের গুরুতর শাস্তির আওতায় আনার আগে তার জন্য তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং নিজের অপরাধ গোপন রাখাকে অধিকতর উত্তম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শরিয়তের উদ্দেশ্য শাস্তি কার্যকর করা নয়; বরং সমাজকে পাপ থেকে রক্ষা করা এবং অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো— যাঁর ওপর রজম প্রয়োগ করা হবে, তাকে অবশ্যই মুহসিন হতে হবে; অর্থাৎ তিনি বৈধ বিবাহের মাধ্যমে পূর্বে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও স্বাধীন ব্যক্তি হতে হবে।
অপরাধের নির্দিষ্ট প্রমাণ:
রজমসহ হদের শাস্তি কার্যকর হবে তখনই, যখন অপরাধ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। প্রমাণ হতে পারে:
- অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি
- নির্ভরযোগ্য সাক্ষীদের সাক্ষ্য
খলিফা উমরের (রা.) মতে, যদি কেউ বিবাহিত না থাকে এবং গর্ভধারণ করে, শুধুমাত্র গর্ভধারণকেই অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায়। মালিকি মাযহাবও এ মতের সঙ্গে একমত। তবে শাফিঈ, হানাফি ও অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে, শুধুমাত্র গর্ভধারণ যথেষ্ট নয়, কারণ সেখানে সন্দেহ থাকতে পারে।
সাক্ষ্য
যদি কেউ নিজে অপরাধ স্বীকার না করে, তবে চারজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষী অপরিহার্য। প্রত্যেক সাক্ষীকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে— কে, কখন, কোথায় এবং কীভাবে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিচারক তাদের চরিত্র যাচাই করবেন এবং সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন।
চারজনের কম সাক্ষী থাকলে, সাক্ষীরাই কাযফ বা মিথ্যা অপবাদের শাস্তির আওতায় আসবেন। এটি ইসলামের এমন নীতি প্রতিফলিত করে, যা রজমের শাস্তি প্রয়োগকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সাহাবি মাআযকে নবী ﷺ পরামর্শ দিয়েছিলেন: “তুমি যদি তাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও!”
স্বীকারোক্তি (ইকরার)
ইকরার হলো—কোনো ব্যক্তি নিজে তার অপরাধ স্বীকার করা, যা হদ প্রয়োগের যোগ্য। স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা শরয়ী বিচারকের নিকট স্পষ্টভাবে হতে হবে। অভিযুক্তকে জানাতে হবে কে, কোথায় এবং কীভাবে অপরাধ করেছে।
শাফিঈ মাযহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি একবার স্বীকার করলে হদ প্রযোজ্য। তাদের প্রমাণ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত যে নবী ﷺ স্বীকারোক্তিদাতাকে বারবার প্রশ্ন করতেন, যেন সে স্বীকার থেকে ফিরে না আসে। অন্য রেওয়ায়েতে একাধিকবার স্বীকারোক্তি করার কথাও উল্লেখ আছে।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি ঘটনা অনুযায়ী—সাহাবি আবু হুরায়রা ও যায়েদ বিন খালিদ বলেন, এক বেদুইন নবী ﷺ-এর নিকট এসে বলল:
“হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমাদের মধ্যে ফয়সালা করুন।”
তার প্রতিপক্ষও সম্মত হলো। পরে দেখা যায়, তার ছেলের উপর রজম নির্ধারিত হয়েছে। নবী ﷺ নির্দেশ দিলেন, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি পেলে তাকে রজম করা হবে। এই ঘটনা শাফেয়ী মাযহাব অনুসারীদের মতে একবারের স্বীকারোক্তি যথেষ্ট।
হানাফি মাযহাব অনুসারীদের মতে, চারটি পৃথক আসরে চারবার স্বীকারোক্তি নিতে হয়। প্রতিবার বিচারক তাকে ফিরিয়ে দেবেন। স্বীকারোক্তি স্থায়ী হলে হদ কার্যকর হবে; নাহলে মুক্তি দেওয়া হবে।
বিচারকের পরোক্ষ প্রশ্ন
যদি কেউ স্বীকারোক্তি করে, তবে বিচারক প্রায়শই তাকে সন্দেহ থেকে ফিরে আসার সুযোগ দিবেন। যেমন— “হয়ত তুমি শুধু চুমু খেয়েছ, হয়ত শুধু স্পর্শ করেছ” ইত্যাদি। সাহাবি মাআযের ঘটনা অনুযায়ী, নবী ﷺ তাকে বারবার প্রশ্ন করেছিলেন, এবং কেবল স্পষ্ট স্বীকারোক্তি পেলেই রজম প্রয়োগ করেছিলেন।
স্বীকারোক্তি ও তওবা
হাদিসে বলা হয়েছে, স্বীকারোক্তি প্রয়োজনীয় হলেও গোপনে তওবা করা উত্তম। কেউ যদি নিজের অপরাধ প্রকাশ করে, বিচারক হদ প্রয়োগ করবেন। উদাহরণস্বরূপ, সাহাবি মাআয ও গামিদিয়া নারী নিজেরাই রজম কার্যকর করতে চেয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলো দেখায়, হদ আরোপ একদিকে অপরাধের প্রতিকার, অন্যদিকে সংশোধনের উপায় হিসেবে কাজ করে।[৩৫–৩৯]
রজমের শাস্তিতে ইহসানের শর্ত
রজমের শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে ইহসান (আরবি: الإحصان) একটি মৌলিক ও অপরিহার্য শর্ত। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কেবল সেই ব্যভিচারীর উপরই রজম প্রযোজ্য, যিনি মুহসিন অবস্থায় রয়েছেন। ‘মুহসিন’ শব্দটি আরবি ‘ইহসান’ থেকে উদ্ভূত, যার মূল অর্থ হলো— সংযম অবলম্বন করা, রক্ষা করা ও নিষিদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ থাকা। ইসলামি পরিভাষায় ইহসান দ্বারা এমন এক বিবাহিত অবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যক্তি বৈধ উপায়ে নিজের লজ্জাস্থান সংরক্ষিত রেখেছেন।
ইহসান শব্দটি বিশেষভাবে নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যখন তারা ইসলাম, শালীনতা, স্বাধীনতা ও বৈধ বিবাহের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে। এমন নারীদের ‘মুহসিনা’ বলা হয়। একইভাবে, বৈধ স্ত্রীসহ একজন বিবাহিত পুরুষকেও ‘মুহসিন’ বলা হয়।
আল-ফাররা উল্লেখ করেন, আরবি ভাষায় ইহসান শব্দটি সচ্চরিত্রতা ও সংযম বোঝাতে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। কিছু আলেমের মতে কুরআনে উল্লিখিত ইহসান শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইসলাম গ্রহণও একটি শর্ত। তবে ইমাম নববি (রহ.) স্পষ্ট করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইহুদি নারী ও পুরুষের উপরও রজমের শাস্তি প্রয়োগ করেছেন; সুতরাং মুহসিন হওয়ার জন্য মুসলিম হওয়াকে শর্ত হিসেবে ধরা সর্বসম্মত নয়।
রজমের প্রয়োগে মুহসিনের পূর্বশর্ত
ইসলামের অন্যান্য দণ্ডবিধির মতোই রজমের শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও কিছু কঠোর ও অপরিহার্য শর্ত নির্ধারিত আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- বিবাহিত হওয়া:অভিযুক্ত ব্যক্তি অবশ্যই বৈধ বিবাহের মাধ্যমে বিবাহিত অবস্থায় যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে;
- সুস্থ হওয়া: সে সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং সচেতন ও বিবেকসম্পন্ন হতে হবে;
- চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী: ব্যভিচারের ঘটনা প্রমাণের জন্য চারজন বিশ্বস্ত পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক, যারা প্রত্যক্ষভাবে সুস্পষ্ট ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছে।
- স্বীকারোক্তি: বিকল্পভাবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো প্রকার চাপ বা প্ররোচনা ছাড়াই স্বেচ্ছায় নিজের অপরাধ স্পষ্টভাবে স্বীকার করলে তবেই বিষয়টি বিবেচনায় আসে।
রজমের প্রয়োগে উপযুক্ত প্রমাণের গুরুত্ব
ইসলামী আইন অনুযায়ী এই শাস্তি কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। উপযুক্ত প্রমাণ ব্যতীত রজম প্রয়োগ করা বৈধ নয়। এক্ষেত্রে সু্প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে –
সহিহ বুখারী
পরিচ্ছেদঃ ৬৮/৩১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি আমি যদি সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত রজম করতাম।
৫৩১০. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে লি‘আন করার ব্যাপারটি আলোচিত হল।‘আসিম ইবনু আদী (রাঃ) এ ব্যাপারে একটি কথা জিজ্ঞেস করে চলে গেলেন। এরপর তাঁর গোত্রের এক ব্যক্তি তার কাছে এসে অভিযোগ করল যে, সে তার স্ত্রীর সাথে অন্য এক লোককে পেয়েছে।
‘আসিম (রাঃ) বললেনঃ অযথা জিজ্ঞাসার কারণেই আমি এ ধরনের বিপদে পড়তাম। এরপর তিনি লোকটিকে নিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলেন এবং অভিযোগকারীর ব্যাপারটি তাঁকে জানালেন। লোকটি ছিল হলদে শীর্ণকায় ও সোজা চুল বিশিষ্ট। আর ঐ লোকটি যাকে তার স্ত্রীর কাছে পেয়েছে বলে সে অভিযুক্ত করে সে ছিল প্রায় কালো, স্থুল দেহের অধিকারী।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে আল্লাহ! সমস্যাটি সমাধান করে দিন। এরপর মহিলা ঐ লোকটির আকৃতি বিশিষ্ট সন্তান জন্ম দিল, যাকে তার স্বামী তার কাছে পেয়েছে বলে উল্লেখ করেছিল।নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের স্বামী-স্ত্রী উভয়কে লি‘আন করালেন।
একব্যক্তি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে সে মজলিসেই জিজ্ঞেস করলঃ এ মহিলা সম্বন্ধেই কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন? ‘‘আমি যদি কাউকে বিনা প্রমাণে রজম করতাম, তবে একেই রজম করতাম।’’ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেনঃ না, সে ছিল এক মহিলা, যে মুসলিম সমাজে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত থাকত। আবু সলিহ ও ‘আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফের বর্ণনায় آدَمَ خَدِلاً শব্দ এসেছে। (৫৩১৬, ৬৮৫৫, ৬৮৫৬, ৭২৩৮; মুসলিম ১৯/হাঃ ১৪৯৭, আহমাদ ৩৩৬০) (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৯১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮১৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ
সহিহ বুখারী ৫৩১০ (৫৩১৬, ৬৮৫৫, ৬৮৫৬, ৭২৩৮; মুসলিম ১৯/হাঃ ১৪৯৭, আহমাদ ৩৩৬০) (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৯১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮১৪)
আপনার বোঝার সুবিধার্থে এই হাদীসটির গভীর ব্যাখ্যা এবং প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো:
১. হাদীসের প্রেক্ষাপট ও লি’আন:
হাদীসটিতে ‘লি’আন’ নামক একটি বিশেষ শরয়ী পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে কিন্তু চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তখন পবিত্র কুরআনের (সূরা নূর: ৬-৯) নির্দেশ অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী উভয়কে আল্লাহর নামে কসম খেতে হয়। একেই ‘লি’আন’ বলা হয়। লি’আনের পর তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক চিরস্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২. “সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত রজম করতাম না” এর ব্যাখ্যা
এই হাদীসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সেই উক্তি: “আমি যদি সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত রজম করতাম...”। এর ব্যাখ্যা হলো:
- সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্ব: ইসলামি দণ্ডবিধিতে (হুদুদ) শাস্তি কার্যকর করার জন্য কেবল সন্দেহ বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করা যায় না। ব্যভিচারের শাস্তি (রজম) প্রদানের জন্য হয় অপরাধীর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি প্রয়োজন, অথবা চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রয়োজন।
- লি’আন বনাম রজম: যে মহিলার বিরুদ্ধে লি’আন করা হয়েছিল, তার সন্তানটি অভিযুক্ত ব্যক্তির চেহারার মতো হওয়ায় প্রবল ধারণা জন্মেছিল যে ব্যভিচার হয়েছে। কিন্তু যেহেতু সরাসরি কোনো সাক্ষী ছিল না এবং মহিলাটি নিজে স্বীকার করেনি, তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে পাথর মারার নির্দেশ দেননি। তিনি বুঝিয়েছেন যে, শরীয়তের আইন ‘প্রমাণ’ দ্বারা চলে, ‘ধারণা’ দ্বারা নয়।
- অন্য সেই মহিলার ঘটনা: ইবনে আব্বাস (রা.) স্পষ্ট করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যে মহিলার কথা বলেছিলেন যাকে তিনি বিনা প্রমাণে রজম করতে চেয়েছিলেন, তিনি লি’আন করা মহিলাটি ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন এমন এক মহিলা (সম্ভবত উম্মে কুরফা বা অন্য কেউ), যার ব্যভিচার সমাজে ওপেন-সিক্রেট বা জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছিল, কিন্তু আদালতে শাস্তি দেওয়ার মতো আইনি সাক্ষী তখনও পাওয়া যায়নি।
৩. হাদীসের শিক্ষা ও আইনগত গুরুত্ব
এই হাদীসটি থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি শিখতে পারি:
- সুবিচার ও সতর্কতা: ইসলামি আইনে বিচারক ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত হলেও প্রয়োজনীয় আইনি সাক্ষী বা প্রমাণ না থাকলে শাস্তি দিতে পারেন না।
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সম্মান: কারো চেহারা কারো মতো হওয়া ব্যভিচারের অকাট্য দলিল হতে পারে না, যতক্ষণ না শরয়ী সাক্ষী পাওয়া যায়।
- জনশ্রুতি বনাম আইন: কোনো ব্যক্তি লোকমুখে বিতর্কিত হলেও আইনগত ভিত্তি ছাড়া তার ওপর হদ (শাস্তি) প্রয়োগ করা জায়েজ নেই।
জিনার অভিযোগের শাস্তি
“وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ” (২৪:৪)
অনুবাদ: “যারা পবিত্র নারীদের প্রতি অভিযোগ করে এবং চারজন সাক্ষী না আনে, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং তাদের সাক্ষ্য কখনো গ্রহণ করো না। এরা তো ফাসেক।”
ব্যাখ্যা: এটি জিনার অভিযোগের জন্য প্রমাণের কঠোরতা দেখায় (চার সাক্ষী), যা রজমের প্রমাণের সাথে সম্পর্কিত। যদি চার সাক্ষী না থাকে, তাহলে অভিযোগকারী শাস্তি পায়। এটি দেখায় যে কুরআন জিনার প্রমাণকে অত্যন্ত কঠিন করে রেখেছে, যাতে রজমের মতো কঠোর শাস্তি সহজে প্রয়োগ না হয়।
রজম বাতিল হওয়ার কারণ
যদি অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তবে রজমসহ সকল হুদুদ বাতিল হয়ে যায়। এ কারণে বিচারক সর্বদা এমন প্রমাণ ও পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেন, যা অভিযুক্তকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। শরিয়তের দৃষ্টিতে হুদুদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সন্দেহ থাকলে শাস্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকাই নীতিগত নির্দেশ।
ব্যভিচার প্রমাণের জন্য চারজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষী আবশ্যক। সাক্ষীর সংখ্যা কম হলে বা কারো চরিত্রে সন্দেহ থাকলে অভিযুক্তের ওপর হদ কার্যকর হবে না; বরং সাক্ষীদের ওপর কাযফ (মিথ্যা অপবাদ) এর শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, সাধারণ মুসলমানদেরও কর্তব্য হলো—সন্দেহ থাকলে হুদুদ কার্যকরের পথ রুদ্ধ করা, উপদেশের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা এবং অপরাধ গোপন রাখা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষও গোপন রাখবেন।”
তবে যদি কেউ নির্লজ্জভাবে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করতে থাকে এবং অপরাধ সমাজে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তখন তা গোপন রাখা আর বৈধ থাকে না।
হাদিসে যথাসম্ভব হুদুদ এড়িয়ে চলার নির্দেশ এসেছে –
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“মুসলমানদের থেকে হুদুদ যতটা সম্ভব দূরে রাখো। যদি মুক্তির কোনো পথ পাও, তবে তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ শাসকের জন্য ক্ষমায় ভুল করা, শাস্তিতে ভুল করার চেয়ে উত্তম।”[সুনান আত-তিরমিজি, প্রকাশক: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, শিরোনাম: কিতাবুল হুদুদ আন রাসূলিল্লাহﷺ (باب ما جاء في درء الحدود), পৃষ্ঠা: ৫৭৩।]
আরেক হাদিসে এসেছে:
“যেখানে শাস্তি ঠেকানোর কোনো সুযোগ পাও, সেখানে শাস্তি প্রয়োগ করো না।”
– সুনান ইবন মাজাহ; লেখক: মুহাম্মদ ইবন ইয়াযীদ আল-কাজউইনি, প্রকাশক: আল-মাকতাব আল-ইলমিয়া, শিরোনাম: কিতাবুল হুদুদ, باب الستر على المؤمن ودفع الحدود بالشبهات, পৃষ্ঠা: ২৫৪৫।
এর অর্থ হলো—যদি হুদুদ প্রয়োগে কোনো সন্দেহ বা ব্যাখ্যার সুযোগ থাকে, তবে সেই সন্দেহকে অগ্রাধিকার দিয়ে শাস্তি থেকে বিরত থাকা উত্তম। তবে অপরাধ যদি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়—যেমন স্বীকারোক্তি বা চারজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর মাধ্যমে—তখন বিচারকের দায়িত্ব হয় শাস্তি কার্যকর করা।
হাদিস ব্যাখ্যাকার তীবী বলেন, এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, দোষ গোপন রাখা হলে তা আদালতে পৌঁছায় না; আর পৌঁছালেও বিচারক সন্দেহের ভিত্তিতে হুদুদ স্থগিত রাখতে পারেন। [তহফাতুল আহউজি শারহ সুনান আত-তিরমিজি
লেখক: মুহাম্মদ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আব্দুর রহীম আল-মুবারকফুরি, প্রকাশক: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, শিরোনাম: কিতাবুল হুদুদ আন রাসূলিল্লাহﷺ (باب ما جاء في درء الحدود), পৃষ্ঠা: ৫৭৩–৫৭৪।]
অন্য হাদিসে বলা হয়েছে:
“তোমরা নিজেদের মধ্যে শাস্তির বিষয় গোপন রাখো; কারণ তা যদি আমার কাছে পৌঁছে যায়, তবে শাস্তি অবধারিত হবে।”
– আল-মাকাসিদুল হাসানাহ ফিমা আশতাহারা আলা আল-অলসিনাহ, হাদিস নং: ৪৬
রজম কি কেবল ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োগযোগ্য?
এক কথায় উত্তর হচ্ছে, রজম প্রয়োগের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা মূল শর্ত। কারণ, রজম প্রয়োগ করবেন রাষ্ট্রের আদালত।
অর্থাৎ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, রজম বা এই ধরণের দণ্ডবিধি (হুদুদ) ব্যক্তিগতভাবে বা কোনো গোষ্ঠী কার্যকর করতে পারে না। এটি শুধুমাত্র একটি মুসলিম রাষ্ট্রের সরকার বা বিচার বিভাগ (কাজী) সাক্ষী ও প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর করার অধিকার রাখে।
এই বিষযে বিস্তর ব্যাখ্যা দিচ্ছি:
হুদূদ স্থগিত করার মূলনীতি (সহীহ হাদিস)
“ادرؤوا الحدود بالشبهات ما استطعتم”
(অনুবাদ: যতটা সম্ভব সন্দেহের কারণে হুদুদ এড়িয়ে যাও।)।
রেফারেন্স: সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস ১৪২৪: সহীহ (তিরমিযী বলেন: সহীহ ঘারীব)। সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ২৫৪৫: সহীহ (ইবন মাজাহ সংকলিত, আলবানী সহীহ বলে শ্রেণীবদ্ধ)। আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ৪/৩৮৫: সহীহ (হাকিম বলেন: সহীহ আল-ইসনাদ)।
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি নবী (সা.) এর থেকে বর্ণিত (আয়েশা রা. বা অন্য সাহাবী থেকে), যা দেখায় যে যেখানে শুবুহাত (সন্দেহ, পরিবেশগত কারণ যেমন: দারিদ্র্য, জোরপূর্বক, অ-ইসলামী সমাজ) থাকবে, সেখানে হুদুদ (রজমসহ) প্রয়োগ হবে না। এটি হুদুদের প্রয়োগকে সন্দেহমুক্ত পরিবেশে সীমাবদ্ধ রাখে, যা অ-ইসলামী সমাজে প্রয়োগ না করার ভিত্তি।
সাহাবি উমর (রা.) — রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় হদ্দ স্থগিত
“لا قطع في عام المجاعة”
(অনুবাদ: দুর্ভিক্ষের বছরে হাত কাটা হয় না)।
রেফারেন্স:
- মুয়াত্তা মালেক, কিতাবুল হুদুদ: সহীহ (মালেক সংকলিত, আলবানী সহীহ)।
- সুনান আল-বায়হাকী ৮/৪৩৪: সহীহ (বায়হাকী সংকলিত)।
- মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১০/২৩৬: সহীহ (আবদুর রাজ্জাক সংকলিত)।
- ইবন কুদামাহর ব্যাখ্যা (যাচাইকৃত): “لأن الجوع شبهة تدرأ الحد” (অনুবাদ: কারণ ক্ষুধা শুবুহাত যা হদ্দ এড়িয়ে যায়)। রেফারেন্স যাচাই: আল-মুগনী ৯/৯১: সহীহ (ইবন কুদামাহর গ্রন্থ, হাম্বলী ফিকহের মূল সোর্স)।
ব্যাখ্যা: উমর (রা.) দুর্ভিক্ষে চুরির হদ (হাত কাটা) স্থগিত করেন, কারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব (খাদ্য সরবরাহ) ব্যর্থ হলে এটি শুবুহাত (পরিবেশগত সন্দেহ) হয় এবং হদ্দ জুলুমে পরিণত হয়। এটি রজমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেখানে সমাজীয় বাধ্যবাধকতা (যেমন: অ-ইসলামী পরিবেশে পর্দা রক্ষা কঠিন) থাকলে হদ্দ স্থগিত।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)
“إذا وُجدت شبهة سقط الحد”
(অনুবাদ: যদি শুবুহাত থাকে, তাহলে হদ্দ বাতিল হয়)।
রেফারেন্সসমূহ: বাদায়িউস সানায়ি ৭/৬৩: সহীহ (আল-কাসানীর গ্রন্থ, হানাফী ফিকহের মূল সোর্স)।
“إنما تقام الحدود مع كمال العدالة وقيام السلطان بالواجب”
(অনুবাদ: হুদুদ কায়েম হয় শুধুমাত্র পূর্ণ ন্যায় এবং রুলারের দায়িত্ব পূরণের সাথে)।
রেফারেন্স যাচাই: বাদায়িউস সানায়ি ৭/৬৬: সহীহ।
ব্যাখ্যা: ইমাম আবু হানিফা রজমকে সুন্নাহভিত্তিক স্বীকার করেন, কিন্তু প্রয়োগের জন্য পূর্ণ ন্যায়বিচার এবং রুলারের (ইসলামী রাষ্ট্রের) দায়িত্ব পূরণ শর্ত। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে হদ্দ প্রয়োগ হয় না। এটি দেখায় যে অ-ইসলামী সমাজে প্রয়োগ জুলুম।
ইমাম মালেক (রহ.)
“تُدرأ الحدود إذا خيف الجور”
(অনুবাদ: যদি জুলুমের ভয় থাকে, তাহলে হুদুদ এড়িয়ে যাও)।
রেফারেন্সসমূহ: আল-ইসতিজকার লি-ইবন আবদিল বার ৭/১৪৬: সহীহ (ইবন আবদিল বারের গ্রন্থ, মালেকী ফিকহের সোর্স)।
“إقامة الحد مع الفساد أعظم فساداً”
(অনুবাদ: ফাসাদপূর্ণ সমাজে হদ্দ প্রয়োগ সবচেয়ে বড় ফাসাদ)।
রেফারেন্স: আত-তামহীদ ৫/৩৩১: সহীহ (ইবন আবদিল বারের গ্রন্থ)।
ব্যাখ্যা: ইমাম মালেক মদীনার প্র্যাকটিস অনুসারে রজমকে রুলারের অধীনে সীমাবদ্ধ রাখেন। যদি সমাজে ফাসাদ (অশান্তি বা জুলুম) থাকে, তাহলে হদ্দ প্রয়োগ সবচেয়ে বড় জুলুম হয়, তাই স্থগিত। এটি অ-ইসলামী পরিবেশে প্রয়োগ না করার ভিত্তি।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)
“ولا يقيم الحدود إلا الإمام أو من فوّض إليه الإمام”
(অনুবাদ: হুদুদ কায়েম করে না শুধুমাত্র ইমাম বা যাকে ইমাম ক্ষমতা দিয়েছে)।
রেফারেন্স: আল-উম্ম ৬/১৫৪: সহীহ (ইমাম শাফেয়ীর নিজস্ব গ্রন্থ)।
ব্যাখ্যা: ইমাম শাফেয়ী রজমকে রুলার (ইমাম) বা তার প্রতিনিধির অধীনে সীমাবদ্ধ রাখেন। এটি দেখায় যে অ-ইসলামী রাষ্ট্রে বা ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োগ অবৈধ।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.)
“إذا خيف من إقامة الحد فتنة، ترك الحد”
(অনুবাদ: যদি হদ্দ প্রয়োগে ফিতনার ভয় থাকে, তাহলে হদ্দ ছেড়ে দাও)।
রেফারেন্স: আল-মুগনী লি-ইবন কুদামাহ ১০/৩২২: সহীহ (হাম্বলী ফিকহের মূল গ্রন্থ)।
ব্যাখ্যা: ইমাম আহমাদ হাদিসের লিটারাল অনুসরণ করেন, কিন্তু ফিতনা (অশান্তি) থাকলে হদ্দ স্থগিত। এটি অ-ইসলামী সমাজে প্রয়োগ না করার ভিত্তি, কারণ এটি ফাসাদ সৃষ্টি করে।
ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.)
“الحدود إنما شُرعت للزجر، فإذا لم تحصل المصلحة، لم تكن مشروعة”
(অনুবাদ: হুদুদ শাস্তি প্রতিরোধের জন্য, যদি উপকার না হয়, তাহলে এটি শরিয়াহ নয়)।
রেফারেন্স: আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, পৃ. ১৩২: সহীহ (ইবন তাইমিয়্যাহর গ্রন্থ)।
ব্যাখ্যা: ইবন তাইমিয়্যাহ রজমকে প্রতিরোধক হিসেবে দেখেন, কিন্তু যদি প্রয়োগে উপকার না হয় (যেমন: অ-ইসলামী সমাজে জুলুম সৃষ্টি), তাহলে এটি শরিয়াহ নয়। এটি হুদুদ স্থগিতকরণের ভিত্তি।
ইবন কাইয়্যিম (রহ.)
“الشريعة عدل كلها، ورحمة كلها، وحكمة كلها فكل مسألة خرجت من العدل إلى الجور فليست من الشريعة”
(অনুবাদ: শরিয়াহ পুরোটাই ন্যায়, রহমত এবং হিকমাহ; যে বিষয় ন্যায় থেকে জুলুমে চলে যায়, তা শরিয়াহ নয়)।
রেফারেন্স: ই’লামুল মুয়াক্কিঈন ৩/৩: সহীহ (ইবন কাইয়্যিমের গ্রন্থ)।
ব্যাখ্যা: ইবন কাইয়্যিম শরিয়াহকে ন্যায়ভিত্তিক দেখেন, তাই যদি রজম প্রয়োগ জুলুমে পরিণত হয় (যেমন: অ-ইসলামী সমাজে), তাহলে এটি শরিয়াহ নয়। অর্থাৎ তিনি শরিয়াহর কোন রুলিংয়ের অপপ্রয়োগরে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
রজমের পদ্ধতি ও বিধান

সহীহ হাদীস এবং ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে রজমের পদ্ধতি নিম্নরূপ:
- গর্ত করা (নারীদের ক্ষেত্রে): মহিলা অপরাধী হলে তাকে পর্দা রক্ষার স্বার্থে কোমর বা নাভি পর্যন্ত গর্তে রাখা যেতে পারে (সহীহ মুসলিম, ১৬৯৫ – গামেদিয়া মহিলার ঘটনা)। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে গর্ত করা আবশ্যক নয়।
- পাথর নিক্ষেপ: উপস্থিত লোকজন মাঝারি আকারের পাথর নিক্ষেপ করবে। পাথর যেন এত ছোট না হয় যে তাতে আঘাতই লাগে না, আবার এত বড় না হয় যে এক আঘাতেই জীবন চলে যায়। লক্ষ্য হলো অপরাধীর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপ করা।
- কারা শুরু করবে?: যদি অপরাধটি সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তবে প্রথমে সাক্ষীরা পাথর নিক্ষেপ শুরু করবে। আর যদি স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হয়, তবে ইমাম বা বিচারক শুরু করবেন (ফিকহী মূলনীতি)।
- পালিয়ে গেলে: স্বীকারোক্তি প্রদানকারী ব্যক্তি যদি পাথর নিক্ষেপের সময় ব্যথায় কাতর হয়ে পালিয়ে যেতে চায়, তবে তাকে বাধা দেওয়া হবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ মায়েজ (রা.)-এর পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “তোমরা কেন তাকে ছেড়ে দিলে না? হয়তো সে তওবা করত এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতেন” (সুনানে আবু দাউদ, ৪৪১৯)।
গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধান ও সতর্কতা
- গর্ভাবস্থা: কোনো নারী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত এবং তাকে দুধ ছাড়ানো না পর্যন্ত রজম কার্যকর করা হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ গামেদিয়া মহিলাকে সন্তান জন্মের পর পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছিলেন (সহীহ মুসলিম, ১৬৯৫)।
- জানাযা ও দাফন: রজমকৃত ব্যক্তি যেহেতু দণ্ড ভোগের মাধ্যমে পবিত্র হয়ে গেছেন, তাই তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে গোসল করানো হবে এবং তার জানাযার নামাজ ও মুসলিম কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ গামেদিয়া মহিলার জানাযার নামাজ পড়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “সে এমন তওবা করেছে যা মদীনার ৭০ জন অপরাধীর মধ্যে ভাগ করে দিলেও সবার জন্য যথেষ্ট হতো” (সহীহ মুসলিম, ৪২০৯)।
আধুনিক বিতর্ক ও জবাব
আজকাল অনেকে বলেন, “কুরআনে যা নেই তা মানা যাবে না।” কিন্তু তারা ভুলে যান যে, কুরআন আমাদের কাছে যেভাবে পৌঁছেছে, ঠিক সেভাবেই রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ এবং ‘নাসখ’ বা রহিতকরণের জ্ঞানও নির্ভরযোগ্য সূত্রে পৌঁছেছে। রজমের বিধানটি রাসূল ﷺ নিজে কার্যকর করেছেন এবং তাঁর চার খলিফাও আমল করেছেন। তাই এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
ইসলামী ইতিহাসে রজমের প্রয়োগ খুব কম। খলিফা উমর (রা.)-এর সময় কয়েকটি ঘটনা, যেমন এক নারীর স্বীকারোক্তি। উমাইয়া, আব্বাসীয় যুগে ফিকহী বিতর্ক বাড়ে, কিন্তু প্রয়োগ বিরল। মুঘল যুগে বাংলায় (যেমন আকবরের সময়) শরিয়াহ নরম হয়, রজম প্রায় অপ্রয়োগিত। আধুনিককালে ঔপনিবেশিকতার কারণে ইউরোপীয় আইন প্রবর্তিত হয়, যা রজমকে প্রায়ই বাতিল করে দেয়।
আধুনিক যুগে রজম নিয়ে যে বিতর্ক চলছে—মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা, সেক্যুলার আইনের সাথে সংঘর্ষ—এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে ইসলামী বিধানগুলো কোনো নির্দিষ্ট যুগের জন্য নয়, বরং সব যুগের জন্য। যেসব সমাজে নৈতিকতার মান অত্যন্ত উচ্চ, যেখানে সমাজের প্রতিটি সদস্য আল্লাহর হুকুমের প্রতি অটল এবং পাপের প্রতি ঘৃণা জন্মেছে—সেখানেই এই বিধানের পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বর্তমানে ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রচলিত এবং সমাজে নৈতিকতার মান বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে আছে, রজমের প্রয়োগ তাত্ত্বিক ও শিক্ষামূলক অর্থেই বেশি প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে জিনা ও অবৈধ সম্পর্কের মতো গুরুতর পাপ সমাজের জন্য কতটা ক্ষতিকর, এবং এ থেকে দূরে থাকার জন্য কতটা সতর্কতা ও শিক্ষার প্রয়োজন।
আমাদের প্রজন্মের জন্য রজমের বিধান একটি গভীর বার্তা বহন করে:
- পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে হলে নৈতিক শিক্ষা ও তাকওয়ার চর্চা অপরিহার্য।
- আইনের কঠোরতার চেয়ে সমাজের মধ্যে পাপের প্রতি ঘৃণা ও তওবার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অনেক বেশি কার্যকর।
- আল্লাহর রহমত অসীম—তিনি শাস্তির চেয়ে ক্ষমা ও পুনর্বাসনকে বেশি পছন্দ করেন।
তাই রজম নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের দুটি বিষয় মনে রাখা উচিত: প্রথমত, এটি ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা হাদিস ও ফিকহের মাধ্যমে প্রমাণিত। দ্বিতীয়ত, এর প্রয়োগ কখনোই নির্বিচারে নয়—বরং অত্যন্ত কঠোর প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে।
আজকের সমাজে যদি আমরা এই বিধানের আলোকে নিজেদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে পারি, যদি পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে নৈতিকতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে রজমের মতো কঠিন শাস্তির প্রয়োজনই হয়তো কমে আসবে। কারণ ইসলামের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখা, শুধু শাস্তি দেওয়া নয়।
ভুল ধারণাসমূহ
- ভুল: রজম কুরআনে নেই, তাই অ-ইসলামী। সত্য: হাদিসভিত্তিক, কিন্তু কুরআনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
- ভুল: রজম সহজে প্রয়োগ হয়। সত্য: প্রমাণ অসম্ভব কঠিন।
- ভুল: রজম শুধু নারীদের জন্য। সত্য: উভয় লিঙ্গের জন্য।
আধুনিক অবস্থা ও দেশভিত্তিক প্রয়োগ
আজকের বিশ্বে রজম কয়েকটি দেশে আইনগতভাবে আছে, কিন্তু প্রয়োগ বিরল:
- ইরান: শিয়া ফিকহে রজম আছে, কিন্তু ২০১২ থেকে মোরাটোরিয়াম; কয়েকটি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।
- আফগানিস্তান: তালেবান শাসনে পুনর্বহাল, ২০২১ থেকে কয়েকটি কেস।
- সৌদি আরব: হাম্বলী মাজহাবে, কিন্তু তাজির বেশি ব্যবহার।
- পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া: হুদুদ অধ্যাদেশ, কিন্তু উচ্চ আদালত স্থগিত করে।
উপসংহার:
রজমের বিধান ইসলামী শরিয়াহের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল অধ্যায়। এটি শুধু একটি শাস্তির নাম নয়, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তি রক্ষা, পাপের প্রতিরোধ এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমার প্রতি অটল আনুগত্যের প্রতীক। কুরআন ও হাদিসের আলোকে যখন আমরা এই বিধানের গভীরতা অনুধাবন করি, তখন দেখতে পাই যে ইসলাম কখনোই নির্দয়তা বা অমানবিকতার পক্ষে নয়। বরং এর প্রতিটি শাস্তির পেছনে রয়েছে গভীর রহমত, ন্যায়বিচার এবং মানুষের পাপ থেকে মুক্তির পথ। রজমের প্রয়োগের জন্য যে চারজন সাক্ষীর শর্ত, স্বীকারোক্তির কঠোরতা এবং সন্দেহের মাধ্যমে শাস্তি বাতিলের নির্দেশ—এসবই প্রমাণ করে যে ইসলামে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও তওবার সুযোগকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শেষ কথা: রজমের আলোচনা আমাদেরকে শুধু আইনের কথা নয়, বরং আল্লাহর রহমত, ন্যায়বিচার এবং মানুষের পাপমুক্তির পথের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর হুকুমের প্রতি অটল রাখুন, পাপ থেকে দূরে রাখুন এবং তওবার মাধ্যমে তাঁর কাছে ফিরে আসার তৌফিক দান করুন। আমীন।