ইসলামী ইতিহাসে কলঙ্কিত এই ঘটনাকে ‘সাব্বুল আলী’ (আলী রা.-কে গালি দেওয়া) নামে পরিচিত। উমাইয়া যুগে (বিশেষ করে মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে) মসজিদের মিম্বরে (পালপিটে) হযরত আলী (রা.)-কে গালি/লানত দেওয়ার রীতি চালু হয়েছিল — এটা ইসলামী ইতিহাসের একটি স্বীকৃত (যদিও বিতর্কিত) ঘটনা।
সূচীপত্র
Toggleকিন্তু এ বিষয়ে মতভেদ খুবই গভীর, বিশেষ করে শিয়া এবং সুন্নি দৃষ্টিকোণের মধ্যে। নিরপেক্ষভাবে দেখলে বাস্তবতা এরকম:
ঐতিহাসিক প্রমাণ ও সূত্র
অধিকাংশ ঐতিহাসিক (শিয়া-সুন্নি উভয়) সূত্রে এই রীতির উল্লেখ আছে, যা প্রায় ৬০-৬৫ বছর (মুয়াবিয়া থেকে উমর ইবনে আব্দুল আযীয পর্যন্ত) চলেছিল। উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) এই রীতি বন্ধ করেন।
| দৃষ্টিকোণ | অবস্থান | প্রধান সূত্র/উদাহরণ |
|---|---|---|
| শিয়া মত | মুয়াবিয়া নিজে এবং তার গভর্নরদের (যেমন মুগীরা ইবনে শু’বা, যিয়াদ ইবনে আবীহি) আদেশ দিয়ে মিম্বরে আলী (রা.)-কে লানত দেওয়ার রীতি চালু করেন। এটা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও আলীর সমর্থকদের দমনের জন্য ছিল। | সহীহ মুসলিম (সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের হাদীস), তাবারী, ইবনে আসীর, উম্মে সালামার চিঠি, হাসান (রা.)-এর সাথে সন্ধিতে এই রীতি বন্ধের শর্ত ছিল। |
| সুন্নি মূলধারা | অধিকাংশ আধুনিক সুন্নি আলেম এটাকে অস্বীকার করেন বা বলেন: “স্পষ্ট প্রমাণ নেই”, “অতিরঞ্জিত”, “রাজনৈতিক অপবাদ”। কিছু সুন্নি আলেম (যেমন মওদূদী, ইবনে হাজারের কিছু ব্যাখ্যা) এটাকে স্বীকার করেছেন। | ইবনে কাসীর, ইবনে তাইমিয়া: “অধিকাংশ বর্ণনা দুর্বল বা মিথ্যা”। কিন্তু কিছু সূত্রে (তাবারী, বালাযুরী) উল্লেখ আছে যে গভর্নররা করতেন। |
| নিরপেক্ষ/আধুনিক ঐতিহাসিক | রীতিটি অস্তিত্ব ছিল, মুয়াবিয়া এর সাথে জড়িত ছিলেন (সরাসরি আদেশ বা অনুমোদন দিয়ে)। এটা আলীর সমর্থকদের দমন ও উমাইয়া শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল। | Wikipedia (Umayyad tradition of cursing Ali), Wilferd Madelung, Hugh Kennedy, ইত্যাদি। |
১. সবচেয়ে বিখ্যাত হাদীস (সহীহ মুসলিম)
সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত:
মুয়াবিয়া সা’দকে বললেন: “তোমাকে কী বাধা দিচ্ছে যে তুমি আবু তুরাবকে (আলীকে) গালি দাও না?” সা’দ বললেন: “রাসূল (সা.) তার সম্পর্কে তিনটি কথা বলেছেন… আমি কখনো তাকে গালি দিব না।”
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ২৪০৪ (আন্তর্জাতিক নম্বর: ৬৩৭০), কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা।
এই হাদীস থেকে অনেকে বুঝেন যে, তখন অন্যরা গালি দিতেন, আর মুয়াবিয়া অবাক হয়েছিলেন সা’দ না দেওয়ায়।
বিশ্লেষণ:
- * একদল আলেম (যেমন ইমাম নববী): তাঁরা বলেন, এখানে মুয়াবিয়া (রা.) সরাসরি গালি দিতে নির্দেশ দেননি, বরং কেন গালি দিচ্ছে না তার কারণ বা যুক্তি জানতে চেয়েছেন। হতে পারে তিনি সা’দ (রা.)-এর মুখ থেকে আলীর (রা.) প্রশংসা শুনতে চেয়েছিলেন।
- অন্য দল (যেমন ইবনে হাজার আসকালানী ও আধুনিক ঐতিহাসিকগণ): তাঁরা মনে করেন, এই প্রশ্নটি ছিল একটি তিরস্কার। অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে এটি একটি প্রচলিত রীতিতে পরিণত হয়েছিল এবং সা’দ (রা.) কেন তাতে অংশ নিচ্ছেন না—সেটিই ছিল প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য।
২. ঐতিহাসিক সূত্রসমূহ (তাবারী ও ইবনে আসীর)
ইতিহাসের কিতাবগুলোতে এই প্রথাটি দীর্ঘ সময় চালু থাকার বিবরণ পাওয়া যায়।
- তারিখে তাবারী (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৫৩-২৫৪): এখানে বর্ণিত হয়েছে যে, মুয়াবিয়া (রা.) যখন মুগীরা ইবনে শু’বাকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আলীর (রা.) সমালোচনা করতে এবং উসমানের (রা.) প্রশংসা করতে।
- ইবনে আসীর (আল-কামিল ফিত তারিখ): এখানেও উল্লেখ আছে যে, বনু উমাইয়ার গভর্নররা মিম্বরে আলীর (রা.) সমালোচনা করতেন।
৩. উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর সংস্কার
এই প্রথাটি যে বাস্তবে ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো পরবর্তী খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীযের পদক্ষেপ।
- দলিল: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবনে কাছীর), ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০১-২০২।
- বিবরণ: ইবনে কাছীর বর্ণনা করেছেন যে, উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) খলিফা হওয়ার পর খুতবায় আলীর (রা.) সমালোচনা বন্ধ করেন। এর পরিবর্তে তিনি কুরআনের এই আয়াতটি পড়ার নির্দেশ দেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং নিকটাত্মীয়দের দান করার নির্দেশ দেন…” (সূরা নাহল: ৯০)। আজ পর্যন্ত জুমার খুতবার শেষে এই আয়াতটি পড়ার রীতি সেখান থেকেই এসেছে।
৪. সুন্নি আলেমদের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা ও অবস্থান
সুন্নি জামাত এই ঐতিহাসিক সত্যটিকে অস্বীকার করে না, কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর মর্যাদাহানি যাতে না হয়, সে জন্য কিছু ব্যাখ্যা প্রদান করে:
- ইজতিহাদি বিবাদ: তাঁরা বলেন, এটি ছিল রাজনৈতিক বিরোধের চরম পর্যায়। তৎকালীন সময়ে একে ‘গালি’ (Insult) হিসেবে নয়, বরং ‘রাজনৈতিক সমালোচনা’ (Political Denunciation) হিসেবে দেখা হতো।
- সরাসরি আদেশ বনাম অনুমোদন: অনেক আলেম মনে করেন, মুয়াবিয়া (রা.) হয়তো সরাসরি গালি দেওয়ার লিখিত আদেশ দেননি, কিন্তু তাঁর গভর্নররা যখন এটি করতেন, তখন তিনি তাঁদের বাধা দেননি। যা পরোক্ষ অনুমোদন হিসেবে গণ্য হয়।
- ইমাম নববীর মত: তিনি মনে করেন, মুয়াবিয়া (রা.) একজন সাহাবী হওয়ায় তাঁর সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা ওয়াজিব। তাই এই হাদিসগুলোর এমন ব্যাখ্যা করতে হবে যা তাঁর সাহাবিয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
আজকাল আহলে সুন্নাহর সাধারণ অবস্থান
আমাদের মাযহাবের (হানাফী, শাফিঈ, মালেকী, হাম্বলী) আকাবির আলেমরা (ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাসীর, নববী, আলবানী প্রমুখ) বলেন:
- যদি এমন কিছু ঘটেও থাকে, তা ইজতিহাদী ভুল বা রাজনৈতিক ভুল ছিল।
- কিন্তু সাহাবী হিসেবে মুয়াবিয়াকে গালি দেওয়া/লানত দেওয়া হারাম।
- ফিতনার বিষয়ে চুপ থাকা উত্তম।
সারকথা: হ্যাঁ, ঐতিহাসিকভাবে এই রীতি চালু হয়েছিল এবং মুয়াবিয়ার শাসনকালে এর সূচনা হয়েছে বলে বহু সূত্রে উল্লেখ আছে। কিন্তু সুন্নি মূলধারায় এটাকে সরাসরি মুয়াবিয়ার নির্দেশ বলে মানা হয় না বা দুর্বল মনে করা হয়। শিয়া মতে এটা অকাট্য সত্য।
উপসংহার:
মুয়াবিয়া (রা.)-এর আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় ৬০ বছর উমাইয়া মিম্বরগুলোতে আলী (রা.)-এর সমালোচনা বা লানত দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তবে:
- ১. এটি ছিল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, ধর্মীয় কোনো বিধান নয়।
- ২. মুয়াবিয়া (রা.) নিজে সরাসরি গালি দিতেন কি না—তা নিয়ে সংশয় থাকলেও তাঁর প্রশাসনে এটি প্রচলিত ছিল।
- ৩. আহলে সুন্নাহর অবস্থান: আমরা এই ঘটনাকে ইতিহাসের একটি ‘দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়’ এবং সাহাবীদের ‘ইজতিহাদি ভুল’ হিসেবে দেখি।
আমরা আলী (রা.)-কেও ভালোবাসি, আবার মুয়াবিয়া (রা.)-কেও সাহাবী হিসেবে সম্মান করি। আমাদের কাজ হলো তাঁদের মধ্যকার বিবাদ নিয়ে বিতর্ক না করে উভয়ের জন্য দোয়া করা।