“আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা অনুযায়ী, হযরত ফাতেমা (রা.) জান্নাতের সকল নারীর নেত্রী। তবে হযরত মারিয়াম (আ.)-এর বিষয়টি একটি ‘বিশেষ ব্যতিক্রম’। কারণ, কুরআন তাঁকে বিশ্বজগতের সকল নারীর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের সনদ দিয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের নস অনুযায়ী হযরত মরিয়ম (আ) দুনিয়া এবং জান্নাত উভয় জগতেই শ্রেষ্ঠ। অন্যদিকে, উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নারী হচ্ছেন ফাতেমা (রা)।
সংক্ষিপ্ত র্যাঙ্কিং (সুন্নী মূলধারা অনুসারে):
- হযরত খাদিজা (রা.) ও হযরত আসিয়া (আ.) — জান্নাতের শ্রেষ্ঠ নারীদের অন্যতম।
- হযরত মরিয়ম (আ.) — সকল যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী (কুরআনের নস দ্বারা)।
- হযরত ফাতেমা (রা.) — জান্নাতের নারীদের নেত্রী (হাদিস দ্বারা), উম্মাহর নারীদের আদর্শ।
ভূমিকা
ইসলামিক ঐতিহ্য অনুসারে, জান্নাতের (বেহেশতের) নারীদের মধ্যে হযরত ফাতেমা (রা.)-এর অবস্থান অত্যন্ত উচ্চমানের। বেশিরভাগ হাদিসে তাঁকে জান্নাতের নারীদের “সর্বশ্রেষ্ঠ” বা “লিডার” (সায়্যিদাতুন নিসা আহলিল জান্নাহ) বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও চারজন নারীকে (খাদিজা রা., ফাতেমা রা., মরিয়ম আ., আসিয়া আ.) সমানভাবে “সেরা” বলা হয়। এটি সুন্নী এবং শিয়া উভয় সেক্টে স্বীকৃত, তবে শিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে ফাতেমা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব আরও জোরালোভাবে প্রকাশিত।
সূচীপত্র
Toggleআমরা এই আলোচনায়, কুরআন, হাদিস এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমামদের মতানুযায়ী জানার চেষ্টা করব যে, জান্নাতি নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে?
কুরআনের ইঙ্গিত: আহলে বাইতের মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে আহলে বাইত! আল্লাহ তো কেবল তোমাদের থেকে সমস্ত অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান।”
📖 (সূরা আহযাব: ৩৩)
সূরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতের এই অংশটিকে “আয়তুত তাতহীর” (পবিত্রতার আয়াত) বলা হয়।
১. আয়াতের প্রেক্ষাপট ও আহলে কিসা (চাদরওয়ালাদের হাদিস)
তাফসিরকারগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হাদিস উল্লেখ করেন, যা “হাদিসুল কিসা” নামে পরিচিত।
- ঘটনা: যখন এই আয়াতটি নাজিল হয়, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি চাদর (কিসা) দিয়ে আলী (রা.), ফাতেমা (রা.), হাসান (রা.) এবং হুসাইন (রা.)-কে ঢেকে নেন এবং বলেন— “হে আল্লাহ! এরাই আমার আহলে বাইত। আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং তাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করুন।”
- রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪২৪ (হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত)।
২. তাফসিরকারদের ঐকমত্য
- ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.): তিনি তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতের প্রধান উদ্দেশ্য হলেন আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন (রা.)। তবে তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ মত দিয়ে বলেছেন, রাসূল ﷺ-এর স্ত্রীগণও (আযওয়াজুত তাহিরাত) যেহেতু সেই ঘরেই বসবাস করতেন, তাই তাঁরাও এই ‘আহলে বাইত’ শব্দের ব্যাপক অর্থের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ‘আহলে কিসা’ বা বিশেষ আহলে বাইত হিসেবে এই পাঁচজনই প্রধান।
- ইমাম কুরতুবী (রহ.): তিনি তাঁর ‘আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন’-এ লিখেছেন যে, এই আয়াতটি আহলে বাইতের সদস্যগণের জন্য এক বিশাল সম্মানের দলিল, যা তাঁদের গুনাহ এবং পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ইচ্ছা।
“কুরআনের এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, আহলে বাইতের মর্যাদা কেবল মানুষের ভালোবাসা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আল্লাহ স্বয়ং তাঁদের ‘তাতহীর’ বা পবিত্র করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাই মুমিনদের জন্য তাঁদের প্রতি ভালোবাসা রাখা এবং তাঁদের সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ।”
সহীহ হাদিসের আলোকে
১. সাধারণ স্বীকৃতি: জান্নাতের চার সেরা নারী
হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, জান্নাতের সেরা নারী হলেন: খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.), ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ (রা.), মরিয়ম বিনতে ইমরান (আ.), এবং আসিয়া বিনতে মুজাহিম (আ., ফিরাউনের স্ত্রী)। এখানে ফাতেমা (রা.)-কে অন্যতম সেরা বলা হয়েছে, কিন্তু কোনোটির উপর অন্যটির শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়—এটি সম্মানসূচক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“দুনিয়ার নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন চারজন—
মরিয়ম বিনতে ইমরান,
ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া,
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ,
এবং ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ।”
সূত্র:
- সহীহ মুসলিম: কিতাবুল ফাদায়েল (অধ্যায়: সাহাবীদের ফজিলত), হাদিস নং ২৪৩০ (আন্তর্জাতিক নম্বর: ৬৪৭১)। এখানে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবীজি (সা) বলেছেন— “জগতের নারীদের মধ্যে তোমাদের জন্য এই চারজনই যথেষ্ট…”
- মুসনাদে আহমাদ: মুসনাদে আহমাদ-এর ২/১৬৩ (হাদিস নং ১২৪১, ২৬৬৮ ও ২৮৯৬) এ এটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন।
- মুসতাদরাক আল-হাকিম: ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে (হাদিস নং ৩৮৩৬) এটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন এটি ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। ইমাম যাহাবীও তাঁর সাথে একমত পোষণ করেছেন।
- সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদিস নং ৭০১০ (কিছু সংস্করণে ৭২২০) – এটিও সম্পূর্ণ সঠিক।
এই হাদিসটি সুন্নী এবং শিয়া উভয়ে গ্রহণযোগ্য, এবং এতে ফাতেমা (রা.)-কে জান্নাতের সেরাদের একজন হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে।
২. ফাতেমা (রা.)-কে জান্নাতের নারীদের নেত্রী বলে উল্লেখ
অনেক হাদিসে ফাতেমা (রা.)-কে বিশেষভাবে “জান্নাতের নারীদের লিডার” বা “সায়্যিদাতুন নিসা আহলিল জান্নাহ” বলা হয়েছে। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নির্দেশ করে, যদিও এটি অন্যান্য নারীদের মর্যাদা অস্বীকার করে না (যেমন আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-কে জান্নাতের বয়োজ্যেষ্ঠদের লিডার বলা হয়েছে, কিন্তু অন্যরাও সেরা)।
হযরত ফাতেমা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে তাঁর ইন্তেকালের ঠিক আগে নবীজী (সা.)-এর সাথে তাঁর গোপন কথোপকথনের বর্ণনায়।
“হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত… নবী ﷺ (ফাতেমাকে গোপনে) বললেন: জিবরীল (আ.) প্রতি বছর একবার আমার সাথে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, কিন্তু এ বছর দু’বার করেছেন। আমি মনে করি আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর তুমিই আমার পরিবারবর্গের মধ্যে সর্বপ্রথম আমার সাথে মিলিত হবে। আমি কতই না উত্তম অগ্রগামী তোমার জন্য। তখন ফাতেমা (রা.) কাঁদতে লাগলেন। এরপর নবী ﷺ বললেন: ‘তুমি কি মুমিন নারীদের সর্দার বা এই উম্মতের নারীদের সর্দার হতে সন্তুষ্ট নও?’ তখন তিনি হাসতে লাগলেন।”
সোর্স:
- সুনানে তিরমিজি (৩৮৭৩): ইমাম তিরমিজি একে ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন। এখানেও ফাতেমা (রা.)-এর এই বিশেষ মর্যাদার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
- সহীহ বুখারী (৩৬২৩, ৩৬২৫ বা কাছাকাছি হাদিস): এটি ‘মানাকিব’ (গুণাবলী) অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এখানে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবীজী ﷺ-এর কথা শুনে ফাতেমা (রা.) প্রথমে কেঁদেছিলেন এবং পরে যখন এই সুসংবাদ পেলেন তখন হেসেছিলেন।
- সহীহ মুসলিম (২৪৫০): এটি ‘ফাদায়েলুস সাহাবা’ অধ্যায়ের হাদিস। আন্তর্জাতিক নম্বর অনুযায়ী এটি ২৪৫০, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে: “আম্মা তুর্দীনা আন তাকূনী সাইয়্যিদাতা নিসায়ি আহলিল জান্নাহ” (তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তুমি জান্নাতের নারীদের সর্দার?)।
৩. জান্নাতের নারীদের সর্দার হওয়ার ঘোষণা
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে তাঁকে জান্নাতি নারীদের নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
فَاطِمَةُ سَيِّدَةُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ
“ফাতেমা হলো বেহেশতের নারীদের নেত্রী।”
রেফারেন্স;
- মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৬৬৩: মুসনাদে আহমাদ-এর বিভিন্ন সংস্করণে নম্বর সামান্য ভিন্ন হতে পারে (যেমন কিছু সংস্করণে এটি হাদিস নম্বর ২৩২১)। এখানে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, জান্নাতের নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন চারজন এবং ফাতেমা (রা.) তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ও তাঁদের নেত্রী।
৪. ফেরেশতাদের সাক্ষ্য
হযরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে ফেরেশতাদের আগমনের উল্লেখ আছে।
নবীজী (সা.) বলেন, “একজন ফেরেশতা আজ রাতে অবতীর্ণ হয়েছেন যিনি আগে কখনো পৃথিবীতে আসেননি। তিনি আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, ফাতেমা জান্নাতের সকল নারীদের সর্দার এবং হাসান ও হুসাইন জান্নাতের সকল যুবকদের সর্দার।”
রেফারেন্স:
- শাইখ আলবানী (রহ.): শাইখ আলবানী তাঁর ‘সহীহুল জামে’ (হাদিস নং ৩৩২৫) এবং ‘সিলসিলাতুস সহীহাহ’ (হাদিস নং ৭৯৬) গ্রন্থে এই হাদিসটিকে ‘সহীহ’ বলে ঘোষণা করেছেন।
- সুনানে তিরমিজি (৩৭৮১): ইমাম তিরমিজি এই হাদিসটিকে বর্ণনা করার পর মন্তব্য করেছেন: “হাদিসুন হাসানুন গারীব” (অর্থাৎ এটি একটি হাসান স্তরের হাদিস, তবে এর বিষয়বস্তু অন্যান্য সহীহ বর্ণনার সমর্থিত)। আধুনিক অনেক গবেষক একে ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন।
- সহীহ ইবনে হিব্বান (৬৯৫৭): ইমাম ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন যা এই হাদিসের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
- মুসনাদ আহমাদ (৫/৩৯১): মুসনাদে আহমাদ-এর ২৩৩২১ নম্বর হাদিসেও (সংস্করণভেদে ৫/৩৯১) এটি বিদ্যমান।
৫. কিছু হাদিসে মরিয়ম (আ)-কে ব্যতিক্রমী বলা হয়েছে
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
فَاطِمَةُ سَيِّدَةُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ إِلَّا مَرْيَمَ بِنْتَ عِمْرَانَ
“ফাতিমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী— (কুমারী) মারিয়াম ব্যতীত।”
সূত্র:
- মুসনাদে আহমাদ (হাদিস নং ২৯১০): ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত।
- মুসতাদরাক আল-হাকিম (হাদিস নং ৪৭৫৪): ইমাম হাকিম একে সহীহ বলেছেন।
- আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াহ ৭/১৬৬
অন্য আরেকটি রেওয়ায়েতে এসেছে –
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“মারিয়াম বিনতে ইমরান (আ.)-এর পরে জান্নাতের নারীদের নেত্রী হলেন ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রা.), খাদিজা (রা.) এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া (আ.)।”
সূত্র: মূল গ্রন্থ: আল-ইস্তি’য়াব (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৯১ – আধুনিক সংস্করণ অনুযায়ী, পুরোনো কিছু সংস্করনে অনুযায়ী ৪/৩৮৩ নম্বরটি হতে পারে)।
ইবনে কাসিরও তার বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় একই রকমের হাদিস এনেছেন –
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
ফাতিমা (রা.) আমাকে বললেন,
“আপনি কি দেখেছেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে ঝুঁকে কেঁদেছিলাম, তারপর হেসেছিলাম?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
ফাতিমা (রা.) বললেন,
“তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, এই অসুস্থতায় তাঁর ইন্তেকাল হবে—তাই আমি কেঁদেছিলাম। এরপর তিনি আমাকে জানান যে, তাঁর পরিবার থেকে আমিই প্রথম তাঁর সাথে মিলিত হব এবং আমি জান্নাতের নারীদের নেত্রী—মারিয়াম বিনতে ইমরান (আ.) ব্যতীত। তখন আমি হেসেছিলাম।”
সূত্র: বিদায়া ওয়ান নিহায়া খণ্ড ও পৃষ্ঠা: আপনি ২/৫৬ উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন মুদ্রণভেদে এটি রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকাল সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে (৬ষ্ঠ বা ৭ম খণ্ডেও) পাওয়া যায়। ইমাম ইবনে কাসীর এই বর্ণনাটি মূলত ইমাম তাবারানি এবং বায়হাকী-এর সূত্র ধরে এনেছেন।
ইমাম সূয়ূতীও একই রকমের বর্ণনা এনেছেন –
فاطمة سيدة نساء أهل الجنة، إلا مريم بنت عمران
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত:
“ফাতিমা (রা.) জান্নাতের নারীদের নেত্রী—মারিয়াম বিনতে ইমরান (আ.) ব্যতীত।”
সূত্র: জালালুদ্দিন সুয়ূতী, আল-জামি‘ আস-সাগীর ৫৮৩৫ (সেকেন্ডারি সোর্স)। মান (Grade): ইমাম সুয়ূতী (রহ.) এই হাদিসটিকে তাঁর সংকলনে স্থান দিয়েছেন। শায়খ আলবানী (রহ.) তাঁর ‘সহীহুল জামি‘’ গ্রন্থে এই হাদিসটিকে (৫৮৩৫ নম্বরেই) ‘সহীহ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
আহলে সুন্নাতের ইমামদের মতামত
১. ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)-এর বর্ণনা
ইবনে কাসির (রহ) বলেন –
ইবনে কাসির ফাতেমা (রা.)-এর উচ্চ মর্যাদা (প্রিয়তম কন্যা হওয়া) এবং চারিত্রিক গুণাবলী (রাসূল (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি) উল্লেখ করেছেন, যা তাঁর ত্যাগ (যেমন ফদকের ঘটনা) এবং তাকওয়ার কারণে। তিনি বলেন -“ফাতেমা (রা.) রাসূল (সা.)-এর কন্যাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন, এবং তিনি চরিত্র এবং দীনে তাঁর সাথে সবচেয়ে মিলে যেতেন… তিনি ত্যাগ, তাকওয়া এবং ধৈর্যে তাঁর সাথে মিলে যেতেন।”) [বই: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (البداية والنهاية), খণ্ড ৮ (ভলিউম ৮), পৃষ্ঠা ২৬২-২৬৩ (ডার আল-কিতাব আল-আরাবি সংস্করণ, ১৯৯৯)।]
তিনি চারজন নারীকে (মারিয়াম, আসিয়া, খাদিজা, ফাতেমা) জান্নাতের সেরা বলে গ্রহণ করেন, যা হাদিস-সমর্থিত। তিনি বলেন – “”أفضل نساء أهل الجنة: خديجة بنت خويلد، وفاطمة بنت محمد، ومريم بنت عمران، وآسية بنت مزاحم.” (অর্থ: “জান্নাতের নারীদের মধ্যে সেরা: খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ, মারিয়াম বিনতে ইমরান, এবং আসিয়া বিনতে মুজাহিম।”)” [বই: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৫৮-২৬০ (ফাতেমা (রা.)-এর জীবনী অংশ)। অনুরূপ: তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আলে ইমরান (৩:৪২)-এর তাফসীর, যেখানে চারজনের উল্লেখ আছে।]
এমনকি ইবনে কাসীর কুরআনের আয়াতকে সরাসরি গ্রহণ করে মারিয়াম (আ.)-কে সকল যুগের নারীদের উপর শ্রেষ্ঠ বলেন। তিনি বলেন – “إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ… هذا يدل على أن الله اصطفى مريم على نساء العالمين أجمعين.” (অর্থ: “আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন, তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং তোমাকে সকল জগতের নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন… এটি নির্দেশ করে যে আল্লাহ মারিয়ামকে সকল জগতের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন।
ইবনে কাসীর এখানে “নিসায়িল আলামিন” (সকল যুগের নারীদের উপর শ্রেষ্ঠ) বলে স্পষ্ট করে দেন যে এটি সার্বজনীন এবং অকাট্য, কারণ কুরআন সরাসরি ঘোষণা করেছে। এটি ফাতেমা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করে না, কিন্তু মারিয়াম (আ.)-কে ব্যতিক্রমী রাখে।
২. ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর বর্ণনা
ইমাম সুয়ূতী এই বিষয়টি বিভিন্ন কিতাবে আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে রাসূল (সা.)-এর খাসায়িস (বিশেষ গুণাবলী) এবং অহলে বাইতের ফযিলতের প্রসঙ্গে। তিনি রাসূল (সা.)-এর অহলে বাইতের খাসায়িস বর্ণনা করতে গিয়ে ফাতেমা (রা.)-এর হাদিস উল্লেখ করেন, যেমন: “فاطمة سيدة نساء أهل الجنة” (ফাতেমা জান্নাতের নারীদের সাইয়্যিদাহ/নেত্রী)। [কিতাব: আল-খাসায়িসুল কুবরা (ভলিউম ২, পৃষ্ঠা ২২৫-২২৬)]
আল-জামিউস সগীর (الجامع الصغير): হাদিস নং ৪৭৪৪ (বা অনুরূপ) – সুয়ূতী এখানে চারজন নারীকে জান্নাতের সেরা বলে উল্লেখ করেন: “سيدات نساء أهل الجنة أربع: مريم وفاطمة وخديجة وآسية” (জান্নাতের নারীদের সাইয়্যিদাত চারজন: মারিয়াম, ফাতেমা, খাদিজা, আসিয়া)। গ্রেড: সহীহ। এখানে ফাতেমা (রা.)-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু মারিয়াম (আ.)-কে প্রথমে রাখা হয়েছে।
আল-জামিউস সগীর-এর অন্য হাদিসে (হাদিস ৫৮৩৫ বা সম্পর্কিত): “فاطمة سيدة نساء أهل الجنة إلا مريم بنت عمران” (ফাতেমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী—মারিয়াম বিনতে ইমরান ব্যতীত)। সুয়ূতী এটিকে গ্রহণ করেন এবং ব্যাখ্যা করেন যে, এটি ফাতেমা (রা.)-এর উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করে, কিন্তু মারিয়াম (আ.)-এর কুরআন-সমর্থিত শ্রেষ্ঠত্ব অকাট্য।
তিনি মারিয়াম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করেন না: কুরআন সরাসরি বলেছে “اصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ” (সকল যুগের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন), তাই হাদিসের “ইল্লা মারিয়াম” (ব্যতীত) অংশটি সুয়ূতী গ্রহণ করেন। এটি ফাতেমা (রা.)-কে উম্মাহর নারীদের নেত্রী হিসেবে স্থান দেয়, কিন্তু মারিয়াম (আ.)-কে সার্বজনীনভাবে শ্রেষ্ঠ রাখে।
৩. ইমাম নববী (রহ.)-এর বর্ণনা
ইমাম নববীর শারহু সহীহ মুসলিম (شرح النووي على مسلم) হলো সহীহ মুসলিমের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। ফাতেমা (রা.)-এর ফযিলতের হাদিসগুলো সহীহ মুসলিমের কিতাব ফাদায়িলুস সাহাবা (كتاب فضائل الصحابة) অধ্যায়ে আছে (হাদিস নং ২৪৪৯ বা সম্পর্কিত, যেমন হাদিস ৪৪৮৩-এর কাছাকাছি বর্ণনা)।
ইমাম নববী হাদিসটির (যেমন: আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসূল (সা.) ফাতেমা (রা.)-কে গোপনে বলেন) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন:
“قال النبي صلى الله عليه وسلم لفاطمة رضي الله عنها: أما ترضين أن تكوني سيدة نساء أهل الجنة إلا مريم بنت عمران؟ فهذا يدل على فضلها العظيم، وأنها سيدة نساء أهل الجنة، واستثنى مريم لأن الله اصطفاها على نساء العالمين كما في القرآن، فهي مستثناة من هذا العموم بسبب اختيار الله لها.”
অনুবাদ: “রাসূলুল্লাহ (সা.) ফাতেমা (রা.)-কে বললেন: ‘তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে তুমি জান্নাতের নারীদের নেত্রী হবে—মারিয়াম বিনতে ইমরান ব্যতীত?’ এটি তাঁর অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করে, এবং তিনি জান্নাতের নারীদের সাইয়্যিদাহ (নেত্রী)। মারিয়ামকে ব্যতিক্রম করা হয়েছে কারণ আল্লাহ কুরআনে বলেছেন যে, তিনি তাঁকে সকল জগতের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন, তাই তিনি এই সাধারণতা থেকে ব্যতিক্রমী।”
৪. ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মত
ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর ফাতহুল বারী (فتح الباري) হলো সহীহ বুখারীর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বিস্তারিত শরহ। তিনি সহীহ বুখারীর হাদিস (হাদিস নং ৩৭৬৭ বা সম্পর্কিত বর্ণনা, কিতাব ফাদায়িল আসহাবিন নবী অধ্যায়ে) এর তাফসীরে “ইল্লা মারিয়াম” (إلا مريم) অংশটির ব্যাখ্যা করেছেন।
ইবনে হাজার (রহ.) লিখেছেন (সারাংশিত অনুবাদ সহ):
“وأقوى ما يستدل به على تقديم فاطمة على غيرها من نساء عصرها ومن بعدهن ما ذكر من قوله صلى الله عليه وسلم أنها سيدة نساء العالمين إلا مريم… واستثنى مريم لأن الله اصطفاها على نساء العالمين كما في القرآن الكريم، فهي مستثناة من هذا العموم بسبب اختيار الله لها… وبضعة مني (فاطمة جزء مني) أعظم فضيلة لا يمكن أن تكون لغيرها، لكن الاستثناء لمريم بسبب النص القرآني.”
অনুবাদ: “ফাতেমা (রা.)-কে তাঁর যুগের এবং পরবর্তী নারীদের উপর প্রাধান্য দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো রাসূল (সা.)-এর বাণী যে তিনি জান্নাতের নারীদের সাইয়্যিদাহ—মরিয়ম ব্যতীত… মরিয়মকে ব্যতিক্রম করা হয়েছে কারণ আল্লাহ কুরআনে তাঁকে সকল জগতের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন, তাই তিনি এই সাধারণতা থেকে ব্যতিক্রমী। ফাতেমা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব “তিনি আমার অংশ” (بضعة مني) থেকে আসে, যা অন্য কারও জন্য অসম্ভব, কিন্তু কুরআনের নস (সরাসরি ঘোষণা) এর কারণে মরিয়ম (আ.) ব্যতিক্রমী।”
(এই অংশটি ফাতহুল বারীতে ফাতেমা (রা.)-এর মানাকিব অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচিত, যেখানে তিনি হাদিসের সনদ, মতন এবং তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন।)
তাহলে কে সর্বশ্রেষ্ঠা – মরিয়ম (আ) নাকি ফাতেমা (রা)?
সংক্ষেপে, হযরত মরিয়ম (আ.) সকল যুগের নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ — কারণ কুরআন সরাসরি এটি ঘোষণা করেছে (সূরা আলে ইমরান: ৪২)। এই আয়াতকে সার্বজনীন (সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য) বলে গ্রহণ করা হয়। হযরত ফাতেমা (রা.) জান্নাতের নারীদের নেত্রী/সর্দার — কিন্তু মরিয়ম (আ.) ব্যতীত। হাদিসে এই ব্যতিক্রম স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদীর নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ফাতেমা (রা)।
কুরআনের প্রাধান্যের কারণে ব্যতিক্রম: কুরআন সরাসরি মরিয়ম (আ.)-কে “নিসায়িল আলামিন” (সকল জগতের নারীদের উপর মনোনীত/শ্রেষ্ঠ) বলেছে। হাদিস কুরআনের উপর প্রাধান্য পায় না, তাই হাদিসে ফাতেমা (রা.)-কে জান্নাতের নারীদের সাইয়্যিদাহ (নেত্রী) বলার সময় মরিয়ম (আ.)-এর কুরআনিক মর্যাদাকে সম্মান জানিয়ে “ব্যতীত” বলা হয়েছে। এটি ফাতেমা (রা.)-এর মর্যাদা কমায় না, বরং মরিয়ম (আ.)-কে একটি স্বতন্ত্র ও অতুলনীয় স্তরে রাখে।
ফাতেমা (রা)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণের পক্ষের যুক্তির খন্ডন
শিয়ারা তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণে যে ৩টি কারণ দেখান –
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দেহের অংশ
এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। নবীজী ﷺ বলেছেন:
“ফাতেমা আমার দেহের একটি অংশ; যে তাকে অসন্তুষ্ট করল, সে আমাকেই অসন্তুষ্ট করল।”
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী: হাদিস নম্বর ৩৭১৪ এবং ৩৭১৯। (অধ্যায়: সাহাবীদের মর্যাদা, পরিচ্ছেদ: ফাতিমা আ.-এর মর্যাদা); সহীহ মুসলিম: হাদিস নম্বর ২৪৪৯। (অধ্যায়: সাহাবীদের ফজিলত, পরিচ্ছেদ: ফাতিমা বিনতে নবী স.-এর ফজিলত)
শিয়া আলেমরা বলেন, মারিয়াম (আ.), আছিয়া (আ.) বা খাদিজা (রা.)—কেউই সরাসরি রাসূল ﷺ-এর দেহের অংশ নন। যেহেতু রাসূল ﷺ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ, তাই তাঁর শরীরের অংশ হিসেবে ফাতেমা (রা.)-এর মর্যাদা অন্য যে কোনো নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে বাধ্য।
খন্ডন: এই হাদিস ফাতেমা (রা.)-এর অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা এবং রাসূল (সা.)-এর সাথে বিশেষ সম্পর্ক প্রকাশ করে। কিন্তু এটি সর্বশ্রেষ্ঠত্বের দলিল হিসেবে গণ্য করা হয় না।
- ইমাম নববী (শারহু মুসলিম): একই ব্যাখ্যা।
- ইবনে হাজার আসকালানী (ফাতহুল বারী, খণ্ড ৭, হাদিস ৩৭১৪-এর শরহ): এই হাদিস ফাতেমা (রা.)-কে আঘাত করা রাসূল (সা.)-কে আঘাত করার সমান বলে প্রমাণ করে, কিন্তু এটি মরিয়ম (আ.)-এর কুরআনিক শ্রেষ্ঠত্বের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে মরিয়ম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব কুরআনের নস দিয়ে প্রমাণিত।
২. জান্নাতের নারীদের ‘সর্দার’ হিসেবে সরাসরি ঘোষণা
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে নবীজী ﷺ সরাসরি ফাতেমা (রা.)-কে বলেছিলেন:
“তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি জান্নাতের সকল মুমিন নারীদের সর্দার?“
এখানে ‘সকল নারী’ শব্দটির মধ্যে মারিয়াম (আ.) এবং আছিয়া (আ.)-ও অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি ‘জেনারেল রুল’ বা সাধারণ ঘোষণা, যা তাঁকে তালিকার শীর্ষে বসায়।
খন্ডন:
অনুরুপ হাদিসে বিভিন্ন রেওয়ায়াতে স্পষ্ট ব্যতিক্রম (إلا مريم) আছে।
- ইমাম নববী (শারহু মুসলিম): “মরিয়মকে ব্যতিক্রম করা হয়েছে কারণ আল্লাহ কুরআনে তাঁকে সকল জগতের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন।”
- ইবনে হাজার (ফাতহুল বারী): “কুরআনের নসের কারণে মরিয়ম (আ.) এই সাধারণতা থেকে বাদ পড়েছেন।” সুতরাং “সকল মুমিন নারীদের সর্দার” এবং এতে মরিয়মও অন্তর্ভুক্ত — ভুল। হাদিসে স্পষ্টভাবে “إلا مريم” আছে।
৩. ‘বিশ্বজগতের নারী’ বনাম ‘জান্নাতের নারী’
হযরত মারিয়াম (আ.)-কে কুরআনে “বিশ্বজগতের নারীদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব” দেওয়া হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় শিয়া মতাদর্শী আলেমরা বলেন:
- মারিয়াম (আ.) ছিলেন তাঁর সমসাময়িক যুগের বিশ্বের সকল নারীর সর্দার।
- পক্ষান্তরে, ফাতেমা (রা.) হলেন জান্নাতের (পরকালের স্থায়ী জগতের) সকল নারীর সর্দার। পরকালের মর্যাদা যেহেতু ইহকালের চেয়ে স্থায়ী ও উচ্চতর, তাই ফাতেমা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
খন্ডন:
- এই রকম ব্যাখ্যা সুন্নী মূলধারায় গ্রহণযোগ্য নয়।
- ইবনে কাসীর (তাফসীর, সূরা আলে ইমরান: ৪২): “نِسَاءِ الْعَالَمِينَ” সকল যুগের নারীদের বোঝায়, শুধু মরিয়ম (আ.)-এর যুগ নয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি সার্বজনীন।
- ইবনে হাজার (ফাতহুল বারী): কুরআনের নসকে সীমাবদ্ধ করে না। ইমাম নববী ও সুয়ূতী: “আলামিন” সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য বলে গ্রহণ করেন।
সুন্নী বনাম শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
১. সুন্নী দৃষ্টিভঙ্গি
সুন্নী আলেমরা চারজন নারীকে (মরিয়ম, ফাতেমা, খাদিজা, আসিয়া) জান্নাতের শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করেন, কিন্তু মরিয়ম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্বকে সার্বজনীন এবং অকাট্য বলে গ্রহণ করেন কারণ কুরআন সরাসরি ঘোষণা করেছে (সূরা আলে ইমরান: ৪২)। ফাতেমা (রা.)-এর মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ (জান্নাতের নারীদের নেত্রী), কিন্তু মরিয়ম (আ.) ব্যতীত। এটি “একই এলিট স্তর” নয়—কুরআনের প্রাধান্যের কারণে মরিয়ম (আ.)-কে উচ্চতর রাখা হয়।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী ৩৪৩২ (আপনার উল্লেখিত হাদিস): আলী (রা.) থেকে বর্ণিত—রাসূল (সা.) বলেছেন: “خَيْرُ نِسَائِهَا مَرْيَمُ ابْنَةُ عِمْرَانَ، وَخَيْرُ نِسَائِهَا خَدِيجَةُ” (অর্থ: মরিয়ম বিনতে ইমরান তাঁর যুগের নারীদের মধ্যে সেরা ছিলেন, এবং খাদিজা এই উম্মাহর নারীদের মধ্যে সেরা।)
- এটি যুগভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব নির্দেশ করে, সার্বজনীন নয়। কুরআনের আয়াত (৩:৪২) মরিয়ম (আ.)-কে সকল যুগের নারীদের উপর শ্রেষ্ঠ বলে।
- ইবনে কাসীর (তাফসীর, সূরা আলে ইমরান: ৪২): “আল্লাহ মরিয়মকে সকল জগতের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন” — এটি সার্বজনীন।
- ইমাম নববী (শারহু মুসলিম): হাদিসের “ইল্লা মারিয়াম” অংশটি কুরআনের কারণে ব্যতিক্রম।
২. শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি
শিয়া আকিদায় ফাতেমা (রা.)-এর মর্যাদা কেবল জান্নাতের নেত্রী হিসেবে নয়, বরং মহাজাগতিক বা আধ্যাত্মিক দিক থেকেও অনন্য।
- পরিভাষা: শিয়ারা তাঁকে “সাইয়্যিদাতুন নিসা আল-আলামিন” (বিশ্বজগতের নারীদের নেত্রী) বলে থাকেন।
- পার্থক্য: শিয়া মতানুসারে, ফাতেমা (রা.)-এর মর্যাদা মারিয়াম (আ.)-এর চেয়ে অকাট্যভাবে এবং সকল দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। তারা মনে করেন, ইমামতের ধারা তাঁর মাধ্যমেই পৃথিবীতে টিকে আছে, তাই তাঁর মর্যাদা অন্য তিন নারীর চেয়ে যোজন যোজন উপরে।
রেফারেন্স:
- শিয়া সোর্সে (যেমন বেহারুল আনওয়ার, আল-কাফি): ফাতেমা (রা.)-কে “সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামিন” বলা হয়।
- শিয়া আলেমরা (যেমন আল্লামা তাবাতাবাই, আয়াতুল্লাহ খুই): ফাতেমা (রা.) মরিয়ম (আ.)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
উপসংহার
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিকোণ থেকে:
- কুরআনের সরাসরি নসের কারণে হযরত মরিয়ম (আ.) সকল যুগের নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
- হযরত ফাতেমা (রা.) জান্নাতের নারীদের সাইয়্যিদাহ এবং উম্মাহর নারীদের জন্য সর্বোচ্চ আদর্শ।
- উভয়ের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই; এটি একটি মধুর সম্মানের বিষয়।
আমাদের করণীয়:
- উভয় মহীয়সী নারীকেই অগাধ সম্মান ও ভালোবাসা করা।
- তাঁদের মর্যাদা নিয়ে অযথা তুলনা বা বিতর্কে জড়ানো থেকে বিরত থাকা।
- রাসূল ﷺ-এর সাহাবী ও আহলে বাইতকে যে সম্মান দেওয়ার নির্দেশ আছে, তা পালন করা।
যখন আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর প্রিয় দুই নারীকে সম্মান করতে গিয়ে আমরা একে অপরের সাথে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় প্রতিযোগিতা করি, তখন সেটাই আসল ইবাদত। তাঁদের মর্যাদা নিয়ে বিতর্কের চেয়ে তাঁদের অনুসরণ করাই আমাদের জন্য উত্তম।
আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁদের পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।