অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” বই রিভিউ এবং পর্যালোচনা
মেজর এম এ জলিলের সাহসী প্রতিবাদের সত্যতা যাচাই।
মেজর এম এ জলিলের লেখা অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি চিন্তা-উদ্দীপক এবং বিতর্কিত প্রবন্ধ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মেজর জলিল এই বইয়ে তার অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ এবং তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই বইটি পাঠকের সামনে ইতিহাসের একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে, যা অনেকাংশে প্রচলিত বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক।
সূচীপত্র
Toggle
এই রিভিউতে আমি ঐসমস্ত বিষয়গুলোর সত্যতা বা প্রমাণ যাচাইকরণের চেষ্টা করব, যেগুলোর তথ্য প্রমাণ লেখক বইটিতে উপস্থাপন করেন নি । আমাদের উদ্দেশ্য লেখকের এই বইকে সত্য বা মিথ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য ইতিহাসের মানদন্ড এবং তথ্যের আলোকে তার অভিযোগ বা এই বইয়ে উপস্থাপিত বিষয়গুলো কতটুকু সত্য তা কিছূটা হলেও যাচাই করা।
“বইটির অধ্যয়ন পাঠককে শুধু অতীত নয়, নিজের বর্তমান অবস্থান নিয়েও আত্ম-অনুসন্ধানে ঠেলে দেয়। এই দিকটিই বইটির অন্যতম বড় শক্তি।”
বই পরিচিতি
- বইয়ের নাম: অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা
- লেখক: মেজর (অবঃ) এম এ জলিল
- প্রকাশক: কমল কুঁড়ি প্রকাশন / ইতিহাস পরিষদের পক্ষে
- প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০১৫
- দ্বিতীয় মুদ্রণ: জুলাই ২০১৯
- পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭২
- মূল্য: (১২৫ – ২৫০) টাকা
- ISBN: 984-830-055-4
বইটির পটভূমি ও প্রাসঙ্গিকতা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শত শত বই লেখা হয়েছে। কিন্তু “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” আলাদা। কারণ এটি প্রচলিত ধারার ইতিহাস নয়; বরং এক মুক্তিযোদ্ধার ক্ষোভ, হতাশা ও নির্মম সত্যের দলিল।
মেজর এম এ জলিল, যিনি ১৯৭১ সালে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন, এই বইয়ে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ের বাস্তবতা। তার চোখে দেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানে শুধুমাত্র পতাকা উড়ানো নয়; বরং নৈতিকতা, গণতন্ত্র, এবং সত্যিকার স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা।
“এই বইটি তরুণ সমাজ, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক ও সমাজ সংস্কারকদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
এটি শুধু ইতিহাস জানায় না, বরং নিজের অবস্থান ও দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে।”
মূল বিষয়বস্তু ও উদ্ধৃতি
১. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে তামাশা
লেখকের মতে, স্বাধীনতার পরবর্তী ১৭ বছর কয়েকটি সরকার ক্ষমতায় আসলে তারা চেতনার নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংসই করে গেছে। তিনি বলেন –
”মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে ধরার শপথ নিলেও স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকে অদ্যাবধি প্রত্যেকটি সরকারই কার্যত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্মূল করার লক্ষ্যেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।” [পৃষ্ঠা ১৩]
”শোষণ জুলুমের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম পরিচালনা করার অগ্নি শপথপুষ্ট চেতনার নামই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।” [পৃষ্ঠা ১৩]
একই পৃষ্ঠায় লেখক আরও তুলে ধরেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জমি, বাড়ী, অর্থ আর পদোন্নতি দানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করার নাটকের কথা। এভাবেই ভোগ বিলাসী শাসকগোষ্ঠিগুলো এ জাতির ভবিষ্যতকে নির্দয়ভাবে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে।
আমরা যদি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট চিন্তা করি, লেখকের এই উক্তিগুলো যে কতক্ষাণি বাস্তব ছিল, তা এখন দিনের আলোর মতো সত্য হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বয়ান নিয়ে এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা নানা সুবিধাভোগের জন্য আজ নানা রাজনৈতিক বিভাজনে আবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযোদ্ধারা এদেশের সম্পদ হলে এত বিভাজন কিসের?
২. শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের অস্বাভাবিক পরিণতির কারণ

লেখকের ভাষায়,
”এসব কিছুর ফলেই একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ’প্রাণকেন্দ্র’ মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীনতার ঘোষক বলে পরিচিত জনাম জিয়াউর রহমান উভয় রাষ্ট্রপ্রধানই অস্বাভাবিক পরিণতির শিকার হয়েছেন।”
”দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতাই উভয় নেতার অস্বাভাবিক তিরোধানের অন্যতম কারণ।” [পৃষ্ঠা ১৪]
দু:খজনক হলেও সত্য শেখ মুজিবুর রহমান এ জাতির নির্মাতাদের একজন ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর যেই অনিয়ম, দুর্ভিক্ষ, অপশোষণ এবং লুটতরাজ শুরু হয়েছিল, তা ইতিহাস ঘাটলেই বুঝা যায়। তার নির্মিত বাকশাল সম্পর্কে কারোই এখন অজানা নয়। অন্যদিকে, জিয়াউর রহমানও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। তার নেতৃত্বে আমরা মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা গ্রহনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়তে থাকে।
৩. অভিশপ্ত আমলাতান্ত্রিক প্রশাসণ
স্বাধীনতার ১৭ বছর পর বইটি লিখা হলেও, আজকে পর্যন্ত এ দেশ আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের কাছে জিম্মি। এদেশে যখন যে ক্ষমতায় এসেছে সেই এই অভিশপ্ত কাঠামোর উপরে ভর করে স্বৈরাচার হয়ে ওঠার চেষ্টা করে গেছে। এই একই বিষয় স্বাধীনতার পর থেকেই ছিল এবং তা এখনও আছে।
লেখকের ভাষায়,
”আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন জনগণকে প্রশাসনমুখী করে তোলে, প্রশাসন এ অবস্থায় কখনো জনমুখী হয় না। প্রশাসন জনশক্তির বিকাশ সাধনে ব্রতী নয়, জনশক্তিকে অসহায়ভাবে প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল করে তোলাই হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের লক্ষ্য।
আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে জনগণকে মুক্তির আশ্বাসদান জনগনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারই শামিল। এই সত্যকে অনুধাবক করার মতো জ্ঞান প্রত্যেক সরকারেরই ছিল। ছিলনা, শুধু এই প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করে গণমুখী ব্যবস্থা প্রবর্তন করার সদিচ্ছা।” [পৃষ্ঠা ১৫]
এই আমলাতন্ত্র নিয়ে লেখকের প্রতিটি কথা ১০০% সত্য বলে বিবেচিত। আজকে দেশের এই অবস্থা এবং প্রতিটি সৈরাচার সৃষ্টির পেছনে মূল কারণ হিসেবে অন্যতম এই আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন।
৩. মুক্তিযোদ্ধাদের পূনর্বাসনের সার্কাস

স্বাধীনতা উত্তর প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলগুলোই মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের নামে কিছু সুবিধাদানের মাধ্যমে তাদেরকে টুলস হিসেবে এ যাবৎ ব্যবহার করেছে। তারা পরিণত হয়েছে, কোন না কোন নির্দিষ্ট স্বার্থবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠিদের কামলায়। তারা আজ নির্লজ্জভাবে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
লেখকের ভাষায়,
”যে জাতির যোদ্ধারাই পুনর্বাসনের স্তরে নেমে যায়, সে জাতির পুনর্গঠন তো দূরে থাক, তাদের সার্বভৌমত্বই হয়ে পড়ে বিপন্ন। জাতির বীরযোদ্ধারাই যদি হয়ে পড়ে করুনার পাত্র, করে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন, সে জাতির সাধারণ জনগণের ভোগান্তি আর দূর্দশার যে কোন সীমা থাকেনা, তা আজ আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করলেই স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়। [পৃষ্ঠা ১৭]
১৯৮৮ সালে লেখা এই বইটির এই লাইনগুলো আপনি কোনভাবেই প্রত্যাখান করতে পারবে ন কি? আমাদের মহান যোদ্ধারে আজ কলঙ্কিত হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কি এই সুবিধাভোগী চিন্তা ছিল না? আজকে কেন প্রতিটি সরকার মুক্তিযোদ্ধা এবং তার সন্তানসহ নাতি পুতিদেরও অসম এবং বৈষম্যমূলক সুবিধাদানে ব্যস্ত? কারণ একটাই, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে রেখে দেশ লুটে খেতে চায় আর এতদিন যাবৎ তারা এটাই করে এসেছে। আর এই দেশের অবনতির জন্য অনেকাংশেই দায়ী এই মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি অংশ।
৪. ইসলামের স্থানান্তর
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ”ধর্ম নিরপেক্ষতার” বয়ান ছিল একটি ষড়যন্ত্র যা ইসলামকে মূলোৎপাটিত করার প্রথম ধাপ ছিল।
লেখকের ভাষায়,—
“তৎকালীন সময়ে কট্টর আওয়ামী লীগার বলে পরিচিত নেতা-কর্মীদের মুখে “ধর্মনিরপেক্ষতার নামগন্ধও শুনতে পাই নি।” [পৃষ্ঠা ২১]
মেজর জলিল প্রশ্ন তুলেছেন—
“মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের ইসলাম আর পরের ইসলাম—এর মধ্যে হঠাৎ এমন কী হলো, যাতে ইসলাম নিয়ে কথা বললেই কিছু মহল পাগলা কুকুরের মতো খিঁচিয়ে ওঠে ……… ?” [পৃষ্ঠা ২১]
বর্তমান বাংলাদেশেও একদল তথাকথি সুশীলগ্রুপ আছে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা প্রমোট করেই চলেছে। মুলত, তাদের প্রকৃত লক্ষ্য ভারতের তাবেদারী করা আর ইসলাম কুপানো।
লেখক আশংকা করেছেন –
স্বাধীনতা বিরুধী প্রায় সকল দল ও গোষ্ঠী যেহেতু ইসলামভিত্তিক, সেহেতু ইসলামই সমালোচার বস্তু হয় দাঁড়িয়েছে।
স্বাভাবিক কারণেই ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ চেতনার পক্ষের শক্তি। [পৃষ্ঠা ৬৪-৬৫]
মূলত, ভারত আর পাকিস্তান বিভাজনের কারণ ছিল ধর্ম। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল মুসলমান। এই মুসলমানদের মধ্যে ইসলামিক রাজনীতিতে যারা জড়িত ছিলেন তারাই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী ছিলেন এই অবস্থান পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় পাকিস্তানেই একই ছিল। অন্যদিকে, বিভাজনের পর ভারতের বাংলা রাজ্য আওতাধীন করার স্বপ্নভঙ্গ হয়। আর এই ভঙ্গের পিছনে একটাই করাণ ছিল। তা হল ইসলাম।
লেখক আর বলেন –
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকালে এই ইসলাম এলার্জী শিক্ষিত সমাজের মধ্যে একটা মানসিক ব্যাধির ন্যায়ই বিরাজ করছে। ইসলামের কথা শোনামাত্রই তারা বিরক্তি ও ঘৃণাভরে কতকটা তোতাপাখীর মতনই কতিপয় শব্দ উচ্চারণ করে বসে …….. ।
আমাদের মতো মুসলিম প্রধাণ দেশে ইসলামহীন স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থে গণমানুষের স্বাধীনতা নয়, ঠিক তেমনি স্বাধীনতাহীন ইসলামও গণমানুষের ইসলাম নয়, তা থেকে যায় ‘দরবারী ইসলাম’ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীল প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত ইসলাম।
[পৃষ্ঠা ৬৫]
এদেশের জনগণ তথা বিশেষত মুসলানদের মধ্যে ইসলামের প্রতি যে আবেগ তা বিস্ফোরিত হলে যে কোন সময় ভারতের জন্য হুমকি হতে পারে এটা ভারত ভাল করেই জানত। হিন্দু দাদাদের জমিদারিত্ব ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন নসাৎ হয় কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রাণের ধর্ম ইসলামের কারনেই। তাই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারত তার তাবেদার বাহিনী এবং পোষা রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্যবহার করে ইসলামকে ধাবিয়ে রাখার জন্য। বর্তমান যে সমস্ত সুশীলরা ইসলামকে প্রতিবন্ধকতা মনে করে, তারা বস্তুতই হয় অজ্ঞ না হয় তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাবেদার ও দালাল।
লেখক, ইসলাম বিদ্বেষীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে,
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ ছিল, ধর্মযুদ্ধ ছিল না। [পৃষ্ঠা ৬৬]
অথচ এই তথাকথিত সেকুলার বুদ্ধিজীবিরা এটাকে ধর্মযুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে ইষলামকে খাট করতে চায়।
৫. শেখ মুজিবের স্বাধীনতা নিয়ে স্ববিরুধী ভূমিকা এবং চেতনার অভাব
লেখকের মতে, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়ে যায়, তাহলে শেখ মুজিব কেন ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠি তথা শত্রুপক্ষের সাথে বৈঠকে বসার আশা পোষণ করেছিলেন? ইয়াহিয়া খানের সাথে কেন এবং কোন প্রত্যাশায় বৈঠকে বসতে চেয়েছিলেন? তাহলে কি ক্ষমতার মসনদে বসাই তার উদ্দেশ্য ছিল?
লেখক শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন –
“একটি জাতীয়তাবাদি আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ই হচ্ছে স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং তেমন একটি ঐতিহাসিক পর্বে নেতৃত্বদানের লোভ আর মোহ থাকলেই নেতা হওয়া যায় না। শ্রেণীগত দূর্বল চরিত্রের কারণে শেখ মুজিবের মধ্যকার দোদুল্যমানতা এবং সংশয়ই তাঁকে স্ববিরোধী ভূমিকায় লিপ্ত করেছে।”
”শেখ মুজিব একদিকে ছাত্র নেতৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করে স্বাধীনতার পক্ষে যেমন কাজ করেছেন, ঠিক তেমনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্নসমর্পনের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানকে রক্ষা করতে। শেখ মুজিবের এই স্ববিরুধী ভূমিকার জন্য ইতিহাস একদি ন তাঁকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করালে তাতে বিষ্ময়ের কিছু থাকবে না।”
[পৃষ্ঠা ২৫]
তিনি আরও বলেন –
”এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—এটি আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। বরং ছাত্রদের চাপেই শেখ মুজিবুর রহমান এই স্লোগান দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।” [পৃষ্ঠা ২৭]

মূলত ৭ই মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না- এই মর্মে অনেক যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব। নিচে মেজর জলিলের স্বপক্ষে কিছু যুক্তি পেশ করা হল।
ঐতিহাসিক দলিল ও বিশ্লেষণ:
- সাউথ এশিয়া জার্নাল: উল্লেখ করা হয়েছে, ৭ই মার্চের ভাষণ “স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, বরং জনগণকে সজাগ এবং প্রতিরোধের জন্য আহ্বান” ছিল। এখানে উল্লেখ্য করা হয় – “Mujib’s 7th March 1971 Speech at the Racecourse Maidan was not a declaration of independence per se. It was a warning to the Pakistani establishment of the danger of delay in transfer of power and at the same time, alerted the (the then) East Pakistanis against future assaults.”
- যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তর (U.S. Department of State): ডিক্লাসিফাইড রিপোর্টে বলা হয়েছে, মুজিব “স্বাধীনতার ঘোষণার দিক থেকে কিছুটা পিছু হটেছেন,” অর্থাৎ ভাষণটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। এখানে বলা হয় – “While East Pakistani leader Mujibur Rahman has stepped back a bit from a declaration of independence, the full text of his March 7 speech/3/ conveys a harsher tone than the initial summary reports, and it seems apparent that his retreat was tactical”
- বই: History of Bangladesh 1704-1971 by Sirajul Islam (1992): এই বইয়ে সিরাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল “a turning point in the movement for autonomy, setting the stage for independence” কিন্তু এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। তিনি ২৬ মার্চের ঘোষণা ও ১০ এপ্রিলের মুজিবনগর সরকারের প্রতিষ্ঠাকে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেন (পৃষ্ঠা ৬৭৮-৬৮০)।
- মুজিবনগর সরকারের দলিল (১০ এপ্রিল ১৯৭১): মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাপত্রে (Proclamation of Independence) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই দলিলে ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে নয়। (উৎস: Documents of the Liberation War, Vol. 3, Bangladesh Government Archives)।
- ইউনেস্কোর স্বীকৃতি (২০১৭): ইউনেস্কো ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু এটিকে “a call for freedom and resistance” হিসেবে বর্ণনা করেছে, স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে নয়। এটি ভাষণের প্রেরণাদায়ক ভূমিকার উপর জোর দেয়। (উৎস: UNESCO Memory of the World Register, 2017)।
মেজর জলিল স্বাধীনতা পরবর্তী শেখ মুজিবের ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন –
”মুক্তিযুদ্ধের জনক হিসেবে পরিচিত মরহুম জনাব শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধেল চেতনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও সেই চেতনায় তিনি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন না বলেই ক্ষমতালাভের পরে তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে মারাত্নক দ্বন্দ্ব এবং অস্থিরতা, যার ফলে তিনি কখনো হয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবার কখনো দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধাণমন্ত্রীত্বের। ”[পৃষ্ঠা ৩২]
লেখক যে, শেখ মুজিবুর রহমানের উপর কোন কারণে ক্ষিপ্ত ছিলেন, তা তার উপরে কথাগুলো লক্ষ্য করলে বুঝা যায়। তার ক্ষোভের কারণ যাই হোক না কেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জাতির এই অবিসংবাদিত নেতার আচরণগুলো ছিল অনাকাঙ্খিত যা তার ও তার দলের জনপ্রিয়তা রাতারাতি শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল।
৬. মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ও বিকৃতি
মুক্তিযুদ্ধের গৌরব সমগ্র জাতির। এটি কোনো দল বা ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়। যখন কেউ এটি নিজেদের কৃতিত্ব মনে করে, তখনই ইতিহাস বিকৃতি শুরু হয়।
”১৯৭১ সালের সশস্ত্র গণ বিষ্ফোরণ শেষ পর্যন্ত যে, একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের রুপ নিতে সক্ষম হয়েছে, তার কৃতিত্ব কোন একক নেতৃত্বের নয়, সমগ্র সংগ্রামী জনগোষ্ঠীই সে কৃতিত্বের দাবীদার।” [পৃষ্ঠা ২৬]
“রক্তক্ষয়ী বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের গৌরব পুরো জাতির। একে একক কৃতিত্বের দাবি করলেই ইতিহাস বিতর্কিত হয়।”
বর্তমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রায় সব দলই গৌরব করেন। বাংলাদেশের বৃহৎ দুটি বড় দল আওয়ামীলিগ ও বিএনপির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের করে উপস্থাপন করার যেই মোহড়া লক্ষ্য করা যায়, তা অস্বীকার করা কোন সুযোগ আছে কি? তাহলে যারা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ছিল বা এই দুই দলের বাহিরে তাদের কি কোন কৃতিত্ব নেই?
লেখক আরও বলেন –
যুদ্ধোত্তরকালে আওয়ামীলিগ চরম সংকীর্ণতার পরিচয় দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় রুপকে দলীয় রুপ প্রদানের জন্য বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। [পৃষ্ঠা ৬৮]
এই দলীয়করনের খেলা আজও অব্যহত আছে। এক্ষেত্রে, বর্তমানে বহুল প্রচলিত একটি বাক্য হচ্ছে – “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল।” কি চরম উপহাস!
৭. আওয়ামী লীগের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুপস্থিতি
মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি – এই দুই বিষয়েই আওয়ামীলীগ নেতারা ছিল উদাসীন। তাদের ভাষ্যমতে, পাক সেনাবাহিনীর আক্রমণ ছিল আকষ্মিক এবং অপ্রত্যাশিত।
লেখকের ভাষায়,
”আওয়ামী লীগে অধিকাংশ নেতৃবৃন্দের ভাষায়, “তারা কল্পনাও করতে পারেনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী অমন বর্বর আক্রমণ করবে”। উপরিউক্ত মন্তব্য থেকে এটি পরিস্কার যে, আওয়ামীলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দদে চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের ধ্যান-ধারণার কোন অবস্থানই ছিল না।” [পৃষ্ঠা ২৭]
তিনি আরও বলেন,
”পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধের ঘোষণা হচ্ছে, আর সেই দলের নেতারা বিষ্ময় প্রকাশ করছেন শত্রপক্ষের হামলার ধরণ দেখে। ….
জাতির প্রচন্ড রক্তক্ষরণ ঘটে গেছে বলে ঐ সকল নেতাদের দায়িত্বহীনতা, চেতনাহীনতা এবং অপদার্থতাই প্রমাণিত হয়েছে তাদের ঐ ধরনের বিষ্ময়বোধ থেকে। এতো গেল আওয়ামীলীগের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি নমুনা মাত্র।” [পৃষ্ঠা ২৮]
প্রকৃতপক্ষে, তৎকালীন আওয়ামীলিগের অধিকাংশ নেতাদের ভিতরে যে মুক্তিযুদ্ধের কোন ভাবনা ছিল না, তা সন্দেহাতীতভাবে হলেও কিছু ঘটনা লক্ষ্য করলে বুঝা যায়। যেমন – ৭ই মার্চের ভাষণ, যা তারা স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে প্রচার করে, যদি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাই হত, তাহলে শেখ মুজিবুর রহমান শাসকগোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি না নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার চিন্তা করতেন না। এমন ভবিষ্যত যুদ্ধের জন্য কোন প্রস্তুতিও তাদের ভিতরে দেখা যায় নি।
৮. দুই ধরনের মুক্তিযোদ্ধা – প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবপ্রেমী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দুই গোষ্ঠীর ব্যাপারে লেখক আলোকপাত করেছেন।
প্রথমত, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাদের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরাজমান ছিল। এই লিস্টে ছিলেন, তৎকালীন ছাত্রসমাজের সর্বাধিক ক্ষুদ্র অংশবিশেষ, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, সর্বহারা পার্টি, সেনাবাহিনী, পলিশ, আনসার এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক ব্যক্তিবর্গ যারা পাকিস্তানমুক্ত স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন।
দ্বিতীয়ত, মুজিব প্রেমী মুক্তিযোদ্ধা যাদের ভিতরে ছিল যশ-খ্যাতি বা সুবিধার্জনের লোভ লালসা, অন্ধ আবেগ ও উচ্ছাস এবং এডেভ্যাঞ্চারিজম।
লেখকের ভাষায়, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে মুজিবপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাই ছিল বেশি।
তিনি বলেন,
”যাদের কাছে কেবল শেখ মুজিবই ছিল চেতনা ও আদর্শের বিকল্প, তারা মুক্তিযুদ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনার অভাবে মুক্তিযুদ্ধে এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে অন্ধ আবেগের বশে বিভিন্নভাবে বাড়াবাড়ি করেছে এবং আজ পর্যন্ত করে চলেছে। [পৃষ্ঠা ৩০]
বর্তমানে বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দটার অপব্যবহার করেন সবচেয়ে বেশি তারা প্রায় সবাই এই ২য় শ্রেনীর মুজিবপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধাদের অংশবিশেষ।
লেখক, এই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে আক্ষেপ করে বলেন –
”তারা এ কথাটি জানতনা বা বুঝত না যে, কেবল অস্থানীয় শাসকগোষ্ঠী বিতাড়িত হলেই দেশ ও জাতি শোষণহীন বা স্বাধীন হয় না। অস্থানীয় শোষকের স্থানটি যে, স্থানীয় শোষক ও সম্পদলোভীদের দ্বারা অতি দ্রুত পূরণ হয়ে যাবে, এ বিষয়টি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জ্ঞান বা বোধশক্তির বাহিরে ছিল। [পৃষ্ঠা ৩১]
৯. আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মোহভঙ্গ
এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুজিবপ্রেমী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতরে স্বাধীনতা লাভের পর স্বাধীনতা ভোগের চিন্তা চেতনা এবং অফুরন্ত আশা ছিল। কিন্তু তাদের আশা ভেঙ্গে যায়।
মেজর এম এ জলিল লিখেছেন –
”তারা যখন প্রত্যক্ষ করল কেবল শাসক আওয়ামী লীগের লোকজনের জন্যই ভোগ এনেছে, তাদের জন্য নয়, তখন তারা আওয়ামী লীগ থেকে রাতারাতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কারণ যেখানেই প্রত্যাশা, সেখানেই হতাশা। এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় যারা আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক ছিল, তারা দেশে প্রত্যাবর্তন করে যখন দেখল আওয়ামী লীগই তাদের ভিটে-ভুমি ‘শত্রু সম্পত্তি’র নাম দিয়ে দখল করে নিচ্ছে, তখনই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তাদের মোহভঙ্গ হতে শুরু করে।” [পৃষ্ঠা ৩১]
তিনি আরও বলেন –
”আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যেও তদ্রুপ পরিলক্ষিত হয়েছে দোদূল্যমানতা এবং সীমাহীন ক্ষমতা লাভের মোহ। তারা সকলেই কেবল ক্ষমতার স্বাদ মিটিয়েছে কারণ মুক্তিযুদ্ধ তাদের কাছে ছিল কেবল ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার মাত্র, চেতনার উৎস নয় “ [পৃষ্ঠা ৩২]
লেখকের, আওয়ামীলিগের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের অসংখ্য প্রমাণ বর্তমানেও বিদ্যমান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও (যারা প্রায় সব সময়ই আওয়ামীলিগকে সমর্থন করেন), সবচেয়ে বেশি আক্রমণ ও অবিচারের স্বীকার হন, আওয়ামীলিগের দ্বারাই। তবে অন্যান্য সরকারের আমলে যে তারা পুরোপুরি নিরাপদ ছিলেন তাও না।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার বলেন, “স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২-৭৪ এবং গত ১৬ বছরে আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুরা এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্নমতাবলম্বী মুসলিমরা পর্যন্ত নানাভাবে নির্যাতিত, নিগৃহীত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭১ সালের গণহত্যা এবং ২০০১ সালের সহিংসতার ক্ষেত্রে কিছু নথিভুক্ত তথ্য পাওয়া গেলেও, ১৯৭১-এর পরবর্তী সময়ের জন্য ব্যাপক এবং সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের অভাব রয়েছে। লেখকের করা আওয়ামীলিগের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাব বা তথ্যের উৎস অনুসন্ধান করলে খুব বেশি কিছু পাওয়া কঠিন। তবে সাম্প্রতিক আওয়ামীলিগের শাসনামলের চিত্র দেখলে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের চিন্ত্র কিছুটাও অনুধাবন করার যায়।
শুধুমাত্র ২০০৯-২০১৩ সালের মধ্যেই সংখ্যালঘুদের উপর ব্যাপক নির্যাতনের ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে আওয়ামীলিগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, –
- রামু ঘটনা (২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২): রামু ও উখিয়ায় বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার জন্য আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আনছারুল হক ভুট্টো এবং ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। প্রকাশিত ছবিকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
- বিশ্বজিৎ দাস হত্যা (৯ ডিসেম্বর ২০১২): ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা হিন্দু দর্জি বিশ্বজিৎ দাসের নৃশংস হত্যার উল্লেখ। আদালত দোষীদের ফাঁসির আদেশ দেয়, যা একটি বিরল বিচারের উদাহরণ।
- অন্যান্য ঘটনা (২০০৯-২০১৩):
- ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯: পিরোজপুরে চারটি সংখ্যালঘু পরিবারের পানের বরজ ও খড়ের গাদায় আগুন।
- ৫ মার্চ ২০০৯: সাতক্ষীরায় ১২ বিঘা চিংড়িঘের দখল।
- ১৯ এপ্রিল ২০০৯: দিনাজপুরে ১১৩টি ভূমিহীন পরিবারের উচ্ছেদ।
- ২০ এপ্রিল ২০০৯: কেরানীগঞ্জে অজিত করাতির হত্যা।
- মে ২০০৯: সাতক্ষীরায় ঘোষাল পরিবারের ৩৮ বিঘা জমি দখল।
- ১১ জুলাই ২০০৯: দোহারে নৃপেন মালাকারের জমি দখল।
- ৫ মার্চ ২০১২: নাটোরে তিনটি সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি পোড়ানো।
- ১৫ মে ২০১২: মৌলভীবাজারে খ্রিস্টান কবরস্থান দখল।
- ২৮ মে ২০১২: সিলেটে ৩৩ বছরের বন্দোবস্তীয় দোকান দখল।
- ২৫ জুলাই ২০১২: নরসিংদীতে শ্মশানের জমি দখল ও চারটি বাড়ি ভাঙচুর।
- ২২ আগস্ট ২০১২: ঢাকায় হিন্দু পরিবারের উপর হামলা ও অপহরণ।
- ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১২: পিরোজপুরে মন্দিরের জমি নিয়ে সংঘর্ষ।
- ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১২: মাদারীপুরে পুলিশ কর্তৃক প্রতিমা ভাঙচুর।
- ২০ ডিসেম্বর ২০১২: সাতক্ষীরায় ৩০০ বিঘা ঘের দখল।
- ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: চট্টগ্রামে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন।
- ২৭ মার্চ ২০১৩: কুষ্টিয়ায় তিনটি হিন্দু পরিবারের উপর হামলা।
- ৩১ মার্চ ২০১৩: বগুড়ায় চারটি প্রতিমা ভাঙচুর।
- ১০ এপ্রিল ২০১৩: কলাপাড়ায় রাখাইন শ্মশান দখল।
- ২২ অক্টোবর ২০১৩: কাফরুলে খ্রিস্টান সম্পত্তি দখল।
- ২ নভেম্বর ২০১৩: পাবনায় হিন্দুদের উপর নির্যাতন।
- ৪ ডিসেম্বর ২০১৩: বগুড়ায় সংখ্যালঘু পরিবারকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা।
২০১৪ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা: মালোপাড়া, ঠাকুরগাঁও, এবং অন্যান্য স্থানে হামলার জন্য আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রঞ্জিত কুমার রায়ের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়, যিনি দাবি করেন যে প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবদুল ওহাবের ক্যাডাররা হিন্দুদের উপর হামলা চালিয়েছে।
১০.মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির অবস্থান
মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিল পুরাতন মুসলীম লীগ, নেজাম-ই-ইসলাম, জামায়াত-ই-ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনসমূহ। এই শক্তিগুলো বাঙ্গালী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল না, বরং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল।
মেজর এম এ জলিল লিখেছেন –
”তাদের যুক্তি হলো যে, তারা বাঙ্গালীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয়, তবে তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সাহায্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করার পক্ষে মোটেও নয়। কারণ হিসেবে তারা মত প্রকাশ করেছেন যে, পাকিস্তানী শাসক-শেষকের শোষণ-জুলুম থেকে মুক্ত হয়ে ভারতীয় শাসক-শোষকদের অধীনস্থ হওয়াকে স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচনা করার কোন যুক্তি নেই।
তারা ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মুসলমানদের বাসভূমি সৃষ্ট পাকিস্তানকে কেবল দ্বিখন্ডিত করতে আগ্রহী নয়, বরং দ্বিখন্ডিত করার পরে পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশকে সর্বোতভাবেই গ্রাস করার হীন পরিকল্পনায় লিপ্ত। এমন যুক্তিকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় সাধারণ দেশবাসী মনেপ্রাণে মেনে না নিলেও একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারেনি, কারণ এ কথা অতীব সত্য যে, এদেশের জনগণের মধ্যে একটা স্বাভাবিক ভারতভীতি বিদ্যমান।” [পৃষ্ঠা ৩৬]
তৎকালীন ইসলামী দলগুলো তথা অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধ বিরূধী (বাঙ্গালীর স্বাধীনতা বিরুধী নয়) দলগুলোর অবস্থান যে, কতক্ষাণি প্রেডিকটেবল ছিল তা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বুঝা যায়। ভারতীয় আগ্রাসনে পড়ার যে আশংকার জন্য তারা পাকিস্তান আলাদা করতে না চেয়ে ভেতর থেকেই অধিকার রক্ষার চিন্তা করেছিলেন তা আজ ঐতিহাসিকভাবে হলেও বাস্তবতার আলোকে প্রমাণিত।
“পাকিস্তান ছিল একটি তড়িঘড়ি গড়া দুর্বল কাঠামো (Jerrybuilt Structure), যা কেবল ভারতের প্রতি ঘৃণার মাধ্যমে টিকে ছিল—আর এই ঘৃণাকে প্রতি প্রজন্মের পাকিস্তানি নেতা নতুন করে উসকে দিচ্ছিল।”
— ইন্দিরা গান্ধী (অক্টোবর/নভেম্বর ১৯৭১, FRUS, খণ্ড XI অনুযায়ী)
এই উক্তিটি সমগ্র ভারতের তৎকালীন পাকিস্তানের প্রতি বিরুপ মনোভাব প্রকাশ করে। মূলত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান বিভাজন ঘটলেও পাকিস্তান সরকার কাজে কর্মে ছিল সেকুলারপন্থী। তাদের ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা আর বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য ছিল।
তৎকালীন ইসলামী দলগুলো ধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিল। অপরদিকে, তারা ভারতীয় আগ্রাসনের ভয় যে করত, তাও ইতিহাস ঘাটলে বুঝা যায়। তাদের এই ভয়, তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী করে তুলে, কিন্তু বাঙ্গালীর স্বাধীনতা বিরুধী নয় (লেখকের ভাষা অনুযায়ী)।
লেখক এ প্রসঙ্গে আরও বলেন –
বিদেশী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখা এবং সতর্কতা অবলম্বন করার অর্থ এই নয় যে, জনগণের স্বত:স্ফুর্ত আবেগ ও অনুভূতির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা কিংবা তা অস্বীকার করা। এই হিসেবে যারাই গরমিল করেছে তারাই প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে, তাদের এই ভুলের অর্থ বোধ হয় এ দাড়ায় না যে, তারা বাঙ্গালী জনগনের সার্বিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। তারা বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বাধীনতা চেয়েছে কোন বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ ব্যতীতই। বিশেষ করে, বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হস্তক্ষেপ করাকে তারা স্বাধীনতা নয়, গোলামীরই নতুন এক রুপ হিসেবে বিবেচনা করত। স্বাধীনতা যুদ্ধ বিরোদী বলে যারা পরিচিত তারা সকলেই কম বেশি ভারত বিরুধী হিসবেই অধিক পরিচিত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকেই ভারতীয় হস্তক্ষেপ বিদ্যমান ছিল এই সন্দেহে ভারত বিদ্বেষী রাজনৈতিক দলগুলো তাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। [পৃষ্ঠা ৬১]

আমরা এদেশের ইসলামী সংগঠনগুলোকে যেমন – জামায়াতে ইসলামী, নেজামই ইসলাম ইত্যাদিকে এ যাবৎ রাজাকার-আলবদর-আশ শামস নামেই জানতাম । আমাদেরকে এটাও গেলানো হয়েছিল যে, তারা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, ধ্বর্ষক, লুটেরা ইত্যাদি। কিন্তু লেখকের এই বইটি না পড়লে হয়তো বুঝতামই না, তারা কেবল মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী ছিলেন আর তাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য যে অভিযোগগুলোর তার অধিকাংশই রাজনৈতিক।
আজকের বাংলাদেশ সব দিক থেকে ভারতের আগ্রাসনের স্বীকার। তবে, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারে এদেশের জনগণ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে দ্বিধাগ্রস্থ থাকলেও তারা যে স্বাধীনতা চেয়েছিল সেটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
১১. মুক্তিযুদ্ধে ভারতের হীনস্বার্থ
১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের সময় ভারতীয় কংগ্রেসীরা সমগ্র বাংলাকে ভারতের অংশ হিসেবে চেয়েছিল। অপরদিকে, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ আমাদের প্রিয় নেতাগণ তথা এ.কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীরা চেয়েছিলেন বাংলাকে কমনওয়েল্থভুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অজানা কারণে দেশ বিভাগের সময় বাংলা দুইভাগে ভাগ হয় যার একটি পূর্ব বাংলা আর অপরটি পশ্চিম বাংলা। সেই থেকে, ভারতীয় রাজনীতিবিদদের আক্ষেপ ছিল পূর্ববাংলাকে ফিরে পাওয়ার। সেই আক্ষেপের সমাপ্তি টানতে চেয়েছিল ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে যে সাহায্য করেছিল তা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তবে তাদের এই সাহায্য কিসের ভিত্তিতে তা আজও আমাদের অনেকেরই না জানা।
মেজর এম এ জলিল ভারতের সাহায্য করার পিছনের পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন –
”স্বার্থ ছাড়া সন্ধি হয় না। বাঙ্গালীর স্বার্থ ছিল ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশ মুক্ত করা, আর ভারতের স্বার্থ ছিল দেশ মুক্ত করার নামে তার চিহ্নিত এবং প্রমাণিত শত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার মধ্য দিয়ে শত্রুপক্ষকে স্থায়ীভাবে দূর্বল করে রাখা এবং মুক্ত বাংলাদেশের উপর প্রাথমিকভাবে খবরদারী করে পরবর্তীতে সময় ও সুযোগমত ভারতের সাথে একীভূত করে নেয়া। এটাকে কেবল তাদের নিছক স্বার্থ হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে, বরং এটা ছিল তাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন। [পৃষ্ঠা ৩৭]
লেখকের এই কথাগুলোর সত্যতাও আচ করা যায় ভারতীয় সরকারের ”অখন্ড ভারতের” মিশন লক্ষ্য করলে। বাংলাদেশকে অখন্ড ভারতের অংশ করার খায়েস তাদের যে পূর্বপরিকল্পিত ছিল, তা এখন আর বুঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন পড়ে না।
লেখক ভারতের পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও লিখেছেন –
”ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুক্তি যেদ্ধাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করার আগ্রহ প্রদর্শন যা করেছে তার তুলনায় অধিকতর উৎসাহ এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেছে তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র প্রদান নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে জরুরী তথ্য সংগ্রহই ছিল যেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্যে। তাদের এ ধরনের আচরনই তাদের গোপন লালসা পূরণের ‘নীল নকশা’ তৈরি করার ইঙ্গিত প্রদান করেছে। আমার এ সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় নি [পৃষ্ঠা ৪১]
ইন্দিরা গান্ধি ১৯৭১ সালে বলেছিলেন:
“We have sunk Jinnah’s two‑nation theory in the Bay of Bengal.”
[Source: Indira Gandhi: A Biography by Pupul Jayakar (1992)]
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের গোঁড়ামী আর ভারতীয় আধিপত্যবাদ আগ্রাসী শক্তির চক্রান্তে অবশেষে বাংলাদেশকে অখন্ড ভারতের অংশ করার প্রথম ধাপ তারা সম্পন্ন করতে সচেষ্ট হয়ে ছিল ১৯৭১ সালে।
এখন এ জাতি বুঝতে পারছে, শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধের পূর্বে তার দূরদর্শীতায় কতক্ষাণি সক্ষম ছিলেন। তার পূর্ব পাকিস্তানের ম্যানডেট আদায় করার প্রয়াস কতক্ষাণি সত্য ছিল। তিনি কি কারণে নতুন রাষ্ট্র না চেয়ে ৭ই মার্চের ভাষনের পরও আলোচনার টেবিলে বসতে চেয়েছেন, তা এখন জাতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এ জাতির এই অবিসংবাদিত নেতার হাজারটা ভুল আপনি দেখাতে পারবেন। তবে, তার অখন্ড পাকিস্তানে থাকার সিদ্ধান্ত যে, চৌকস ছিল তা ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বুঝা যায়।
ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধের এক পর্যায়ে ট্রেনিং শিবিরগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রগুলো প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় এবং ট্রেনিং শিবিরগুলোর কন্ট্রোল সরাসরি তাদের হাতেও নিতে চেয়েছিল। লেখক বলেন –
”নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবিরগুলোর দায়িত্ব সরাসরি নিচে চেষ্টা করে। আমার সেক্টরে ততটা সুবিধা করতে না পারলেও কর্তৃপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার নিয়োগ করেছিল। ট্রেনিং শিবিরগুলার অস্ত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিল। আর তখনই শুরু হয় বাকবিতন্ডা এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে। আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেই অধিকাংশ অস্ত্র বারুদ ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন নৌ-কমান্ডো নূর মোহাম্মদ বাবুল, ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর, নৌ কমান্ডার বেগের হাতে তুলে দেই এবং তাদের ভারতীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ করে দেই।
ভারত মুক্তিযুদ্ধে সকল অস্ত্র দিয়েচে একথা সত্য নয়। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থেও প্রচুর অস্ত্র ক্রয় কারা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তে সমর্পন করার কোনই যুক্তি ছিল না। [পৃষ্ঠা ৫০]
মেজর জলিল সেদিন তার জীবনের ঝুকি নিয়ে অধিকাংশ অস্ত্র আর গোলাবারুদ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ভাল করেই বুঝে গিয়েছিলন, ভারত বাংলাদেশে অভিযান চালানোর পূর্বে এই কারনেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করতে চায়, যাতে তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোন সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়। তার এই সিদ্ধান্তটিকে প্রবাসী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এবং কর্নেল ওসমানীও সমালোচনা করেন যা তাকে ব্যাথিত করেছিল।
সত্যিই ভাবতেই অবাক লাগছে। যদি মেজর জলিলের এই বিষয়গুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটা বুঝতে বাকি নেই যে, বর্তমানে আমাদের নেতৃত্ব কি কারণে কিছু স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের হাতে জিম্মি। আমরা জাতিগতভাবে বড়ই অভাগা। আমাদের নেতৃত্বগুলোই ছিল অযোগ্য, অন্ধ আর অমানবিক মানুষগুলোর হাতে।
অপরদিকে, ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী বাহ্যিকভাবে মৈত্রীর বন্ধন রক্ষা করলেও তাদের অন্তরে ছিল ষড়যন্ত্র আর সন্দেহ। তাদের ভয় ছিল পূর্ব বাংলার কারণে পশ্চিম বাংলায়ও স্বাধীনতার বিদ্রোহ জেগে ওঠতে পারে।
লেখকের ভাষ্যমতে, ভারত যে উদগ্র বাসনা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামনা করেছিল সেভাবে তো নাগাল্যান্ড, মিজোরাম এবং খালিস্তান স্বাধীনতা করার জন্য তো উদ্যোগ নেয় নি? মূলত, এটাই ছিল তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ যেখানে হয় ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তাদের অংশ হবে, নয়তো একে পারদ রাজ্য হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বাস্তবতায় তাই ঘটেছে।
১২. মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আওয়ামী নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও ধৃষ্টতা
মেজর জলিলের ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকার ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ভারতে বিলাসী জীবনযাপন করছিলেন। যখন মাটি ও মানুষের রক্তে দেশ পুড়ছিল, তখন কেউ কেউ তাসের আড্ডায় মত্ত ছিলেন।
তিনি বলেন –
“দেশর সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণকে হিংস্র দানবের মুখে ঠেলে দিয়ে কলকাতার বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার একটি দ্বিতল বাড়ীতে বসে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভা সহকারে নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি সে মুহূর্তে কেবল বিস্মিতই হইনি, …..। আমি কিন্তু সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি।”
”মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণে এ ধরনের ভূরি ভূরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় তাদের আরাম-আয়েশী জীবনধারা কলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক।” [পৃষ্ঠা ৪০]
খুব সহজেই বুঝা যায় যে, তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের ব্যক্তিবর্গরা কতক্ষাণি বিলাস জীবন যাপন করেছেন। তারা স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী হিসেবে দাবী করলেও স্বাধীনতার সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তাদের সহবস্থানের একটাও রেফারেন্সও পাওয়া দুষ্কর।
অপরদিকে, স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানীকেও কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে স্বাধীন বাংলাদেশের অফিসে বন্দী জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। লেখকের ভাষায় –
সেক্টর পরিদর্শন করাতো দূরেরই কথা তাঁর তরফ থেকে লিখিত নির্দেশও তেমন কিছু পৌঁছতে পারতো না সেক্টর কমান্ডারদের কাছে।
অর্থাৎ ভারতীয় কর্তৃপক্ষরা সবদিক থেকে জেনারেল ওসমানীকে বাধাগ্রস্থ করছিল। অপরদিতে, আওমী নেতৃত্ব ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েই যাচ্ছিল।
ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবির গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও তাদের ব্যর্থতা বা ক্ষীণ ভূমিকার কথা লেখক তুলে ধরেছেন। পাকিস্তানের সাথে বিদ্রোহ করা বাঙ্গালী তরুন ক্যাপ্টেন, মেজর, নন কমিশন্ড অফিসার নায়েক এবং হাবিলদারদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ট্রেনিং শিবিরগুলো। লেখক বলেন-
কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া আওয়ামীলিগের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবির স্থাপনের ব্যাপারে কোন ধরনের অবদান রাখতে সক্ষম হয় নি। [পৃষ্ঠা ৪৩]
এমনকি পশ্চিম বাংলার নিরাপদ এলাকায় ট্রেনিং শিবির গড়ে ওঠার পরও আওয়ামীলিগ নেতৃবৃন্দকে ট্রেনিং শিবিরের আশেপাশেও দেখা যায় নি। তবে এর ব্যতিক্রম যারা ছিল তাদের সংখ্যা সীমিত। [পৃষ্ঠা ৪৪]
এই ব্যর্থতা ঢাকতে যারা এরুপ বলেন যে, তৎকালীন পরিস্থিতি এতই ভয়ানক ছিল যে, এসব নেতৃবৃন্দ নিজেরাই এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিলেন, তাই পারেন নি, তাদের এই যুক্তির খন্ডনও লেখক করেছেন। তিনি বলেন –
”সন্দেহের সুযোগ’ নিতে আওয়ামীলিগ নেতৃবৃন্দ যে মোটেও কার্পণ্য করেন নি তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পেয়েছি যখন তাদেরকে দেখেছি কলকাতার অভিজাত এলাকার হোটেল-রেস্টরেন্টগুলোতে জমজমাট আড্ডায় ব্যস্ত। [পৃষ্ঠা ৪৪]
এই স্বার্থান্বেষী মহল কি কারণে ট্রেইনিং শিবিরে আসত না, তার কারণ হিসেবে লেখক বলেন –
ভারতে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলো ছিল নানান কুকর্মে লিপ্ত আওয়ামী নেতৃত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ। তাই সচেতনভাবে তারা ট্রেনিং শিবিরগুলো এড়িয়ে চলত। [পৃষ্ঠা ৪৫]
কি দু:খ জনক ব্যাপার! এই হচ্ছে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী বলে দাবী করা দলের বৈশিষ্ট্য। আপনি পুরো ইতিহাস ঘাটলেও খুব বেশি আওয়ামী প্রথমসারির নেতৃত্ব পাবেন না, যারা আসলেই সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করেছেন।
তিনি আয়ামীলিগ নেতৃত্বের ব্যাপারে আরও বলেন –
আওয়ামীলিগ নেতৃত্বের এই সীমাহীন দায়িত্বহীনতা এবং সচেতন প্রতারণামূলক আচরণ মুক্তিযোদ্ধাদের ভোগান্তি অনেকগুণ বৃদ্ধি করেছে। তারা সচেতনভাবেই যেমন এড়িয়ে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের শিবিরগুলো, তেমনিভাবে এড়িয়ে চলেছেন শরণার্থী শিবিরগুলো। তবে মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের নামে আওয়ামীলিগ নেতৃবৃন্দ ভারতের বিভিন্ন সম্পদশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সংস্থাসমূহ থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থসম্পদ মালামাল সংগ্রহ করেছেন একথা সকলেরই জানা। [পৃষ্ঠা ৪৮]
লেখকের ভাষ্যমতে, এই সংগৃহীত অর্থ নামে বেনামে জমা হয়েছিল আওয়ামীলিগ নেতাদের ব্যাংক একাউন্টগুলোতে যা ভারতীয় কংগ্রেসের অজানা ছিল না। এমনকি, তারা শরণার্থী শিবির থেকে হিন্দু মেয়েদের চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন হোটেলে এনে যৌণতৃষ্ণা মেটাতো বলেও অভিযোগ করেন।
ভারতীয় ট্রেনিং শিবিরগুলোর কর্তৃত্ব সেক্টর কমান্ডারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল যা তারা সহ্য করতে পারত না। কিছু এমপি ও এম এন এ দেরকে এই শিবিরিগুলোর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হলেও তারা আরাম-আয়েশ ছেড়ে খুব একটা বর্ডার সীমান্ত এলাকায় তাদের পদধুলিও দেয়ার প্রয়োজন মনে করত না। তবে এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমও ছিল।
কি আজব তাই না! এই দেশের ইতিহাস আজ এক উপহাসে পরিণত হয়েছে যেখানে লুকিয়ে আছে কতই না না জানা সত্য। ইতিহাস আজ বিকৃত স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে। একশ্রেণীর দলকানা স্বার্থবাদী বুদ্ধিজীবিরা নষ্ট করে দিয়েছে আমাদের গৌরবান্বিত স্বাধীনতার ইতিহাস।
আর একটি কষ্টের বিষয় হচ্ছে, এই বিকৃতির ইতিহাস ঐ অবিসংবাদিত নেতার শাসনামল থেকেই শুরু হয়েছে, যারা মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতার উজ্জল নক্ষত্র প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আফসোস! বইটির যতই সামনের দিকে যাচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি। কিভাবে পারল তারা? আমিও হয়তো লেখকের মতো আবেগি হয়ে যাচ্ছি মাঝে মাঝে। এই জন্য পাঠকের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি?
যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও আওয়ামীলিগ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ প্রসঙ্গেও লেখক বলেন –
যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশে যখন জাতীয় ঐক্যের সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময়েই আওয়ামীলিগ একলা চল নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে জনমত এবং জনগণের আশা-আকাঙ্খা পদদলিত করে চলতে থাকে।
আওয়ামীলিগের যুদ্ধকালীন দূর্নীতি এবং ব্যর্থতা এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতন জনগণ থেকে আওয়ামীলিগকে বিচ্ছিন্ন করার উপসর্গ সৃষ্টি করে। [পৃষ্ঠা ৬৮]
১৩. মুজিব বাহিনী সম্পর্কে গুরুত্বর অভিযোগ
লেখক বলেন, ভারতীয় RAW এর তত্ত্বাবধানে মেজর ওভানের মাধ্যমে সুবিধাভোগী আওয়ামীলিগ এবং তাদের সহযোগী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী যেখানে অন্য কোন সাধারণ ব্যক্তিদের বা দলের সদস্যদের নেয়া হত না। ভারতের ’দেরাধন’ শহরে ট্রেনিংয়ে থাকা এই মুজিব বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ আরাম আয়েশের ব্যবস্থা ছিল। অন্যদিকে, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবিরগুলো ছিল বর্ণাতীত দুরবস্থাপূর্ণ।
তিনি বলেন –
’মুজিব বাহিনী’ গঠন ছিল বাংলার সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের বিকল্প ব্যবস্থা! মুজিববাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহণের পূর্বেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। তাদের দূর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যই বলা চলে যে, সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে তাদের রক্ত ঝরাতে হয় নি। তাদের অভিজাত রক্ত সংরক্ষিত করা হয়েছিল স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত ঝরানোর লক্ষ্যে। [পৃষ্ঠা ৪৬]
এই ধরনের অভিযোগ যে, কতক্ষাণি গুরুত্বর তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একজন সেক্টর কমান্ডার যার হাত ধরে রচিত হয় আমাদের স্বাধীনতা, তিনি যখন এরুপ মন্তব্য করেন, তা ফেলে দেয়ার সুযোগ কতখানি যৌক্তিক?
মুজিববাহিনীর ব্যাপারে আপনি খুববেশি সম্মুখ যুদ্ধের ইতিহাস পাবেন না। আমাদের বইপত্রগুলোতে বলা হয়, তারা গেরিলাযোদ্ধা ছিল। এই গল্পগুলোর প্রকৃত ভিত্তি কতটুকু সত্য? মেজর জলিলের কি স্বার্থ যে তিনি মুজিববাহিনীর বিপক্ষে কথা বলেছিলেন? আমি যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে একটু গবেষণার চিন্তা করি, তখন আমাকে ঘাটতে হয় অনেকগুলো সোর্স। আমি পরবর্তী রিভিউগুলোতে সেই সোর্সগুলো নিয়েও আলোচনা করব। তবে আমি যা যা পেয়েছি তা তুলে ধরলাম –
মুজিববাহিনী (Mujib Bahini) বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (BLF) ছিল একটি আধাসামরিক গোপন সংগঠন, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে গঠিত হয়েছিল এবং ভারতের RAW (Research and Analysis Wing) এর সহায়তায় পরিচালিত হতো। এদের কার্যক্রম ও ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। নিচে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
মুজিববাহিনীর প্রকৃতি ও গঠন
- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ইন্দিরা গান্ধির সরকার এবং RAW-এর সহায়তায় এই বাহিনী গঠিত হয়।
- মূলত ছাত্রলীগের নির্বাচিত কর্মী ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
- প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ভারতের তেহরি, মৌলশ্রী, দেহরাদুন সহ বিভিন্ন স্থানে।
- আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, মুজিবনগর সরকার বা মুক্তিবাহিনীর অধীনে ছিল না, যা তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার একটি প্রধান কারণ। এটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে বেশি সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সোর্স: বাংলাপিডিয়া এবং উইকিপিডিয়ার “মুজিব বাহিনী” পৃষ্ঠা; ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, এ কে খন্দকার]
মুজিববাহিনীর যুদ্ধকালীন ভূমিকা
- মুক্তিযুদ্ধের কিছু ফ্রন্টে অংশগ্রহণ করেছে বলে দাবি করা হয়, তবে এটি ছিল সীমিত ও বিচ্ছিন্ন।
- প্রধানত গেরিলা হামলা, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড, গোয়েন্দা কার্যক্রম, এবং পাকিস্তানপন্থীদের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে অবদান রাখার কথা বলা হয়।
- তবে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, তারা মূলত ভারতের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহৃত হতেন এবং মূল যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সক্রিয় ছিলেন না।
মুজিব বাহিনী গঠনের পেছনে ভারতের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন। RAW-এর মাধ্যমে ভারত একটি এমন বাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যারা স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বজায় রাখতে পারে। এই দাবি আংশিকভাবে FRUS (Foreign Relations of the United States) 1971 ডকুমেন্টসে ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনার উল্লেখ দ্বারা সমর্থিত।
সোর্স: বাংলাপিডিয়া এবং উইকিপিডিয়ার “মুজিব বাহিনী” পৃষ্ঠা; ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, এ কে খন্দকার; FRUS (Foreign Relations of the United States) 1971]
মুজিববাহিনীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
- সক্রিয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা: ভারত ও আওয়ামী লীগের একাংশের সমর্থনে তারা স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। তারা মুজিবনগর সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে অস্ত্রসহ ঘোরাফেরা করত। [সোর্স: মুজিবনগর সরকার ও স্বাধীনতা যুদ্ধ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ; ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, এ কে খন্দকার; বাংলাপিডিয়া]
- সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব: মুক্তিযুদ্ধের মূল সেনা ও গেরিলা ইউনিটের সঙ্গে মুজিববাহিনীর বারবার সংঘর্ষ হয়েছে। যেমন, মেজর রফিকুল ইসলামের মতো সেক্টর কমান্ডাররা তাদের কার্যক্রমকে “অসহযোগিতামূলক” বলে সমালোচনা করেছেন। এই দ্বন্দ্ব কিছু ক্ষেত্রে সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল, তবে ব্যাপক সংঘর্ষের প্রমাণ সীমিত। উইকিপিডিয়ার “মুজিব বাহিনী” পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে তাদের স্বাধীন কার্যক্রম মুক্তিবাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল।
- পোস্ট-১৯৭১: কুখ্যাত অপরাধ: যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে অনেক সদস্য অস্ত্র জমা না দিয়ে চাঁদাবাজি, লুটপাট, প্রতিশোধমূলক হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়ায় । মূলত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দলিলপত্রে এই ধরনের অপরাধের সাধারণ উল্লেখ আছে, তবে মুজিব বাহিনীকে সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭২ সালে অস্ত্র জমা না দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ সাধারণভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিল। এছাড়াও, সেনাবাহিনী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উপর হামলা, মুক্তিযোদ্ধা হত্যা এবং স্থানীয় বিরোধীদের দমন করার অভিযোগ আছে, যা অনেকটাই বিতর্কিত।
- ভারতের হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা: মুজিব বাহিনীকে ভারতের RAW-এর নিয়ন্ত্রিত বাহিনী হিসেবে দেখার দাবি অনেক গবেষক সমর্থন করেন। FRUS 1971 ডকুমেন্টসে ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনায় বাংলাদেশে প্রভাব বজায় রাখার ইঙ্গিত আছে। মেজর জলিলের মতোই লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহের তার লেখায় এই বাহিনীকে “ভারতের পুতুল” হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তবে, এটি একটি জটিল বিষয়। মুজিব বাহিনীর নেতারা (যেমন, শেখ ফজলুল হক মনি) বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনুগত ছিলেন, তবে ভারতের সমর্থন ছাড়া তাদের কার্যক্রম সম্ভব ছিল না।
সোর্স: বাংলাপিডিয়া; ১৯৭১: ভেতরে বাইরে, এ কে খন্দকার; FRUS (Foreign Relations of the United States) 1971]উৎস ও দলিলপত্র।
🧾 আরো জানতে দেখুন
- “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” – মেজর এম এ জলিল
- “মুজিবনগর সরকার ও স্বাধীনতা যুদ্ধ” – অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ
- FRUS (Foreign Relations of the United States) 1971 ডকুমেন্টস
- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সরকারি দলিলপত্র
- Prothom Alo (১৭ ডিসেম্বর ২০২১): মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে প্রতিবেদন
- ১৯৭১: ভেতরে বাইরে – এ কে খন্দকার
- বাংলাপিডিয়া: “মুজিব বাহিনী” এন্ট্রি
- উইকিপিডিয়া: “Mujib Bahini” পৃষ্ঠা
১৪. জহির রায়হান ও স্টুয়ার্ড মুজিবের পরিণতি
লেখক দাবী করেন, বিশিষ্ট স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান এবং শেখ মুজিবের অন্ধভক্ত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩নং আসামী স্টুয়ার্ড মুজিব গুম হয়ে যাওয়ার পিছনেও আওয়ামীলিগ নেতৃত্বের ষড়যন্ত্র ছিল।
তিনি জহির রায়হান সম্পর্কে লিখেন –
ভারতে অবস্থানকালে আওয়ামীলিগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িত করেছিলেন অনেক দূর্লভ দৃশ্যের।
ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে আওয়ামীলিগ নেতৃত্বের চুরি, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেঙ্কারী, বিভিন্ন রকম ভোগ-বিলাসসহ তাদের বিভিন্নমুখী অপকর্মের প্রামাণ্য দলিল ছিল, ছিল সচিত্র দৃশ্য। আওয়ামীলিগের অতি সাধের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজী জহির রায়হানের এতবড় অপরাধকে স্বার্থান্বেষী মহল কোন যুক্তিতে ক্ষমা করতে পারে? [পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫]
অপরদিকে, ৯নং এবং ৮নং সেক্টরে যুদ্ধ করা স্বাধীনতার পরবর্তী সপ্তাহেই গুম হওয়া বীর এবং দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা স্টুয়ার্ড মুজিব সম্পর্কেও বলেন –
স্টুয়ার্ড মুজিব ভারতে অবস্থিত আওয়ামীলিগ নেতাদের অনেক কুকীর্তি সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল ছিল। এত বড় স্পর্ধা কি করে সইবে স্বার্থান্বেষী মহল?
১৫. মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় হস্তক্ষেপের জন্য আওয়ামীলিগের বেহায়াপনা
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য সাধারণ গনমানুষের ঢল আওয়ামীলিগ নেতৃবৃন্দদেরকে উদ্বিগ্ন করত। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মুক্তিযুদ্ধের উপর তাদের পোদ্দারী হারিয়ে যাবার আশংকা ছিল। এই কারনে তারা প্রতিনিয়তই ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর কাছে অনুনয়-বিনয় করত যাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দেয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাটিগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা যেমন ভারতের ভয়ের কারণ ছিল তেমনি আওয়ামলীগ নেতৃবৃন্দদেরও ভীতির কারণ হয়ে দাড়ায়। ফলে তারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ভারতের কাছে ধরনা দিতে থাকে যা ভারতের জন্য সোনায় সোহাগা হিসেবে বিবেচিত হয়।
লেখক বলেন –
দূর্বল আওয়ামীলিগ নেতৃত্বের অসহায় আত্নসমর্পনই ভারতীয় চক্রকে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।
এক তুমুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভারত নি:স্বার্থভাবে বাঙ্গালীদের সুখ-শান্তির জন্য স্বাধীনতা এনে নেবে এ ধরনের ধারণা যারা পোষণ করেন, তারা হয় ভারতের কট্টর সমর্থক না হয় তারা ভারতের কৃপা ভিক্ষাকারীদের মধ্যে অন্যতম। [পৃষ্ঠা ৫২]
সেদিন ভারতের কাছে আওয়ামীলিগের নত মাথা আজও নতই রয়ে গেছে। আজকে এ জাতির স্বার্থান্বেষী প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ভারতের কাছে মাথানত করে থাকে। এর চেয়ে লজ্জার আর কি আছে?
তবে একটি বিষয় মনে রাখা উচিত যে, একটি দেশের সাধারণ জনগনের মানবতাবোধের সাথে সে দেশের শাসক চক্রের মূল্যবোধের সম্পর্ক বা সংগতি নাও থাকতে পারে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা যে ভালবাসা দেখিয়েছিলেন তা সত্যিই অতুলনীয় ছিল।
১৬. ১৬ ডিসেম্বর বিজয় না পরাধীনতার দিন?
১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। মেজর জলিল এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেন যার উত্তর আজও আমাদের না জানা।
- পাকিস্তানের সাথে যদি মুক্তিকামী বাঙ্গালীদের যুদ্ধ হয়ে থাকলে কেন তারা কর্নেল ওসমানীর পরিবর্তে ভারতের জেনারেল অরোরার কাছে আত্নসমর্পণ করল?
- আত্ন সমর্পনের সময় তিনি কোথায় ছিলেন এবং কেন কয়েকদিন পর বাংলাদেশে আসেন?
- কেন প্রবাসী বাংলাদেশের সরকার ১ সপ্তাহ পরে বাংলাদেশে ফিরেই কোন প্রশ্ন ছাড়াই গদিতে বসল?
- কেন কর্নেল ওসমানীর মিছেমিছি প্রশংসা এবং এর অন্তরালে রহস্য কি?
মেজর জলিলের বলেন:
“১৬ ডিসেম্বর থেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা হয়েছে। ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের ’বিজয় দিবস’ এর পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে ইতিহাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের পিছনে আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঙ্গালীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে অস্বীকার করা এবং পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয় ঘোষণা করা”। [পৃষ্ঠা ৫৫]
তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন:
“এ বিজয়ে বাংলাদেশের মুক্তিপিপাসু জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধারা ছিল নীরব দর্শক, আওয়ামীলিগ নেতৃত্ব ছিল বিনয়ী তাবেদার এবং কর্নেল ওসমানী ছিলেন অসহায় বন্দী। এ যেন ছিল ভারতের বাংলাদেশ বিজয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার এই নব বিবজিত ভারতভূমির যোগ্য লীজ গ্রহণকারী সত্তা। সুতরাং যেমন সত্তা তেমনই তার শর্ত – আর যায় কোথায়?” [পৃষ্ঠা ৫৫]
মেজর জলিল বাঙ্গালীর বিজয় লুন্ঠনকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারেন নি। তিনি অকুন্ঠ চিত্তে বলেছেন –
বঞ্চনাকারীদের কবল থেকে বঞ্চিতদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার লক্ষ্যে আর একটি প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন কি এখনও রয়ে যায় নি? [পৃষ্ঠা ৫৫]
পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম দূর্লভ ঘটনা একটাও নেই যেখানে একটা দেশের বিজয় অপর দেশের দ্বারা লুন্ঠিত হয়। কতটা অবিচারের স্বীকার এ জাতি। তথাকথিত বন্ধু রাষ্ট্র যে কতক্ষানি শোষণ করেছে এবং করেই চলেছে তা বুঝতে হলে একটু চিন্তা করার মানসিকতাই যথেষ্ট। আর স্বাধীনতার স্বপক্ষের দল নামে খ্যাত আওয়ামীলিগ যে কোন কোন দিক থেকে স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে তার উত্তর খোজা এখন সময়ের দাবী।
১৭. ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও লুটপাট
লেখক ভারতের সহায়তার পাশাপাশি তাদের কূটনৈতিক স্বার্থ ও লুটপাটের অভিযোগ তুলেছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর লুন্ঠন ছিল বীভৎস বেপরোয়া এবং পরিকল্পিত।
৯নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল এই লুন্ঠনের তীব্র বিরুধীতা করেন। লিখিত প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধাণমন্ত্রী তাজউদ্দিন, কর্নেল ওসমানী এবং জেনেরাল অরোরার কাছে চিঠিও পাঠান।
পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক ও বেসামরিক গাড়ী, অস্ত্র, গোলাবারুদ, এমনকি প্রাইভেট গাড়িসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে তারা। প্রত্যেকটি সরকারি অফিস ও কোয়ার্টারগুলো পর্যন্ত তারা লুট করেছে যেখানে বাথরুমের মিরর এবং ফিটিংসগুলো পর্যন্ত রেহায় পায় নি।
মেজর জলিল দানবীর সিংকে সাবধান করে দেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় লুটেরা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হয়। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও খুলনা ত্যাগ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাবেশ করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা না দেয়ার পরামর্শ দেন যা মুক্তিযোদ্ধা এবং জনগনের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা জাগায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতীয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে এই লুন্ঠনের দাবী কতক্ষাণি সত্য? লেখক তো এই দাবির বিপক্ষে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করেন নি?
তবে এই দাবির পক্ষে তিনি তার বইতে সরাসরি প্রমাণ উপস্থাপন না করলেও এর সত্যতা কিছুটা হলেও কিছু গবেষনায় প্রকাশ পেয়েছে। যেমন – একজন গবেষক কামাল উদ্দিন সিদ্দিক তার “The Political Economy Of Rural Poverty In Bangladesh 1980 নামক Ph. D Thesis এর (৪৭৩-৪৭৪) পৃষ্ঠায় উল্লেখ্য করেছেন যে,
“বিদেশী (ভারতীয়) সেনাদের দ্বারা লুট করে নেওয়া সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার (১৯৭১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ মার্চ সময়কালে)। তুলনামূলকভাবে বোঝার সুবিধার্থে যদি এটিকে সাত বছরে ভাগ করে দেখা হয়, তাহলে সরাসরি লুটপাটের গড় বার্ষিক মূল্য দাঁড়ায় ৩১৪ মিলিয়ন ডলার।”
মেজর জলিল বলেন:
“১৯৭১ সালের নভেম্বরে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্রোহে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।”
এমনকি যুদ্ধ শেষে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ১১টায় যশোরে ভারতীয় সেনাদের লুটপাটের প্রতিবাদ করায় লেখক নিজেই গুম হন । লেখকের আক্ষেপ –
” অমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দী।” [পৃষ্ঠা ৫৯]
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর ভারতের পক্ষে এখনও যারা সাফাই গায়, তারা নি:সন্দেহে তাদের দালালী করে। এই বইটির এই পর্যায়ে এসে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ভারতের তাবেদার এবং পোষা বাহিনী ছাড়া এদেশের কোন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা বা জনগনই তাদের পক্ষে কথা বলবে না।
ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এ কথা যেমন সত্য, তেমনি তাদের ভেতরে লুলুপ দৃষ্টি ও অসৎ চিন্তা যে ছিল এটাও কম সত্য নয়। বিগত বছরগুলোতে, এদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং এমনকি শিক্ষাব্যবস্থার উপরও তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষনীয়। কি আজব এক দেশ আমাদের! আমরাই বা কেমন? ধীক্কার এ জাতির দালালদের যারা নিজের স্বার্থের জন্য দেশের সার্বভৌমত্ব বেচে দিয়েছে।
১৮. পাকিস্তানি হানাদার ও তার স্থানীয় সহযোগীদের বিচার
লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, মিত্র বাহিনী সেজে বাঙ্গালীর শত্রুপক্ষকে কেন ইন্ডয়ান আর্মি নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে গেল? কি স্বার্থ লুকানো ছিল এর পিছনে? এদেশে যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল, তাদেরই বিচার কেন হয় নি? এদশের মানুষও তাদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার ছিল। তবে লেখক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া যারা মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী ছিল কিন্তু কারো ক্ষতি করেছেন এমন প্রমাণ নেই তাদের উপর অবিচারের বিপক্ষেও দাড়িয়েছেন।
লেখক বলেন –
”মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ আনার চেষ্টা না করে যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া প্রয়োজন। যতদিন পর্যন্ত অপরাধীদের বিচার না হবে, ততদিন পর্যন্ত জাতি দুর্ভাগ্যজনক দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকবে এবং এ কারনে বাংলাদেশের মাটিতে পবিত্র ইসলাম ধর্ম বিরুধী প্রোপাগান্ডার অবসানও হয়তো হবে না।” [পৃষ্ঠা ৬৪]
লেখকের এই কথাগুলো থেকে প্রতিয়মান হয় যে, মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী মানে যুদ্ধাপরাধী নয়। যারা প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী তাদের বিচার হওয়া অবশ্যই জরুরী। যারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে কাজ করেছে, আমাদের মা বোনদের ইজ্জত লুটেছে তাদের ক্ষমা কিসের? প্রশ্ন হচ্ছে, বিগত বছরগুলোতে যুদ্ধাপরাধীর নামে যেই লোকগুলো যেমন – সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন সাইদীর মতো প্রথিতযশা আলেমসহ অন্যান্য যাদেরকে ফাসি দেয়া হয়েছে তারা কি মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী ছিল নাকি যুদ্ধাপরাধী? নাকি একটাও না?
যদি এই যুদ্ধাপরাধীর নামে নির্দোষ কাউকে ফাসি দেয়া হয় সেটা কি জাতির অন্তরে রক্তক্ষরণ ও বিভাজনের কারণ হয়ে দাড়ায় নি? ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে অনেকে উত্তর মিলছে যেখানে নিরাপরাধ মানুষগুলোকে প্রহসনের ট্রাইবুনালের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ফাসি দেয়া হয়েছিল। কতই না দুর্ভাগা জাতি আমাদের? ভিন্ন মতের কেউ হলেই তার মৃত্যু কামনা করা আমাদের চারিত্রিক দোষ হিসেবে রুপ নিয়েছে।
১৯. ৭২-এর সংবিধান ও রাজনৈতিক প্রশ্ন
আওয়ামীলিগ ১৯৭০ এর নির্বাচনে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী কোন আইন পাস করবে না। অথচ তারা স্বাধীনতার পর ক্ষমতার মসনদে বসেই তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। দেশের মানুষের মতামতের তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জবরদস্তিমূলকভাবে মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়।
লেখক এ প্রসঙ্গে বলেন –
”আওয়ামীলিগ শাসনকালের বিশ্বাসঘাতকতার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর এখান থেকেই শুরু। [পৃষ্ঠা ৬৭]
১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৬ দফা ছিল মূল ইশতেহার। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র বা জাতীয়তাবাদের কথা ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতার পর হঠাৎই এই চারটি মূলনীতি সংবিধানে ঢুকে যায়।
মেজর জলিলের বক্তব্য:
’৭২-এ আওয়ামী লীগের এমন কোন বৈধ অধিকার ছিল না যাতে করে তারা দেশ ও জাতির উপর একটি মনগড়া সংবিধান আরোপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা হচ্ছে স্বয়ং দিল্লীর শাসকচক্র। ৭২ এর সংবিধানের উৎস তাই বাংলাদেশেল জনগণ নয়, সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক ভারতীয় শাসক চক্রই হচ্ছে মূল উৎস।[পৃষ্ঠা ৬৮]
ভারত থেকে আমদানী করা এই ৭২ এর সংবিধান প্রণয়ের কারণ ছিল বাংলাদেশকে নীতির চালে তাদের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রঞনের উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশকে এমন কিছু দাসত্বমূলক চুক্তি এবং শর্তের মধ্যে বন্দী করে রাখা। ৭২ এর সংবিধান সেই সকল দাসত্বমূলক চুক্তির মধ্যে একটি এবং অনতম শর্ত। [পৃষ্ঠা ৬৯]
১৯৮৮ সালে লেখা এই বইটি যে, কতক্ষাণি দূরদর্শীতার পরিচায়ক ছিল, তা বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সহজেই বুঝা যায়। সংস্কৃতি থেকে শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের কাছে জিম্মি এদশের মানুষ। মূলত, এই সংবিধান প্রণয়নের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় আধিপত্য যে, কতক্ষণি বিস্তার লাভ করেছিল, তা তৎকালীন সাধারণ মানুষ না বুঝলেও, মেজর জলিল ঠিক বুঝেছিলেন। কতটা সচেতন ছিলেন এই ৯নং সেক্টর কমান্ডার!
যারা ৭২ এর সংবিধান নিয়ে লাফায়, তাদের উদ্দেশ্য লেখকের বানী –
আওয়ামীলিগ কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের ’৭২ এর সংবিধানকে’ যারা দেশ ও জাতির জন্য পবিত্র আমানত বলে মনে করেন, তাদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার সবিনয়ে আশ্বাসবাণী দেশ ও জাতির জন্য – আপনার ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় শাসকচক্রের তরফ থেকে যে সকল পবিত্র আমানত ১৯৭১ সন থেকে বহন করে নিয়ে এসেছেন, তার মালিকানা নিয়ে আপনাদের সাথে বাংলাদেশের তৌহিদী জনগণের কোনদিনই প্রতিযোগিতা হবে না। তবে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির চার স্তম্ব বিশিষ্ট ইমারতটির উপর যে একটি নির্ভরশীল এবং স্থায়ী ছাদ নির্মাণের প্রয়োজন ছিল, সে বিষয়টি আওয়ামীলিগ নেতৃত্ব কার উপর ছেড়ে দিয়েছিল – ভারত না রাশিয়ার উপর?
জনমত এ বিষয়ে বিভ্রান্ত। ছাদহীন স্তম্ভের উপর আধিপত্য বিস্তারের উন্মাদশক্তি মাত্রই ছাদ বিছাতে আগ্রহী থাকবে। এটাই তো স্বাভাবিক। হলোও তাই, হচ্ছেও তাই এবং হবেও তাই। আর তাই তো কখনো ভারত, কখনো রাশিয়া এবং কখনো আমেরিকার ইচ্ছামাফিক লীলাখেলা চলছে আমাদের ৪টি স্তম্ভের অভ্যন্তরে। [পৃষ্ঠা ৭৮]
প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান বাংলাদেশর উপর এই আধিপত্যকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রভাব যে, কত বেশি তা এ দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, এবং অর্থনৈতিক সেক্টরগুলো ভালভাবে প্রত্যক্ষ করলেই বুঝা যায়। স্বাধীন দেশেও যেন আমরা পরাধীন।
২০. ৭২-এর সংবিধানের ৪ মূলনীতির পোস্টমর্টেম
লেখক তার লেখনীতে ভারতের চাপিয়ে দেয়া সংবিধানের ৪ মূলনীতির পোস্টমর্টেম করেন। তিনি এই ৪ মূলনীতিকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে কতটুকু যায় সেটা নিরুপণ করেন।
ক. গণতন্ত্র
গণতন্ত্র তথা সংসদীয় গণতন্ত্রকে তিনি পুজিবাদের স্লোগান এবং স্বৈরতান্ত্রিক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন যা আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোকে বহাল তবিয়তে টিকিয়ে রাখে। তিনি এই মূলনীতে বিত্তবানদের গণতন্ত্র এবং ‘মনোহরিণী ডাইনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। [পৃষ্ঠা ৬৯-৭০]
খ. সমাজতন্ত্র
সমাজতন্ত্র হচ্ছে পুজিবাদ বিরুধী দর্শন। তাহলে একই সাথে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক পুজিবাদী দর্শন ও পুজিবাদ বিরুধী দর্শন কিভাবে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অংশ হয়? কি উদ্দেশ্য ছিল এর পিছনে?
কারণ, এটি ছিল আওয়ামীলিগ সরকারের নোংরা রাজনৈতিক অপকৌশল যাতে পুজিবাদের কারণে সৃষ্ট ক্ষুধার্ত, শিক্ষিত এবং বেকারদেরকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে সশস্ত্র বিপ্লবের চিন্তা ঠোকানো যায়। মূলত আওয়ামীলিগ নেতারা রাষ্ট্রীয় করনের নামে অসংখ্য শিল্প-কারখানা লুন্ঠন করে নেয়।
লেখকের ভাষায় –
শিল্প-কারখানাসমূহের লুটতরাজের প্রতিযোগিতা বর্বর চেঙ্গিস-হালাকু খানদেরকেও হার মানিয়েছে। শাসক কর্তৃক নিজ দেশের এবং জাতির সম্পদ বেপরোয়া লুন্ঠনের দৃশ্য জাতি এই সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ করল। [পৃষ্ঠা ৭২]
গ. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ভারত কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া তৃতীয় স্তম্ভ যা তারা তাদের তাবেদার আওয়ামীলিগের মাথায় চাপিয়ে দিয়েছিল। ভারত কেন জেনেশুনে ধর্মীয় আবেগপ্রবণ একটা দেশের মানুষের উপর এই ভুল জিনিসটা চাপিয়ে দিল?
লেখক বলেন –
তৌহিদবাদভিত্তিক পবিত্র ইসলামই হচ্ছে ভারতের প্রধানতম ভীতি। ইসলামের ঐতিহ্যবাদী নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি, মূল্যবোদ এবং আশ্চর্যজনক আধ্যাত্নিকতার সম্মুখে ভারত যে কোন এক সময় নিরুপায় হতে বাধ্য হবে সে তত্ত্ব ও রহস্য আমরা অনুভব করতে সক্ষম না হলেও হিন্দু ব্রাহ্মণবাদের ধারক-বাহক ভারতীয় শাসকচত্রের মোটেও অজানা নয়। [পৃষ্ঠা ৭৩]
মূলত ১৯৪৭ এর বিভাজনে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার পরও নিজেদেরকে সেকুলার দাবি করেছিল আন্তর্জাতি সম্পর্ক রক্ষা এবং অভ্যন্তরীন সাংস্কৃতিক সংকট এড়ানোর জন্য। মূলত, এটা ছিল ভারতের একটি আনুষ্ঠানিক লেবাস মাত্র। ভারত যে একটি সাম্প্রদায়িক হিন্দুরাষ্ট্র তা আজ বিশ্বের কারোই অজানা নয়।
এই হিন্দু ভারতের জাত-শ্রেণী বিভেদের বিপরীতে ইসলামের সাম্যবাদ তারা যমের মতো ভয় পায়। কারণ ভারতের সাম্যবাদ নীতির কারণে নির্যাতিত মানব গোষ্ঠী যে কোন সময়েই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে পারে। মূলত, সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি ইসলামভিত্তিক।
লেখক আরও বলেন –
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তরুণ যুবকদেরকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে এবং ধর্মীয় অনূভুতি একেবারেই মিটিয়ে দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবাসী নাম। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে বস্তুভিত্তিক দর্শনের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি চূড়ান্তভাবেই বস্তুকেন্ত্রিক এবং অধিবিদ্যামুক্ত। [পৃষ্ঠা ৭৫]
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠান্ডা যুদ্ধ। ভারত তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ জুড়ে দিয়ে মোটেও ভুল করেনি। [পৃষ্ঠা ৭৬]
ঘ. জাতীয়তাবাদ
লেখকের ভাষ্যমতে, জাতীয়তাবাদও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মতোই জাতিকে ধর্মবিমুখ করার একটি কৌশল। জাতীয়তাবাদ ভাষা, কৃষ্টি এবং জাতীয় ঐতিহ্যভিত্তিক অহংকারী মনমানসিকতা গঠন করে যা অন্য দেশ ও জাতির প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয়। এই জাত্যাভিমান ইসলামী সাম্যবাদেরই পরিপন্থী।
মূলত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বুলি দিয়ে পশ্চিম বাংলার পৌত্তলিকতাবাদ বা হিন্দুভিত্তিক এবং পূর্ববাংলার ইসলামভিত্তিক সংস্কৃতিকে এক ও অভিন্ন করে দেখার জন্য কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এর কারণ কি?
লেখক বলেন –
ভারতীয় শাসকচক্র মূলত উভয় বাংলার মধ্যে এই স্থীয়ী রেষারেষিই কামনা করে। যার ফলে সবকিছু জেনেশুনেই ভারতীয় শাসকচক্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ৪র্থ স্তম্ভ হিসেবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে জুড়ে দিয়েছে। [পৃষ্ঠা ৭৭]
প্রশ্ন আসা উচিত, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কি আদৌ জানি, আমাদের সংবিধান কিসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত? আমরা কি জানি, কারা কিভাবে কি কারণে এই বিধ্বংসী নীতিগুলো চাপিয়ে দেয় আমাদের উপর? আজ আমাদের সমাজে এরুপ সুশীল শ্রেনীর অভাব নেই যারা টকশোতে বসে এই মূলনীতিগুলো নিয়ে বুলি আওড়ায়। বস্তুত, এটা বলা যায় যে, এই সব সুশীলরা বাংলাদেশের নয় বরং ভােরতের স্বার্থরক্ষায় বেশি তৎপর। তারা ভারতের বিপক্ষে কিছু শুনলেই তাদের গায়ে এমনভাবে জ্বালা ধরে যেন তারা ভারতেরই নাগরিক। ধিক্কার সেই সব দালাল এবং দুষ্ট লোকগুলোকে!
লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপন
সাহসী ও সরল ভাষা
মেজর জলিল কারও প্রতি তোষামোদি করেননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েও তিনি কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন।
আবেগ ও অভিজ্ঞতা মিশ্রণ
লেখার মধ্যে রয়েছে তীব্র আবেগ। ক্ষোভ আর অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে গেছে। এর ফলে বইটি পড়ে পাঠক ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
উপসংহার
“অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” শুধু একটি বই নয়, এটি এক মুক্তিযোদ্ধার নির্মম আত্মজিজ্ঞাসা। মেজর এম এ জলিল এই বইয়ের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন— স্বাধীনতা মানে কেবল বিজয় নয়; স্বাধীনতা মানে আদর্শের লড়াই।
“যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একই হতো, তাহলে স্বাধীনতার পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাজেহাল অবস্থা কেন?
এই বিভক্তি, শত্রুতা, নিধনপ্রক্রিয়ার পেছনের রহস্য কি? এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই বইটি পড়তে হবে।”
যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী ইতিহাসের জটিলতা বুঝতে চান, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য। তবে পাঠের সময় সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা প্রয়োজন।