Mastodon

হাদীস ০২: নিয়তের শক্তি: ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব কেন? (সহীহ বুখারী ০১, ব্যাখ্যা)

Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads
বুখারী হাদিস ০১ ব্যাখ্যা নিয়তের গুরুত্ব

ভূমিকা

ইসলামে নিয়্যত (উদ্দেশ্য) প্রতিটি আমলের মূলভিত্তি, যা সেই আমলের আধ্যাত্মিক মূল্য ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান নির্ধারণ করে। ইমাম নববী কর্তৃক সংকলিত আল-আরবাঈন আন-নববিয়্যাহ (চল্লিশ হাদীস)-এর প্রথম হাদীসে এই নীতিটি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। নবীজির এই সম্মানিত হাদীসসংকলনটি ইসলামী বিশ্বাস, ইবাদত, নৈতিকতা ও আচরণের সারমর্ম উপস্থাপন করে, যা মুসলমানদের সৎ পথে পরিচালিত করে। এই প্রবন্ধে নিয়্যতের হাদীস, তার গুরুত্ব এবং ইমাম বুখারীর সহীহ বুখারী সংকলনের শুরুতে এই হাদীস নির্বাচন—এসব বিষয়ে ইবন হজরের ব্যাখ্যা ও অন্যান্য আলিমদের মতামতের আলোকে আলোচনা করা হয়েছে।

সূচিপত্র

নিয়্যতের হাদীস

আমীরুল মু’মিনীন আবু হাফস ‘উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেছেন:

“আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি: ‘নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়্যতের উপর নির্ভর করে, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সেইটাই রয়েছে, যার জন্য সে নিয়্যত করে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হবে। আর যার হিজরত দুনিয়াবি কোন লাভ অথবা কোনো নারীকে বিয়ে করার জন্য, তার হিজরত তাই হবে, যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।’”(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

এই হাদীসটি সর্বসম্মতভাবে সহীহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং এটি নির্দেশ করে যে, কোনো আমলের আধ্যাত্মিক মূল্য নির্ধারিত হয় তার অন্তর্নিহিত নিয়্যতের উপর।

রাবি পরিচিতি: ‘উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ)

‘উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবী। তিনি মক্কার কুরাইশ গোত্রের বনু আদি শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে ইসলাম বিরোধী থাকলেও নবুওয়তের ৬ষ্ঠ বছরে তাঁর ইসলাম গ্রহণ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। তিনি দ্বিতীয় খলীফা হিসেবে আল-ফারূক (সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী) এবং আমীরুল মু’মিনীন উপাধি লাভ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামী সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ও উন্নতি সাধিত হয়।

ইমাম বুখারী কেন এই হাদীস দিয়ে শুরু করেছেন

ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ সংকলনের শুরুতে এই হাদীসটি সংযোজন করেছেন, যা ইসলামী শিক্ষার ভিত্তি নির্দেশ করে। ইবন হজর আল-আসকালানী ব্যাখ্যা করেছেন যে, কিছু আলেম প্রশ্ন তুলেছিলেন—ইমাম বুখারী কেন আল-হামদ (আল্লাহর প্রশংসা) বা শাহাদাহ (ঈমানের সাক্ষ্য) দিয়ে শুরু করেননি। আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বর্ণিত কিছু হাদীসে বলা হয়েছে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এইগুলো দিয়ে শুরু হওয়া উচিত।

তবে এসব হাদীস ইমাম বুখারীর কঠোর সহীহ শর্ত পূরণ করেনি এবং খুতবা ব্যতীত অন্য লেখায় প্রশংসা শর্ত নয়। ইমাম বুখারী কেবল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” দ্বারা শুরু করেছেন, যা কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াতের (“পড়ো, তোমার প্রভুর নামে”) এবং রাসূল (ﷺ)-এর পত্রলিখনের পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাঁর এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, তাঁর সংকলনের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ইবন হজর উল্লেখ করেছেন, এটি তাঁর ইখলাসের প্রকাশ। কেউ কেউ মনে করেন, ইমাম বুখারী এই হাদীসটিকে খুতবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যেহেতু এটি ‘উমর (রাঃ) মদিনায় মিম্বর থেকে বলেছিলেন। তবে এই বক্তব্য রাসূল (ﷺ)-এর হিজরতের সময় বলা হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ নেই।

হাদীসটির গুরুত্ব

এই হাদীসটি ইসলামী জ্ঞানের একটি স্তম্ভ। ইমাম শাফিঈ বলেছেন, এটি ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ ধারণ করে, কারণ এটি অন্তরের ভূমিকার সাথে সংশ্লিষ্ট, যা ৭০টিরও বেশি ফিকহ অধ্যায়ে প্রয়োগযোগ্য। ইমাম আহমদ এটিকে তিনটি মূল হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, অন্য দুটি হলো বিদ’আ প্রত্যাখ্যান ও হালাল-হারামের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত। আল-বায়হাকী ব্যাখ্যা করেন, মানুষের অন্তর, জিহ্বা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হল তার ইবাদতের মাধ্যম, যার মধ্যে নিয়্যত (অন্তরের ইচ্ছা) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এককভাবে ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

এই হাদীসের সহীহতা বা নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এবং তা অধিকাংশ হাদীস ইমামগণ গ্রহণ করেছেন, যদিও ইমাম মালিক এটি বর্ণনা করেননি। যদিও এটি টেকনিক্যালি আহাদ (একক বর্ণনা), তবে এর অর্থিকভাবে এটি মুতাওয়াতির (ধারাবাহিক) পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেমন: “মানুষ তাদের নিয়্যতের উপর পুনরুত্থিত হবে” (সহীহ মুসলিম)।

মূল শব্দ ব্যাখ্যা

আ’মাল: একজন বালেগ, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিমের কাজ, বিশেষ করে ইবাদত।
নিয়্যত: অন্তরের সংকল্প, যা একটি কাজের আধ্যাত্মিক মূল্য নির্ধারণ করে।
হিজরত: এমন স্থান থেকে ইমান রক্ষা বা ইবাদতের জন্য স্থানান্তর, যেখানে ইসলাম পালন সম্ভব।

নিয়্যতের উপলব্ধি: আমলের মূল

এই হাদীস শিক্ষা দেয়, আমল বিচার হয় নিয়্যতের উপর ভিত্তি করে। যে হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হয়, তা পুরস্কৃত হয়। আর দুনিয়াবি উদ্দেশ্য বা বিবাহের উদ্দেশ্যে হিজরত, তা শুধু তাই ফল দিবে। আল-কুরতুবী বলেছেন, নিয়্যত ও ইখলাস কোন আমলের গ্রহণযোগ্যতার পূর্বশর্ত।

নিয়্যতের ধরণ

ইখলাস (বিশুদ্ধ নিয়্যত):

এইটি বোঝায় কাজের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য—আল্লাহর সন্তুষ্টি না দুনিয়ার লাভ? কুরআনে বলা হয়েছে:

“তারা আদিষ্ট হয়েছিল কেবল এই জন্য যে, তারা শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর জন্য দীনকে নিখাদ করে” (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮:৫)।

রিয়া (লোক দেখানো) সহ কাজ বাতিল হয়ে যায়। তবে ইমাম আহমদের মতে, যদি কেউ তাৎক্ষণিক রিয়ার চিন্তা দূর করে, তাহলে আসল নিয়্যত দ্বারা আমল সংরক্ষিত হয়।


ইবাদত ও অভ্যাসের পার্থক্য:

নিয়্যত একটি সাধারণ অভ্যাসকে ইবাদতে পরিণত করে। যেমন: রোযা আল্লাহর জন্য হলে তা ইবাদত, কিন্তু ডায়েটিং হলে নয়। ইবাদতের ধরণ নির্ধারণেও নিয়্যত জরুরি (ফরজ বনাম নফল, যোহর বনাম আসর)। ইমাম নববী বলেন, ছুটে যাওয়া নামাজের জন্য নির্দিষ্ট নিয়্যত জরুরি।

মিশ্র নিয়্যত ও দৈনন্দিন কাজ

যদি কেউ হজ্জে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যও যুক্ত করে, তবে ইবন হজর আল-হাইতামী বলেন, পুরস্কার কমে যায় কিন্তু বাতিল হয় না। আর যদি ইবাদতের মধ্যে প্রশংসা আসে, তবে তা পুরস্কারের অতিরিক্ত কারণ হয়: “এটাই একজন মুমিনের সুসংবাদ” (সহীহ মুসলিম)। ইবন সুম’আনী বলেন, খাওয়া-পরা এমনকি দৈনন্দিন কাজও ইবাদত হয়ে যায় সৎ নিয়্যতের কারণে।

রিয়ার বিপদ

রিয়া বা লোক দেখানো ইখলাস নষ্ট করে এবং কখনো শিরকের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। রাসূল (ﷺ) বলেন, এমন আমল বাতিল হয় (সহীহ মুসলিম)। কেউ যদি রোযা রাখে আল্লাহর জন্য এবং ওজন কমানোর জন্য, তাহলে তার পুরস্কার কমে যেতে পারে। তবে যদি মূল নিয়্যত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাহলে আমল সহীহ থাকবে।

মুহাজির উম্মু কাইসের ঘটনা

এই হাদীসের সঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা জড়িত—এক ব্যক্তি উম্মু কাইসকে বিয়ে করতে হিজরত করেছিলেন। আল-তাবারানী ও সাঈদ ইবন মানসুর এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইবন হজরের মতে, ঘটনাটি সহীহ হলেও এটি হাদীসটির সাথে সরাসরি সংযুক্ত নয়। তবে এটি নিয়্যতের ভূমিকা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

উপসংহার

“নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়্যতের উপর নির্ভর করে”—এই হাদীস ইসলামী নীতিমালার একটি ভিত্তি। এটি মুসলিমদের উৎসাহ দেয় নিয়্যত বিশুদ্ধ করতে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করতে। ইমাম বুখারীর এই হাদীস দিয়ে শুরু করার মাধ্যমে তিনি আমাদের শেখান, ইখলাস ও নিয়্যত কিভাবে আমলকে ইবাদতে রূপান্তরিত করে। আমরা যেন সব কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং আমাদের আমল যেন কবুল হয়—এই দোয়া করি।

শেয়ার করুন:
Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্টসমূহ
সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ
Index

Login

Fill out the form below, and we will be in touch shortly.