Mastodon

হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর বিবাহ: এক অপূর্ব ইসলামী আদর্শ

Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads
হযরত আলী ও ফাতেমা (রা) এর বিয়ের ঘটনা

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বকনিষ্ঠ ও চতুর্থ কন্যা হলেন হযরত ফাতেমা (রা.)। মুসলিম জাহানের নারীদের শিরোমণি, সর্বগুণে গুণান্বিত এই মহীয়সী নারী মুসলিম উম্মাহর নারীদের জন্য অন্যতম আদর্শ। যেকোনো নারী যদি শুধু তাঁকে অনুসরণ করেন এবং তাঁর জীবনধারা গভীরভাবে অবলোকন করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ তিনি অনন্য হয়ে উঠবেন।

অন্যদিকে, হযরত আলী (রা.) ছিলেন মক্কার যুবকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাল্যকাল থেকে রাসূল (সা.)-এর সাথে থেকে তিনি প্রথম যুবক হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা.) তাঁর আদরের কন্যা ফাতেমা (রা.)-কে যেমন স্নেহ করতেন, হযরত আলী (রা.)-কেও তেমনই স্নেহ করতেন।

প্রিয় বন্ধুরা, আজ আমরা জানব হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর বিবাহের চমৎকার ঘটনা। এটি বর্তমান যুবক-যুবতী ও অভিভাবকদের জন্য একটি মহান আদর্শ।

বিয়ের প্রস্তাব:

মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে রাসুল (সা:) যখন মদীনায় হিজরত করেন তখন তার  আদরের কন্য হযরত ফাতেমা (রা:) কিশোরি বয়স পেরিয়ে মাত্র যৌবনে পদাপর্ণ করেছেন। তার ‍রুপ আর গুণ যেন চাদে আলোর মতো উদ্ভাসিত করত চারিদিক।  সমগ্র আরবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু।

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হুজুর (সা.)-এর কন্যার জামাতা হওয়ার ইচ্ছা প্রায় সকল আরব মুসলিম যুবকের মধ্যে ছিল। সম্ভ্রান্ত, ধনী ও গুণী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। কিন্তু আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কোনো পাত্রকেই গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।

রাসূল (সা)-এর প্রত্যাশা ও আল্লাহর ফায়সালা:

রাসূল (সা.) এমন একজন পাত্র খুঁজছিলেন যিনি সৎ, আল্লাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, পূর্ণ ঈমানের বলে বলীয়ান এবং আল্লাহর জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আল্লাহ যাঁর উপর ফায়সালা দেবেন।

যোগ্য পাত্রের তালিকায় অনেকেই ছিলেন, যেমন—হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা.)। হযরত আবু বকর (রা.) যখন ফাতেমা (রা.)-এর জন্য প্রস্তাব রাখেন, আল্লাহর নবী বলেন, “আল্লাহ পাকের যা মর্জি তা অবশ্যই ঘটবে।” তাঁর বিষয়ে আল্লাহর ফায়সালা আসেনি। অতঃপর হযরত উমর (রা.) প্রস্তাব পাঠান এবং একই উত্তর আসে।

একবার চিন্তা করুন! হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর মতো যোগ্য পাত্রও কেন সুযোগ পেলেন না ফাতেমা (রা.)-এর স্বামী হতে? কারণ, ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের ফায়সালা আল্লাহর আদেশের উপর নির্ভরশীল ছিল।

সাহাবাদের উদ্বেগ ও আলী (রা)

সাহাবাগণ চিন্তায় পড়ে যান। এমন ছেলে কে আছে যিনি রাসূল (সা.)-এর আদরের দুলালী ফাতেমার জন্য আসলেই যোগ্য, যাঁর ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা আসতে পারে? হযরত আবু বকর, উমর ও সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) একত্রে বসে আলোচনা করতে গিয়ে হঠাৎ হযরত আলী (রা.)-এর কথা মনে পড়ে। একমাত্র তাঁর পক্ষ থেকে প্রস্তাব বাকি ছিল, যিনি আসলেই যোগ্য।

আলী (রা.) কেন যোগ্য ছিলেন?

হযরত আলী (রা.) ছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত আলেম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বক্তা। তিনি জীবদ্দশায় কখনো মূর্তিপূজার ধারেকাছেও যাননি। তিনি ওহীর কাতিবদের অন্যতম, রাসূলের প্রথম হাশেমী খলিফা। বালকদের মাঝে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী এই সাহাবা রাসূলের পরম বিশ্বস্ত ছিলেন।

বিশ্বনবী যখন আবু বকর (রা.)-কে নিয়ে হিজরত করেন, তখন তিনি আলী (রা.)-কে বিছানায় রেখে যান মক্কাবাসীর গচ্ছিত আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। অতঃপর আলী (রা.) রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে সকল আমানত ফেরত দিয়ে মদীনায় হিজরত করেন। ইসলাম প্রচারের সময় তিনি নবী (সা.)-কে সরাসরি নিরাপত্তা প্রদান করতেন।

হিজরী ২ সালে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) বদর যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য মাত্র ৩১৩ জন, কাফেররা ১০০০-এরও বেশি। যুদ্ধে আলী (রা.) মুসলিম বাহিনীর ডানপাশে নেতৃত্ব দেন। রাসূল (সা.)-এর দিকে ছুটে আসা শত্রুদের দমন করতে তিনি একাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান এবং কাফের সেনাদের মধ্যে প্রবেশ করে লড়াই চালান—ইতিহাসের নজিরবিহীন ঘটনা।

পরবর্তীতে হিজরী ৩ সালে (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) উহুদ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। তীরন্দাজদের হুকুম অমান্যের কারণে মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। রাসূল (সা.)-কে যে সাহাবীরা ঘিরে রাখেন, তাঁদের মধ্যে আলী (রা.) অন্যতম। এ যুদ্ধে নবী (সা.)-এর দাঁত শহীদ হয় এবং চেহারায় লোহার কড়া ঢুকে যায়। আলী (রা.) উহুদ পর্বতের পাদদেশে লড়াই করে নবীকে রক্ষা করেন। একসময় তিনি এককভাবে ২০ জনের বেশি শত্রুর সাথে লড়াই করেন এবং তাদের থামান।

আলী (রা.) এর অপারগতা

এত অবদান ও চরিত্রের মাধুর্য থাকা সত্ত্বেও সাহাবারা দ্বিধায় পড়েন। কারণ আলী (রা.) পিতৃ-মাতৃহীন, গৃহহীন, নিঃস্ব, দরিদ্র—তাঁর নিজের থাকার মতো ঘরও ছিল না। তাই প্রস্তাব দেওয়ার সাহস পাননি। আলী (রা.)-এর মনেও বাসনা থাকা সত্ত্বেও একই কারণে তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করার সাহস পাননি।

হযরত উমর (রা:) এর পদক্ষেপ:

কিছু সাহাবা এটা ভেবেই নিয়েছিলন, ফাতেমা (রা:) হয়তো আলী (রা:) এর নসিবেই আছেন। হযরত উমর (রা:) আবু বকর ও সাদ (রা:) কে লক্ষ্য করে বললেন, “আপনারা কেউ যদি নবীজির কাছে আলী (রা:) এর প্রস্তাব দেয়ার সাহস না পান, তবে প্রস্তাবটি আমিই উত্থাপন করব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহর নবী এটা পছন্দ করবেন।

মসজিদে নববীতে রাসূল (সা.) নওমুসলিমদের ইসলামের বাণী শোনাচ্ছিলেন। উমর (রা.) সঙ্গীদের নিয়ে উপস্থিত হয়ে বলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! বেয়াদবি মাফ করবেন। ফাতেমা (রা.)-এর জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু কোনোটাই পছন্দ হয়নি। এবার এক যুবকের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।” নবীজি জিজ্ঞাসা করেন, “কে সেই ব্যক্তি?” উমর বলেন, “আলী ইবনে আবু তালিব। আমার বিশ্বাস, তিনিই একমাত্র যোগ্য। আপনার সম্মতি থাকলে আমরা এই বিষয়ে আলীর সাথে কথা বলব।

আল্লাহর রাসুল (সা) কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে রইলেন। এমন সময় জিব্রাইল (আ) এসে নবী কারিম (সা) জানালেন, “ইয়া রাসুলূল্লাহ! নি:সন্দেহে আপনি আলির হাতে ফাতেমাকে সমর্পণ করতে পারেন। আর এটাই আল্লাহর ইচ্ছা।”

আল্লাহর নবীর মুখে হাসি ফুটল এবং তিনি ওমরকে তার সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে দিলেন।

হযরত আলী (রা:) যখন মাঠে উট চড়াচ্ছিলেন, তখন ওমর (রা:) তার সঙ্গীদেরকে নিয়ে সেখানে হাজির হলেন। হযরত আবু বকর (রা:) আলী (রা:) কে বললেন – “আলী আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি। আমাদের মনে হয় রাসুল (সা) এর কন্যা ফাতেমা আপনার নসীবেই আছে। এবার আপনি ফাতেমাকে বিয়ে করে সংসারী হন। আপনি রাসুলুল্লাহ (সা) এর দরবারে বিয়ের প্রস্তাব রাখুন। নিশ্চই নবীজী আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন।

এ কথা শুনে আলী (রা:) চমকে উঠলেন। তিনি তার এই বাসনার কথা কোনদিন কাউকে সাহস করে বলতে পারেন নি। তিনি উত্তরে বললেন – “এই আশা করা যে, আমার জন্য আকাশ কুসুম কল্পনা করার মতো! যার বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে এসে কত জ্ঞানী, গুণী, মানী-ধনী ব্যক্তিরা নিরাশ হয়ে ফিরে গিয়েছে আমি হব তার স্বামী? এটি কি কখনও সম্ভব! আমার মতো নি:স্ব ও দরিদ্রের হাতে নবীজি তার স্নেহের দুলালীকে সমর্পণ করবেন?

রাসূল (সা) এর জামাতা হওয়ার সাধ যে আমার নেই, তা নয়, তবে আমি আমার নিজের অবস্থার কথা চিন্তা করেই কোনদিন কোন কথা মুখ থেকে বের করি নি। কেননা আমার মত কর্পদকহীন নি:স দরিদ্রের কাছে এটি দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

হযরত উমর বললেন, “না আলী! তোমার জন্য মোটেই এটি দুরাশা নয়। তোমার শুভ ইচ্ছা এবং আকাঙ্খা নিশ্চয়ই পূর্ণ হবে। কারণ তুমি নবীজির হাতে গড়া মানুষ। তুমি জ্ঞানে, গুণে, শৌর্যে-বীর্যে, সেবা ও যত্নে অতুলনীয়। তোমার মধ্যে যোগ্যতার কোন অভাব নেই। রাসুল (সা:) তার মেয়ে ফাতেমাকে যেমন স্নেহ করেন, তোমাকেও তেমন স্নেহ করেন। তুমি এখনই গিয়ে নবীর সাথে সাক্ষাৎ কর আর বিয়ের প্রস্তাব কর। নিশ্চয়ই তোমার আশা পূর্ণ হবে।

রাসূল (সা.) এর দরবারে আলী (রা:)

সাহাবাদের কথা শুনে সাহসে হৃদয় বেঁধে সেদিন সন্ধ্যার পর হযরত আলী (রা:) রাসূলে করীম (সা:) এর দরবারে উপস্থিত হলেন। কিন্তু লজ্জায় তিনি কোন কথা না বলে চুপ করে বসে রইলেন। 

হযরত আলী (রা:) এর লজ্জার বিষয় রাসূলের অজানা ছিল না। তিনি আলীর লাজুক চেহারা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন – ”আলী! কি জন্য এসেছ? ফাতেমার বিবাহ সম্পর্কে প্রস্তাব নিয়ে এসেছ নাকি?

উত্তরে আলী (রা:) মাথা উঠিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললেন – “ জী হ্যা, সেই জন্যই এসেছি, যদি আপনি কবুল করেন। ” রাসুল (সা:) বললেন, “এটাতো অতি উত্তম প্রস্তাব।

প্রস্তাব শুনে হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর চেহারা আনন্দে ভেসে উঠল। হাদিসে বর্ণিত আছে – “ আনাস (রা:) বলেছেন, আনাস! এই মাত্র আমার নিকট জিব্রাইল আ এসে আমাকে বলে গেলেন যে, ফাতেমা (রা:) কে আলীর হাতে সমর্পণ করুন।

হযরত আলী (রা.) এর সাথে ফাতেমা (রা) এর বিয়ে সম্পন্ন:

হযরত আলী (রা:) এর প্রস্তাব উত্থাপনের কয়েকদিন পরেই একদিন মহাবনী (সা:) আলী (রা.) কে তার নিকট ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “আলী! বিবির মোহরানা দিবার মতো তোমার কিছু আছে?” উত্তরে আলী (রা:) বললেন – “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার সম্বল বলতে, একটা ঘোড়া এবং একটি বর্ম ব্যতীত আমার আর অন্য কোন সম্পদ নেই।

রাসুল (সা:) বলেন – “যুদ্ধের জন্য ঘোড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লৌহবর্মটি বিক্রয় করে ফাতেমার দেনমোহরের টাকা যোগাড় কর।

হযরত আলী (রা:) বর্মটি নিয়ে বাজারে চলে গেলেন। হযরত ওসমান (রা:) ঘটনাটি অনুমান করে চারশত দিরহাম দিয়ে বর্মটি ক্রয় করে নিলেন। অত:পর তিনি বললেন – ”এখন এ বর্মটি আমার, এখন আমি এটা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। দেখুন। এই বর্মটি একমাত্র আল্লাহর সিংহ আলীর দেহেই মানায়। অতএব, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তবে আমি বর্মটি আপনাকে আমার বন্ধুত্বের নিদর্শন রুপে উপহার দিচ্ছি, আপনি গ্রহণ করলে ধন্য হব। আর গ্রহণ না করতে কষ্ট পাব।

হযরত আলী (রা:) বন্ধুত্বের নিদর্শনটি গ্রহণ করলেন। ফিরে গিয়ে পুরো ঘটনাটি রাসূল (সা:) কে খুলে বললেন এবং বর্ম বিক্রি করা দিরহামগুলো রাসুল (সা:) এর হাতে দিলেন।

রাসূল (সা:) হযরত বেলাল (রা:) এর হাতে কয়েকটি দিরহাম দিয়ে আতর ক্রয় করে আনতে বললেন এবং হযরত আলী (রা:) ও আবু বকর (রা.) কে বিয়ের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করে আনতে ৩৬০টি দিরহাম দিয়ে তাদেরকে বাজারে পাঠালেন। তারা বাজার থেকে একটি বালিশ, একটি পরদা, একটি তোষক, একটি চাদর, একটি চামড়া নির্মিত ফরাশ এবং একটি খেজুর ছালপূর্ণ উপাদান, ২টি বাহুবন্দ এবং কয়েকটি মাটির পাত্র কিনে আনলেন। রাসুল (সা:) উপহারস্বরুপ দান করলেন – আটা পিষার যাঁতা, দুটি পাজামা, দুখানা বাসন, একটি পেয়ালা, একখানা জায়নামাজ এবং পবিত্র কুরআনের কয়েকটি সূরা।

অত:পর নিমন্ত্রিত মুহাজির ও আনসাররা উপস্থিত হলেন এবং রাসূল (সা:) মিম্বারে আরোহণ করে খুৎবাহ পাঠ করলেন। খুৎবা শেষ করে রাসূল (সা:) আলী (রা:) কে বললেন – “আলী। আমি আমার কন্যা ফাতেমাকে ৪০০ দিরহাম মোহরানার বিনিময়ে তোমার কাছে বিবাহ দিলাম, ‍তুমি রাজি আছতো?

উত্তরে আলী বললেন – ‘আলহামদুলিল্লাহ! আমি কুবল করলাম।” আল্লাহর নবী (সা:) হাত তুলে তাদের জন্য দোয়া করলেন।

অত:পর, এক ঝুড়ি খেজুর এনে রাসূলে করীম (সা:) উপস্থিত মেহমানদের মধ্যে বিতরণ করলেন। সাদ (রা:) মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য দাওয়াতে ওলীমা হিসেবে একটি বকরী দান করলেন।

বিবাহের সময় হযরত আলী (রা.)-এর বয়স ছিল ২১ বছর এবং হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বয়স বিভিন্ন বর্ণনায় প্রায় ১৫–১৮ বছর।

ফাতেমা (রা.) কে রাসূল (সা.) এর শান্তনা:

এভাবে এক ভাবগম্ভীর এবং অনাড়ম্বর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ফাতেমা (রা:) ও আলী (রা:) এর বিয়ে সম্পন্ন হল। দু:খ জনক হলেও সত্যি যে, এরকম একটি দিনেও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর কন্যা ফাতেমার পরনে কোন নতুন জামা বা অলংকার ছিল না।  একটি সাধারণ পুরনো শাড়ি পরিধান করেছিলেন তিনি। নবীজি বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে ঘরে গিয়ে আদরের দুলালীর বিষাদময় মুখখানা দেখে কন্যার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি ফাতেমা (রা:) এর মাথায় হাতি বুলিয়ে বললেন –  “ফাতেমা! মা আমার। তুমি কি জন্য দু:খ করছ? তুমি কি আলীর দারিদ্রের কথা চিন্তা করে বিষন্ন হয়েছ? মা! ‍তুমি দু:খিত হয়ো না। তোমাকে আমি অপাত্রে দান করি নি। তোমার স্বামীর মতো উপযুক্ত পাত্র আমি আর কোথাও খুজে পাই নি। শুধা আমার ইচ্ছায় নয় । আল্লাহর ইচছায়ও আমি তোমাকে আলীর হাতে সমর্পণ করেছি।

যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। যার ঈমান সর্বাপেক্ষা অটল, যিনি আসহাব মন্ডলীর মধ্যে অন্যতম, চরিত্রে, মহত্ত্বে, সৌন্দর্যে ও বীরত্বে যিনি অদ্বিতীয়, তাকে নিতান্ত দরিদ্র জেনেও তার হাতেই তোমাকে তুলে দিয়েছি।

আজ আমি প্রাণ ভরে দোয়া করছি, আল্লাহ যেন তোমাদের উভয়ের পরকাল ও ইহকালের সর্বপ্রকার মঙ্গল দান করেন। “ সেদিন পিতার এ কথা শুনে ফাতেমা (রা:) এর অন্তর শীতল হয়ে গিয়েছিল।

অত:পর বিবাহের পর ফাতেমা (রা:) পিতৃগৃহেই রয়ে গেলেন কিছুদিন, কেননা মদীনায় হযরত আলীর থাকার মতো কোন গৃহ ছিল না। তিনি আনসারদের ঘরে প্রবাস জীবন যাপন করতেন। পরবর্তীতে তিনি ফাতেমা (রা:) কে তার ঘরে তুলেন। 

এই হচ্ছে ফাতেমা (রা:) এর সাথে আলী (রা:) এর বিয়ের ঘটনা।

এই বিবাহ থেকে আমাদের শিক্ষা

প্রিয় বন্ধুরা, হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর এই পবিত্র বিবাহের ঘটনা আমাদেরকে গভীরভাবে কী শিক্ষা দেয়? আসুন এক নজরে দেখি:

১. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে বিচক্ষণতা ও প্রাধান্য গুণের

রাসূলুল্লাহ (সা.) পাত্র নির্বাচনে অত্যন্ত বিচক্ষণ ছিলেন। মদীনার অনেক সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবার থেকে প্রস্তাব এলেও তিনি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ? তিনি তাঁর কন্যার জন্য এমন পাত্র খুঁজছিলেন যিনি ভালো, যোগ্য, সৎ ও আল্লাহভীরু। বর্তমান যুগে অধিকাংশ অভিভাবক পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় প্রথমে খোঁজেন টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত ও সম্পত্তি। কিন্তু আমার নবী (সা.)-এর কাছে এসব কখনো মুখ্য বিষয় ছিল না—মুখ্য ছিল ঈমান, চরিত্র ও তাকওয়া

২. পার্থিব সম্পদের চেয়ে গুণাবলীকে প্রাধান্য দিন

হযরত আলী (রা.)-এর চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও সাহাবীরা তাঁকে যোগ্য মনে করেছিলেন—কারণ তাঁর সৌন্দর্য, গুণাবলী, বীরত্ব ও ঈমান অতুলনীয়। এর অর্থ স্পষ্ট: বিচক্ষণ ব্যক্তিরা পার্থিব সম্পদের চেয়ে গুণাগুণকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সমাজে এই মূল্যবোধ প্রায়ই অনুপস্থিত দেখা যায়।

৩. বিয়ের ফায়সালা আল্লাহর হাতে—দোয়াই ভাগ্য বদলাতে পারে

হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর মতো মহান যোগ্য পাত্র থাকা সত্ত্বেও হযরত আলী (রা.)-ই ফাতেমা (রা.)-কে বিয়ে করেন। কারণ? আল্লাহর ফায়সালা আসমানে হয়, জমিনে নয়। অতএব, বিয়ের ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব হাত নেই—শুধু দোয়া ও তাকদীরে ভরসা রাখতে হবে। অথচ আজকের সমাজে অনেকে মনে করেন, তারা চাইলেই কাউকে ভালোবেসে বিয়ে করতে পারেন। এই ভুল ধারণার কারণেই জিনা, ব্যভিচার ও বিয়ের বাইরে প্রেমের নামে নোংরামি সমাজে বিদ্যমান।

৪. যৌতুক হারাম—মোহরানা সামর্থ্য অনুযায়ী হওয়া উচিত

বিয়ের জন্য যৌতুকের চেয়ে মোহরানা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোহরানা হতে হবে ছেলের সামর্থ্যের মধ্যে—এমন নয় যা এককালীন সহজেই আদায়যোগ্য হয়ে যায়। যৌতুক সম্পূর্ণ হারাম। শ্বশুর-শাশুড়ি খুশি হয়ে যা দেন তাই নেওয়া উচিত। উপহারের নামে কিছু চাওয়া ভিক্ষার চেয়েও নিকৃষ্ট। কিন্তু আজকের সমাজে কাবিননামায় দেনমোহরের অঙ্ক দেখলে মনে হয়, মেয়ের ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা এটাই। অন্যদিকে ছেলের পরিবার কাবিনের বিপরীতে বড় যৌতুক দাবি করে। সহজ কথায়, দুই পক্ষই জুলুমকারী

৫. বিবাহের সুন্নতি পদ্ধতি অনুসরণ করুন

বিবাহের সুন্নতি তরীকা হলো মসজিদে বিবাহ—যেখানে আল্লাহর নবী (সা.) খুতবা দিয়েছেন এবং খেজুর বিতরণ করেছেন। সাহাবীরা হাদিয়া হিসেবে বকরী বা বর্ম দান করেছেন, কিন্তু হাদিয়া বাধ্যতামূলক নয়। সামর্থ্যের বাইরে আয়োজন করে খাওয়ানোও অনুচিত। অথচ বর্তমান বিয়েগুলোতে দাওয়াতের ফর্মালিটি, অতিথিদের কোটা, গান-বাজনা ও বিধর্মী উৎসবের মতো অপ্রয়োজনীয়তা প্রচুর।

৬. সুপাত্রে কন্যাদান করলে নিরাপত্তা ও সুখ নিশ্চিত

রাসূল (সা.) ফাতেমা (রা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, আলী (রা.) একজন সুপাত্র এবং সর্বাধিক যোগ্য। বাস্তবতাও তাই ছিল। যিনি সুপাত্র, তাঁকে অন্য সাহাবীরাও সুপাত্র মনে করতেন। সুপাত্রে কন্যাদান করলে মেয়েদের নিরাপত্তা ও সুখ নিয়ে ভাবতে হয় না। যখন পার্থিব সুখের চেয়ে পরকালের চিন্তা প্রাধান্য পায়, তখন তা আল্লাহর রহমতের চাদরে ঢাকা থাকে। বর্তমানে পরকালের চিন্তা একেবারেই অনুপস্থিত বলে সমাজে ডিভোর্স, পারিবারিক ঝামেলা ও অশান্তি বেশি দেখা যায়।

৭. নিকটস্থ আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ উত্তম

রাসূল (সা.) ও অন্যান্য সাহাবাদের বিবাহ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা জানাশোনা আত্মীয়দের মাঝে সম্পন্ন হয়েছে। আপনার নিকটস্থ আত্মীয় বা কাছাকাছি অঞ্চলে পাত্র-পাত্রী খুঁজুন—যাতে ছেলে বা মেয়ের চারিত্রিক দিক সম্পর্কে সঠিক খোঁজ নেওয়া যায়। মনে রাখবেন, ঘটকদের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার ইতিহাস অনেক বেশি।

প্রিয় অভিভাবক, ভাই ও বোনেরা! আপনারা যদি সত্যিই ইহকাল ও আখিরাতে সুখী হতে চান, তাহলে পার্থিব ধন-দৌলত ও সম্পত্তির চেয়ে ছেলে বা মেয়ের চারিত্রিক মাধুর্য খোঁজার চেষ্টা বেশি করুন। দেখবেন, ইনশাআল্লাহ আপনাদের পরকাল ও ইহকাল—দুটি জীবনই সুখী হবে।

আল্লাহ আমাদেরকে হযরত আলী (রা.)-এর মতো পাত্র এবং হযরত ফাতেমা (রা.)-এর মতো পাত্রী আমাদের পরিবারগুলোতে নসীব করুন। আমীন।

শেয়ার করুন:
Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্টসমূহ
সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ
Index

Login

Fill out the form below, and we will be in touch shortly.