আবুল আলা মওদূদী—এমন একটি নাম, যার পক্ষে যেমন জোরালো যুক্তি রয়েছে, তেমনি তাকে ঘিরে সমালোচনারও অন্ত নেই। বিংশ শতাব্দীর এই প্রখ্যাত গবেষক ও চিন্তাবিদ সম্পর্কে মূল সমালোচনার কারণগুলো অনেকেরই অজানা। আপনি যদি গুগলে “মওদূদীর আকীদা” লিখে সার্চ করেন, তবে উনার বিপক্ষে হাজার হাজার পেজ বা লিংক পাবেন।
সূচীপত্র
Toggleযেহেতু তিনি একজন মানুষ, তাই তাঁর ভুল হওয়া অসম্ভব কিছু নয় এবং তাঁকে অন্ধভাবে অনুসরণ করারও কোনো সুযোগ নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর কতটুকু সত্য আর কতটুকু আবেগী বা বিভ্রান্তিকর, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। আজ আমরা পর্যায়ক্রমে সেই অভিযোগগুলোর সত্যতা অনুসন্ধানে আমাদের প্রথম পর্ব শুরু করছি।
অভিযোগটি কী?
মাওলানা মওদূদীর বিরুদ্ধে একটি বহুল প্রচারিত অভিযোগ হলো সূরা নাসরের ৩ নম্বর আয়াতের তাফসির নিয়ে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন—
“মওদূদী (র.) তাফহীমুল কুরআনে সূরা নাসরের ব্যাখ্যায় লিখেছেন—হযরত মুহাম্মদ (সা.) রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছেন, তাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। এটি নবীদের নিষ্পাপ বা নিষ্কলুষ হওয়ার (ইসমাতে আম্বিয়া) আকিদাকে অস্বীকার করার নামান্তর।”
এমনকি অনেক গবেষক বা আলেমের ভিডিও বক্তব্য শুনেও অনেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। সত্যি কি মাওলানা মওদূদী এমন কিছু বুঝাতে চেয়েছেন? আসুন, তাফহীমুল কুরআনের মূল বক্তব্যটি পাঠ করে দেখা যাক।
তাফহীমুল কুরআনে আসলে কী বলা হয়েছে?
ব্রাদার রাহুলের মতো একজন গবেষক যখন এই কথাটি তার ভিডিওতে বলেছিল তখন আমি নিজেও অনেকটা অস্বস্তিতে পড়ে যাই। কারণ আমি মাওলানা মওদূদীর তাফসীর পড়েছিলাম। স্পেশালি ৩০ পারার অনেকগুলো সূরার। মনের অজান্তেই মাওলানার প্রতি আমারও প্রশ্ন জাগল। অতএব আমি বিষয়টি বুঝার জন্য সুরার নাসরের তাফসীর বের করলাম।

লক্ষ্য করুন কিছু বিষয় –
উনি ৪ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যায় যা বলেছেন সেটা কে যদি আমরা বুঝার চেস্টা করি তাহলে কি দাড়ায়?
“অর্থাৎ তোমার রবের কাছে দোয়া করো। তিনি তোমাকে যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন (তার মানে রিসালাতের দায়িত্ব) তা করতে গিয়ে তোমার (নবীর) যে ভুলত্রুটি হয়েছে তা যেন তিনি মাফ করে দেন।
আপাত দৃষ্টিতে যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, উনি বলেছেন নবী ভুল করেছেন। বিষয়টি আরেকটু বুঝতে এবার আমরা আরেকটু সামনের দিকে যাই।
ইসলাম বান্দাকে এ আদব ও শিষ্টাচার শিখিয়েছে।
অর্থাৎ ভুল হোক বা না হোক আল্লাহর কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়াটা ইসলামী শিষ্ঠাচার।
কোন মানুষের দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের যতবড় খিদমতই সম্পন্ন হোক না কেন, তার পথে সে যতই ত্যাগ স্বীকার করুক না কেন এবং তার ইবাদত ও বন্দেগী করার ব্যাপারে যতই প্রচেষ্টা ও সাধনা চালাক না কেন, তার মনে কখনো এ ধরনের চিন্তা উদয় হওয়া উচিত নয় যে, তার উপর তার রবের যে হক ছিল তা সে পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে।
অর্থাৎ সব সময় এটা মনে করার প্রতি তাগিদ দেয়া হয়েছে যে, রবের পক্ষ থেকে ন্যাস্ত দায়িত্ব এখনও অনেক বাকি আছে, হয়তো পুরোপুরি আদায় করতে পারিনি।
বরং সবসময় তার মনে করা উচিত যে, তার হক আদায় করার ব্যাপারে যেসব দোষ ত্রুটি সে করেছে তা মাফ করে দিয়ে যেন তিনি তার নগন্য খেদমত কবুল করে নেন। এ আদব ও শিষ্টাচার শিখানো হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাঃ কে।
মূলত এটা দ্বারা যাতে মনে কোন কারণে দায়িত্ব পালনের জন্য গর্ব বা অহংকার না আসে তার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এখানে মাওলানা মওদূদী এটা যে একটা শিষ্টাচারের অংশ যা আল্লাহ নিজে নবী সা কে শিখিয়েছেন তা স্পষ্টতই বলেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উনি আসলেই কি এটা বুঝাতে চেয়েছেন যে, নবী ভুল করেছেন, নাকি উনি এটা বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, নবী সা এর প্রচেষ্ঠায় কোন ভুল না থাকলেও “ভুলত্রুটি” থাকতে পারে এটা মনে করে রাসুল কে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে।?
এই উত্তরটাও পরবর্তী ব্যাখ্যায় তিনি পরিস্কার করেছেন।
অথচ তার চেয়ে বেশী আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা সাধনাকারী আর কোন মানুষের কথা কল্পনাই করা যেতে পারে না। তাহলে এ ক্ষেত্রে অন্য কোন মানুষের পক্ষে তার নিজের আমলকে বড় মনে করার অবকাশ কোথায়?
মূলত এটা দ্বারা নবীর দায়িত্ব পালনের সম্পূর্ণতাকেই বুঝানো হয়েছে যেখানে এত স্বয়ং সম্পূর্ণ হওয়ার পরও যদি নবীকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়, সেক্ষেত্রে অন্য কোন মানুষের তো তার আমল নিয়ে গর্ব করার সুযোগই নেই? বাস্তবে বিষয়টি তাই নয় কি?)
কোন সৃষ্টি আল্লাহর হক আদায় করতে সক্ষম হবে, এই ক্ষমতাই তার নেই।
এখানে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরা হয়েছে)।
মহান আল্লাহ এ ফরমান (তার মানে এই আয়াতের দ্বারা) মুসলমানদের এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, নিজের কোন ইবাদাত, আধ্যাত্বিক সাধনা ও দীনি খেদমতকে বড় জিনিস মনে না করে নিজের সমগ্র প্রাণশক্তি আল্লাহর পথে নিয়োজিত ও ব্যয় করার পরও আল্লাহর হক আদায় হয়নি বলে মনে করা উচিত। এভাবে যখনই তারা কোন বিজয় লাভে সমর্থ হবে তখনই এ বিজয়কে নিজেদের কৃতিত্বের নয় বরং মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল মনে করবে। এ জন্য গর্ব ও অহংকারে মত্ত না হয়ে নিজেদের রবের সামনে দীনতার সাথে মাথা নত করে হামদ, সানা ও তাসবীহ পড়তে এবং তওবা ও ইসতিগফার করতে থাকবে।
মূলত এই অংশের দ্বারা মাওলানা মওদূদী এটা বুঝিয়েছেন যে, দীনি কাজ, আমল এবং ইসলামী বিজয়ের জন্য কখনো গর্ব ও অহংকার না করে সর্বদা আল্লাহর শুকর গুজারি হতে হবে আর ক্ষমা চাইতে হবে। যা আল্লাহর নবীর মারফত মুসলমানদের শিখানো একটি শিষ্টাচার।
এই ছিল মওদূদী রহ এর নাছরের সেই আয়াতটির তাফসীর যা নিয়ে উনি সমালোচিত।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, –
তাফহীমুল কুরআনে সূরা নাসরের ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ ও প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়:
- ইস্তিগফারের প্রকৃত অর্থ: মাওলানা মওদূদী (র.) উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনে মানুষের চেষ্টার কোনো ত্রুটি না থাকলেও, আল্লাহর মহান শানের তুলনায় তা সর্বদা অপর্যাপ্ত। তাই দায়িত্ব পালনে অজান্তে কোনো ঘাটতি থেকে গেল কিনা—সেই অনুশোচনা থেকে ক্ষমা চাওয়া ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ।
- বিনয় ও শিষ্টাচার শিক্ষা: এটি মূলত নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমে উম্মতকে শেখানো একটি শিক্ষা। কোনো বড় দীনী খিদমত বা বিজয় অর্জিত হলে যেন মনে অহংকার না আসে, বরং সর্বদা মনে করা উচিত—আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
- নবীজি (সা.)-এর প্রচেষ্টা: মওদূদী (র.) নিজেই লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা সাধনকারী আর কোনো মানুষের কল্পনাও করা যায় না। যেখানে তাঁর মতো মহাসাধককে আল্লাহর সামনে বিনীত হয়ে ইস্তিগফার করতে বলা হয়েছে, সেখানে অন্য কোনো সাধারণ মানুষের নিজের আমল নিয়ে গর্ব করার সুযোগ কোথায়?
মূল প্রশ্ন: মওদূদী (র.) কি নবীজি (সা.)-কে অপরাধী বানিয়েছেন?
উত্তর: একেবারেই না! তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এটি নবীজি (সা.)-এর সর্বোচ্চ নিখুঁত প্রচেষ্টার পরও আল্লাহর দরবারে পরম বিনয় প্রকাশের এক মহান শিক্ষা।
অন্যান্য প্রখ্যাত তাফসিরগ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যা
অভিযোগ তোলার আগে আমাদের দেখা উচিত, ইসলামের অন্যান্য সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কী লিখেছেন:
চলুন এবার আমরা এই একই আয়াতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরগুলো দেখি –
মুফতী তাকী উসমানী বলেছেন:
যদিও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে পবিত্র ও মাছুম ছিলেন এবং তাঁর অত্যুচ্চ মর্যাদার দৃষ্টিতে কোন ভুল-চুক হয়ে গেলেও সূরা ফাতহ (৪৮ : ২)-এ আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন, তা সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিনয়ার্থে এবং উম্মতকে একথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পর্যন্ত ইস্তিগফার করতে বলা হচ্ছে, তখন অন্যান্য মুসলিমদের তো অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে ইস্তিগফারে লিপ্ত থাকা উচিত। [কাজেই এর দ্বারা এরূপ ধারণার কোন অবকাশ নেই যে, নবুওয়াতী দায়িত্ব পালনে তাঁর দ্বারা কোনো দুর্বলতা বা ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গিয়েছিল বলেই ক্ষমাপ্রার্থনার হুকুম করা হয়েছে। …….. [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]
প্রখ্যাত মুফাসসির ও ইসলামী পন্ডিত আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.) বলেন –
ওয়াসতাগফিরহু” অর্থ ”তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো”। – এ কথার অর্থ – হে আমার নবী। আপনি আপনার উম্মতের প্রতি অতি মমতার কারনে কখনো কখনো অত্যুৎকৃষ্ট আমল ছেড়ে গ্রহণ করেছেন উৎকৃষ্ট আমলকে, আপনার অতুলনীয় মর্যাদার পক্ষে যা ছিলো কিন্চিত অনুততম। সে কারনে আপনি আজা আমার সকাশে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। [তাফসীরে মাজহারি]
পাকিস্তানের প্রখ্যাত মুফতি ও ইসলামী পণ্ডিত হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.):
হে মুহাম্মদ সা……… আপনার পালনকর্তার তসবীহ ও প্রশংসা কীর্তন করতে থাকুন এবং তার নিক ক্ষমার আকুতি ব্যক্ত করুন। (অর্থাৎ জীবনে যেসব ছোট খাটো ব্যকিক্রমী আচরণ অনিচ্ছাকৃতভাবেও প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করুন)। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তওবা কবুলকারী।” [মারেফুল কুরআন]
আল্লামা জালালুদ্দীন মহল্লী (রহ.) লিখেছেন –
…অত:পর আপনার প্রভুর প্রশংসার সাথে পবিত্রতা বর্ণনা করুন, আর তার দরবারে গুনাহসমুহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। কেননা তিনি গুনাহগারদের গুনাসমূহ ক্ষমা করে থাকেন। ……. [তাফসিরে জালালাইন]
আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ এই সূরার তাফসির করতে গিয়ে সুরা মুমিনের ৫৫ আয়াত টেনে বলেন –
…… আর আপনি আপনার পাপের জন্য ক্ষমা চান, এবং সকাল সন্ধ্যায় আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা সহকেোর তসবীহ পাঠ করুন (গাফির/মুমিন ৫৫)…… [তাওযীহুল কুরআন]
আসাদুল্লাহ গালিব একই সুরা তাফসিরে সহীহ হাদিস টেনে বলেন –
….. প্রশ্ন হল, রাসূল সা: এর আগে পিছের সব গুনাহ তো মাফ, এমতাবস্থায় তাকে ক্ষমা চাওয়ার হুকুম দেয়ার অর্থ কি? এরুপ প্রশ্ন একবার আয়েশা রা: করলে তার সওয়ালের জবাবে রাসুল সা বলেন – আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?
“রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতের নামাজে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে তাঁর পা ফেটে যেত। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তারপরও আপনি কেন এত কষ্ট করেন?’ তিনি বললেন: ‘أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا’ — ‘তাহলে আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? (সহিহ আল-বুখারি: হাদিস ৪৮৩৭ )‘ [তাফসীরুল কুরআন আসাদুল্লাহ গালিব]
শায়খ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানি তার তাফসিরে লিখেন –
…. এই বিজয় উৎসব পালনের সঠিক তরিকা হচ্ছে, আল্লাহর গুনগান করা, কেবল তারই হামদ আর শুকর গোজার করা। সেই সংগে এই কঠিন দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে গিয়ে মানবিক দুর্বলতার কারণে যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে তার জন্য আল্লাহর দরবারে ইস্তেগফার করা। …….. [তাফসিরে ফাতহুল মাজিদ]
কুরআনে রাসুল (সা)-কে ইঙ্গিত করে এরকম কোন উদ্ধৃতি আছে কি?
চলুন এবার কুরআন থেকে দেখি এমন কোন আয়াত আছে, যেখানে আল্লাহ নবীকে তার নিজের কোন ইজতিহাদি ভুলের জন্য (যা গুনাহ হিসেবে গন্য হয় নি) ক্ষমা চাইতে বলেছেন কি না বা এ সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত আছে কি না বা থাকলেই সেটা দ্বারা আসলে কি বুঝানো হয়েছে?
সূরা মুহাম্মদের ১৯ আয়াতে, আল্লাহ বলেন =
فَاعۡلَمۡ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ وَ اسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۡۢبِكَ وَ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡلَمُ مُتَقَلَّبَكُمۡ وَ مَثۡوٰىكُمۡ ﴿۱۹
এবার আয়াতটির প্রসিদ্ধ অনুবাদগুলো আমরা দেখব –
অতএব জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা চাও তোমার ও মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [আল-বায়ান]
ব্যাখ্যায় তিনি বলেন – “সুতরাং (হে রাসূল!) জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই আর ক্ষমা প্রার্থনা কর নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য এবং মুসলিম নর-নারীর জন্যও। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও তোমাদের অবস্থানস্থল সম্পর্কে জানেন।” [মুফতী তাকী উসমানী ]
কাজেই জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার ভুলত্রুটির জন্য আর মু’মিন ও মু’মিনাদের জন্য, আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত। [তাইসিরুল]
সুতরাং জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই; ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার এবং মু’মিন নর নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। [মুজিবুর রহমান]
উপরের এই আয়াতটির ব্যাখ্যা যদি বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থ থেকে বের করে দেখা, হয় তবে আপনি একই রকমের কাছাকাছি ব্যাখ্যাই পাবেন। আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে আমি একটি তাফসিরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখাচ্ছি।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসূম ছিলেন। তাঁর দ্বারা গুনাহের কোন কাজ হতেই পারত না। তবে তাঁর কোন কোন রায় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে, তা তাঁর উচ্চ মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না (যেমন বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্তটি, যে সম্পর্কে সূরা আনফালে [৮ : ২২-২৩] বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে)। তাছাড়া মানবীয় স্বভাব অনুযায়ী কখনও কখনও তাঁর দ্বারা নামাযের রাকাআত ইত্যাদিতেও ভুল হয়ে গেছে। এ জাতীয় বিষয়কেই এ আয়াতে ‘ত্রুটি-বিচ্যুতি’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে এর দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহ নয় এমন ছোট-ছোট বিষয়ের কারণেও যখন ইস্তিগফার করতেন তখন তাঁর উম্মতের তো তাওবা ইস্তিগফারে অনেক বেশি যত্নবান থাকা উচিত, যেহেতু তাদের দ্বারা ছোট-বড় গুনাহ হর-হামেশাই হয়ে থাকে।
…………… পয়গম্বরসূলভ পবিত্রতার কারণে রসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে যদিও এর বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু পয়গম্বরগণ গোনাহ্ থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও স্থল বিশেষে ইজতিহাদী ভুল হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। শরীয়তের আইনে ইজতিহাদী ভুল গোনাহ্ নয়। বরং এই ভুলেরও সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু পয়গম্বর গণকে এই ভুল সম্পর্কে অবশ্যই অবহিত করে দেওয়া হয় এবং তাঁদের উচ্চমর্যাদার পরিপ্রেক্ষিতে এই ভুলকে ذنب তথা গোনাহ্ শব্দের মাধ্যমেও ব্যক্ত করা হয়, যেমন – সূরা আবাসায় রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে অবতীর্ণ কঠোর সতর্কবাণী এই ইজতিহাদী ভুলেরই একটি দৃষ্টান্ত। সূরা আবাসায় এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে যে, সেই ইজতিহাদী ভুল যদিও গোনাহ্ ছিল না। বরং এরও এক সওয়াব পাওয়ার ওয়াদা ছিল। ………. [ত্বাকী উসমানি]
কুরআনে সূরা ফাতহের ২ নং আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন –
যেন আল্লাহ তোমার পূর্বের ও পরের পাপ ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নিআমত পূর্ণ করেন আর তোমাকে সরল পথের হিদায়াত দেন। [আল-বায়ান]
যাতে আল্লাহ তোমার আগের ও পিছের যাবতীয় ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নি‘মাত পূর্ণ করেন এবং তোমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন। [তাইসিরুলৎ
যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। [মুজিবুর রহমান]
মূল তাফসিরের তুলনা ও নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ
আসুন, আমরা কোনো পূর্বধারণা বা অন্ধ পক্ষপাত ছাড়া সরাসরি মূল তাফসিরগ্রন্থগুলোর বক্তব্য মুখোমুখি রেখে তা বিশ্লেষণ করে দেখি।
১. মূল তাফসিরগুলোর হুবহু বক্তব্য ও তুলনা
- তাফহীমুল কুরআন (মাওলানা মওদূদী):সূরা নাসরের ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর দ্বীনের যত বড় কাজই আঞ্জাম দেওয়া হোক না কেন, মানুষের মনে কখনো এই অহংকার আসা উচিত নয় যে সে আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে। বরং মানবীয় সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্ব পালনে অজান্তে কোনো ঘাটতি বা ভুলত্রুটি থেকে গেল কিনা—সেই অনুশোচনা থেকে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাওয়া এবং বিনয়ী হওয়াই হলো আল্লাহর শেখানো শিষ্টাচার।
- তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন (মুফতী শফী র.):“আপনার পালনকর্তার তাসবীহ ও প্রশংসা কীর্তন করতে থাকুন এবং তাঁর নিকট ক্ষমার আকুতি ব্যক্ত করতে থাকুন। (অর্থাৎ জীবনে যেসব ছোটখাটো ব্যতিক্রমী আচরণ অনিচ্ছাকৃতভাবেও প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো থেকেও ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তওবা কবুলকারী)।”
- তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন (মুফতী তাকী উসমানী):“যদিও মহানবী (সা.) সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে পবিত্র ও মাসুম ছিলেন এবং তাঁর অত্যুচ্চ মর্যাদার দৃষ্টিতে কোনো ভুলচুক হয়ে গেলেও সূরা ফাতহ (৪৮:২)-এ আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন, তা সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উম্মতকে একথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, যখন মহানবী (সা.)-কে পর্যন্ত ইস্তেগফার করতে বলা হয়েছে, তখন অন্যান্য মুসলিমদের তো অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে ইস্তিগফারে লিপ্ত থাকা উচিত।”
২. আভিযোগ বনাম বাস্তবতার তুলনা
| বিষয় | বিরোধীদের আনা অভিযোগ | তাফসীরের প্রকৃত বাস্তবতা |
| অভিযোগের মূল কথা | মওদূদী (র.) নাকি বলেছেন নবী (সা.) নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনে পাপ বা কবিরা গুনাহ করেছেন। | তিনি স্পষ্ট বলেছেন—এটি কোনো গুনাহ বা পাপ নয়, বরং আল্লাহর মহান হকের সামনে চরম বিনয় ও উম্মতকে শিষ্টাচার শেখানোর মাধ্যম। |
| শব্দ চয়ন | ‘ভুল-ত্রুটি’ শব্দ ব্যবহার করায় মওদূদীকে আকিদাভ্রষ্ট বলা হচ্ছে। | মাআরেফুল কুরআনে “ব্যতিক্রমী আচরণ”, তাওযীহুল কুরআনে “ভুলচুক” এবং ফিকহুল আকবারে “খতা ও জিল্লাহ (ভুল-ত্রুটি)” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। |
| আকিদাগত অবস্থান | দাবি করা হয় তিনি নবীদের ‘মাসুম’ বা নিষ্পাপ হওয়ার নীতি অস্বীকার করেছেন। | তিনি চিরায়ত সুন্নি আলেমদের মতোই নবীজিকে শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে মেনে নিয়ে মানবীয় নমনীয়তা ও ইস্তিগফারের ইসলামী ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। |
৩. আকায়েদের বিশ্বস্ত কিতাবসমূহ কী বলে? (ইছমাতুল আম্বিয়া বা নবীদের নিষ্কলুষতা)
ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর বিখ্যাত আকিদার কিতাব ‘আল-ফিকহুল আকবার’ এবং এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘শারহুল ফিকহিল আকবার’ (মোল্লা আলী ক্বারী ও মাগনিসাবী)-এ নবীদের নিষ্পাপ হওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
“নবীগণ কবিরা ও সগিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও সংরক্ষিত (মাসুম)। তবে তাঁদের থেকে মানবীয় অনৈচ্ছিক ভুল-ত্রুটি বা পদস্খলন (খতা ও জিল্লাহ/খিলাফে আওলা) হওয়া সম্ভব।”
একইভাবে তাফতাজানীর আকায়েদে নাসাফী, ইমাম তাহাবীর আকায়েদে তাহাবিয়া এবং আশআরি-মাতুরিদি মাযহাবের অধিকাংশ মুতাকাল্লিমীন (আকিদা বিশারদ) একমত যে—নবীদের থেকে ইচ্ছাকৃত কোনো পাপ সংগঠিত হয় না, তবে ‘ইজতিহাদী ভুল’ বা ‘উত্তম বিষয়টি ত্যাগ করে অনুত্তম বিষয়টি গ্রহণ করা’ সম্ভব, যাকে মর্যাদা অনুযায়ী ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে পূর্ণতা দেওয়া হয়।
পাঠক ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান:
যদি ‘অনভিপ্রেত বা ইজতিহাদী ভুল-ত্রুটি’ শব্দের কারণে মাওলানা মওদূদীর আকিদা খারাপ হয়ে যায়, তবে জুমহুর (অধিকাংশ) ফুকাহা ও মুফাসসিরীন—যাঁরা একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন—তাদের আকিদা সম্পর্কে আমরা কী বলব?
বাস্তবতা হলো, এটি আকিদাগত কোনো বিচ্যুতি নয়; বরং কোনো লেখকের পুরো বই বা প্রেক্ষাপট না পড়ে, মূল লেখা থেকে দুই-একটি বাক্য বিচ্ছিন্নভাবে (Out of context) কেটে নিয়ে ট্রোল বা সমালোচনা করার একটি অপসংস্কৃতি।
তাই বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে আমাদের উচিত:
১. মূল উৎস বা প্রাইমারি সোর্স থেকে নিজে পড়ে সত্যতা যাচাই করা।
২. কারো ব্যক্তিগত ভুল থাকলে তা সংশোধন করা, কিন্তু ঢালাওভাবে আকিদাভ্রষ্ট ট্যাগ না দেওয়া।
৩. অহেতুক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করে উম্মাহর মধ্যকার ঐক্য ও সহনশীলতা বজায় রাখা।
চিন্তার বিষয়: এই কথাগুলো যদি অন্য কোনো আধুনিক লেখকের লেখনীতে থাকত, তবে হয়তো তাঁকেও ‘আকিদা ভ্রষ্ট’ বলে ফতোয়া দেওয়া হতো। কিন্তু ক্লাসিক্যাল ও দেওবন্দী আলেমদের ক্ষেত্রে আমরা বিষয়গুলোকে সুন্দর ব্যাখ্যার আলোকেই গ্রহণ করি। তবে মওদূদী (র.)-এর ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন মাপকাঠি?
উপসংহার
মাওলানা মওদূদী (র.)-এর তাফসির পাঠ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, তিনি নবীজি (সা.)-এর নবুওয়াত বা মাসুম হওয়ার আকিদাকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি উম্মতের শিক্ষা, দায়িত্ব পালনের বিনয় এবং আল্লাহর হকের সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতার দিকটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।
কাউকে অপদস্থ বা ঘায়েল করার জন্য লেখা থেকে দু-একটি বাক্য কেটে নিয়ে (Context ছাড়া) প্রচার করা এবং সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করা কোনো দায়িত্বশীল মুসলিমের কাজ হতে পারে না। আমাদের উচিত নিরপেক্ষভাবে সঠিক তথ্য জানা, ভুলগুলো বর্জন করা এবং ভালোগুলো গ্রহণ করে উম্মাহর ঐক্যের চেষ্টা করা।