আবুল আলা মওদূদী (রহ.)—এমন একটি নাম, যার পক্ষে যেমন জোরালো যুক্তি রয়েছে, তেমনি তাকে ঘিরে সমালোচনারও অন্ত নেই। বিংশ শতাব্দীর এই প্রখ্যাত গবেষক ও চিন্তাবিদ সম্পর্কে মূল সমালোচনার কারণগুলো অনেকেরই অজানা। বিশেষ করে তাঁর বিশ্বখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘তাফহীমুল কুরআন’-এ মাওলানা মওদূদীর সূরা নাসর তাফসীর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় বিতর্ক দেখা যায়। বিরোধীদের অভিযোগ—তিনি নাকি এই তাফসিরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শানে অবমাননা করেছেন।
সূচীপত্র
Toggleতবে অ্যাকাডেমিক বিচারে প্রশ্ন ওঠে—মাওলানা মওদূদীর সূরা নাসরের এই ব্যাখ্যা কি আসলেই মূলধারার তাফসিরের মূলনীতিবিরোধী, নাকি এটি কেবলই পরিভাষাগত দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা? যেহেতু তিনি একজন মানুষ, তাই তাঁর ভুল হওয়া অসম্ভব কিছু নয় এবং তাঁকে অন্ধভাবে অনুসরণ করারও সুযোগ নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর কতটুকু সত্য, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
সূরা নাসর প্রসঙ্গে মওদূদীর ব্যাখ্যা জানতে এবং বিস্তারিত তথ্য পেতে আমাদের মূল অনুসন্ধান মওদূদী সূরা নাসর তাফসির ফ্যাক্ট চেক নিবন্ধে চোখ রাখতে পারেন। আজ আমরা পর্যায়ক্রমে আমাদের মওদূদীবাদের খণ্ডন (১ম পর্ব)-এর অংশ হিসেবে আলোচনা শুরু করছি।
তাফহীমুল কুরআনে আসলে কী বলা হয়েছে?
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ভিডিওতে যখন এই তাফসিরি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখন সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের মনে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই এই বিতর্কের মূল ভিত্তি বুঝতে সূরা নাসরের তাফসিরের মূল টেক্সট ও এর প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
লক্ষ্য করুন কিছু বিষয়—
উনি ৩ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যায় যা বলেছেন সেটা কে যদি আমরা বুঝার চেস্টা করি তাহলে কি দাড়ায়?
আপাত দৃষ্টিতে যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, উনি বলেছেন নবী ভুল করেছেন। সত্যি কি মওদূদী কি সূরা নাসরে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন? নাকি মাওলানা মওদূদী অন্য কিছু বুঝাতে চেয়েছেন? বিষয়টিকে নিখুঁতভাবে বুঝতে এবার আমরা তাঁর পরবর্তী ব্যখ্যাগুলোর দিকে যাই:
ইসলাম বান্দাকে এ আদব ও শিষ্টাচার শিখিয়েছে:অর্থাৎ ভুল হোক বা না হোক আল্লাহর কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়াটা ইসলামী শিষ্ঠাচার।
"কোন মানুষের দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের যতবড় খিদমতই সম্পন্ন হোক না কেন, তার পথে সে যতই ত্যাগ স্বীকার করুক না কেন এবং তার ইবাদত ও বন্দেগী করার ব্যাপারে যতই প্রচেষ্টা ও সাধনা চালাক না কেন, তার মনে কখনো এ ধরনের চিন্তা উদয় হওয়া উচিত নয় যে, তার উপর তার রবের যে হক ছিল তা সে পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে।"(অর্থাৎ সব সময় এটা মনে করার প্রতি তাগিদ দেয়া হয়েছে যে, রবের পক্ষ থেকে ন্যাস্ত দায়িত্ব এখনও অনেক বাকি আছে, হয়তো পুরোপুরি আদায় করতে পারিনি।)
"বরং সবসময় তার মনে করা উচিত যে, তার হক আদায় করার ব্যাপারে যেসব দোষ ত্রুটি সে করেছে তা মাফ করে দিয়ে যেন তিনি তার নগন্য খেদমত কবুল করে নেন। এ আদব ও শিষ্টাচার শিখানো হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাঃ কে।"(মূলত এটা দ্বারা যাতে মনে কোন কারণে দায়িত্ব পালনের জন্য গর্ব বা অহংকার না আসে তার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।)
এখানে মাওলানা মওদূদী এটা যে একটা শিষ্টাচারের অংশ যা আল্লাহ নিজে নবী সা কে শিখিয়েছেন তা স্পষ্টতই বলেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মওদূদী কি সূরা নাসরে রাসুল সা ভুলত্রুটি করছেন বলেছেন? নাকি উনি এটি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, নবী (সা.)-এর প্রচেষ্টায় কোনো ভুল না থাকলেও “ভুলত্রুটি থাকতে পারে” মনে করে বিনীতভাবে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে? এই উত্তরটিও পরবর্তী ব্যাখ্যায় তিনি পরিষ্কার করেছেন—
"অথচ তার চেয়ে বেশী আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা সাধনকারী আর কোন মানুষের কথা কল্পনাই করা যেতে পারে না। তাহলে এ ক্ষেত্রে অন্য কোন মানুষের পক্ষে তার নিজের আমলকে বড় মনে করার অবকাশ কোথায়?"
(মূলত এটা দ্বারা নবীর দায়িত্ব পালনের সম্পূর্ণতাকেই বুঝানো হয়েছে যেখানে এত স্বয়ং সম্পূর্ণ হওয়ার পরও যদি নবীকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়, সেক্ষেত্রে অন্য কোন মানুষের তো তার আমল নিয়ে গর্ব করার সুযোগই নেই? বাস্তবে বিষয়টি তাই নয় কি?)
"আল্লাহর যে অধিকার তার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা সে আদায় করে দিয়েছে, এ অহংকারে মত্ত হওয়ার কোন সুযোগই কি তার থাকে? কোন সৃষ্টি আল্লাহর হক আদায় করতে সক্ষম হবে, এই ক্ষমতাই তার নেই।"
(এখানে তিনি মানুষের সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরা হয়েছে এবং তিনি স্পষ্টতই বলেছেন যে, আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনে অহংকার জন্মানোর সুযোই নেই)।
"মহান আল্লাহ এ ফরমান (তার মানে এই আয়াতের দ্বারা) মুসলমানদের এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, নিজের কোন ইবাদাত, আধ্যাত্বিক সাধনা ও দীনি খেদমতকে বড় জিনিস মনে না করে নিজের সমগ্র প্রাণশক্তি আল্লাহর পথে নিয়োজিত ও ব্যয় করার পরও আল্লাহর হক আদায় হয়নি বলে মনে করা উচিত। এভাবে যখনই তারা কোন বিজয় লাভে সমর্থ হবে তখনই এ বিজয়কে নিজেদের কৃতিত্বের নয় বরং মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল মনে করবে। এ জন্য গর্ব ও অহংকারে মত্ত না হয়ে নিজেদের রবের সামনে দীনতার সাথে মাথা নত করে হামদ, সানা ও তাসবীহ পড়তে এবং তওবা ও ইসতিগফার করতে থাকবে।"
মূলত এই অংশের দ্বারা মাওলানা মওদূদী এটা বুঝিয়েছেন যে, দীনি কাজ, আমল এবং ইসলামী বিজয়ের জন্য কখনো গর্ব ও অহংকার না করে সর্বদা আল্লাহর শুকর গুজারি হতে হবে আর ক্ষমা চাইতে হবে। যা আল্লাহর নবীর মারফত মুসলমানদের শিখানো একটি শিষ্টাচার। এই ছিল মওদূদী (রহ.)-এর নাসরের সেই আয়াতটির তাফসীর যা নিয়ে উনি সমালোচিত।
সংক্ষেপে বলতে গেলে:
তাফহীমুল কুরআনে সূরা নাসরের ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ ও প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়:
- ইস্তিগফারের প্রকৃত অর্থ: মাওলানা মওদূদী (র.) উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনে মানুষের চেষ্টার কোনো ত্রুটি না থাকলেও, আল্লাহর মহান শানের তুলনায় তা সর্বদা অপর্যাপ্ত। তাই দায়িত্ব পালনে অজান্তে কোনো ঘাটতি থেকে গেল কিনা—সেই অনুশোচনা থেকে ক্ষমা চাওয়া ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ।
- বিনয় ও শিষ্টাচার শিক্ষা: এটি মূলত নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমে উম্মতকে শেখানো একটি শিক্ষা। কোনো বড় দীনী খিদমত বা বিজয় অর্জিত হলে যেন মনে অহংকার না আসে, বরং সর্বদা মনে করা উচিত—আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
- নবীজি (সা.)-এর প্রচেষ্টা: মওদূদী (র.) নিজেই লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা সাধনকারী আর কোনো মানুষের কল্পনাও করা যায় না। যেখানে তাঁর মতো মহাসাধককে আল্লাহর সামনে বিনীত হয়ে ইস্তিগফার করতে বলা হয়েছে, সেখানে অন্য কোনো সাধারণ মানুষের নিজের আমল নিয়ে গর্ব করার সুযোগ কোথায়?
- মূল প্রশ্ন: মওদূদী (র.) কি নবীজি (সা.)-কে অপরাধী বানিয়েছেন?
- উত্তর: একেবারেই না! তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এটি নবীজি (সা.)-এর সর্বোচ্চ নিখুঁত প্রচেষ্টার পরও আল্লাহর দরবারে পরম বিনয় প্রকাশের এক মহান শিক্ষা।
সমালোচকদের মূল আপত্তি ও অবস্থান:
দেওবন্দি ও ঐতিহ্যবাহী আলেমদের মূল আপত্তিটি প্রধানত শব্দচয়ন কেন্দ্রিক। তাঁদের মতে, মাওলানা মওদূদী (রহ.) উর্দুতে সাধারণ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তাফসির লিখতে গিয়ে ‘কোতাহী’ (ভুলত্রুটি/কমতি) শব্দ ব্যবহার করেছেন। পরিভাষাগত সূক্ষ্মতা না বুঝে সাধারণ পাঠক যখন নবীর ক্ষেত্রে ‘কোতাহী’ শব্দটি পড়ে, তখন তাদের মনে নবুয়তের শান ও ইসমত (নিষ্কলুষতা) সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই এই শব্দচয়নকে তারা অনভিপ্রেত হিসেবে চিহ্নিত করেন।
অন্যান্য প্রখ্যাত তাফসিরগ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যা
অভিযোগ তোলার আগে আমাদের দেখা উচিত, ইসলামের অন্যান্য সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কী লিখেছেন। চলুন এবার আমরা এই একই আয়াতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরগুলো দেখি—
দারুল উলূম দেওবন্দের সিনিয়র ওস্তাদদের লিখিত ও মাদরাসায় পঠিত 'আল-কামাললাইন' (الكمالين في شرح تفسير الجلالين) কিতাবে সূরা নাসরের ৩ নম্বর আয়াতের তাফসিরে হুবহু একই রহস্য ও তাৎপর্য তুলে ধরে বলা হয়েছে:
"১. এই গুরু দায়িত্ব (নবুওয়াতের দায়িত্ব) আঞ্জাম দিতে গিয়ে সম্ভব যে আপনার থেকে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে যেতে পারে।"
"২. আপনি এই দোয়া করুন যে, এর হক (আমার উপর অর্পিত দায়িত্বের হক) আদায় করতে গিয়ে আমার থেকে যে كوتائى (কোতাহী বা কমতি) হয়েছে তা আপনি মাফ করে দিন।"
"৩. আপনি নিজের ও উম্মতের ব্যাপারে দোয়া করুন যে, এই দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে গিয়ে যদি কোনো ভুলত্রুটি বা لغزش (লগজিস বা অনৈচ্ছিক পদস্খলন) হয়ে থাকে তাহলে তা যেন মাফ করে দেওয়া হয়।"
— [আল-কামাললাইন ফি শারহিল জালালাইন]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মহান ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) তাফসীরে কাবীরে সূরা নাসরের ইস্তিগফারের রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুবহু একই পরিভাষা ব্যবহার করে লিখেছেন:
"১. فاطلب الاستغفار عن تقصيرك في طاعته (অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্য ও অর্পিত দায়িত্ব পালনে যে ত্রুটি বা কমতি হয়েছে, তা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করুন)।"
"২. الاستغفار بسبب التقصير الواقع في السلوك (আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে অর্পিত হকের বিচারে যেসকল ত্রুটি বা কমতি সংঘটিত হয়েছে, তার জন্যই এই ইস্তিগফারের নির্দেশ)।"
— [তাফসীরে কাবীর, ১৭শ খণ্ড, পৃ. ১৬৩]
"ওয়াসতাগফিরহু” অর্থ ”তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো”। এ কথার অর্থ—হে আমার নবী! আপনি আপনার উম্মতের প্রতি অতি মমতার কারনে কখনো কখনো অত্যুৎকৃষ্ট আমল ছেড়ে গ্রহণ করেছেন উৎকৃষ্ট আমলকে, আপনার অতুলনীয় মর্যাদার পক্ষে যা কিঞ্চিত অনুত্তম। সে কারনে আপনি আজ আমার সকাশে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।(অন্যত্র তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন: "উম্মতের প্রতি ক্ষমাবশত অতি উত্তমকে ছেড়ে উত্তমকে গ্রহণ করার ফলে যে কমতি ঘটলো, তার প্রতিকার কল্পেও ইস্তেগফার করুন।") [১৩শ খণ্ড, পৃ. ৪১৩]
— [তাফসীরে মাজহারি]
“যদিও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে পবিত্র ও মাছুম ছিলেন এবং তাঁর অত্যুচ্চ মর্যাদার দৃষ্টিতে কোন ভুল-চুক হয়ে গেলেও সূরা ফাতহ (৪৮ : ২)-এ আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন, তা সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিনয়ার্থে এবং উম্মতকে একথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পর্যন্ত ইস্তিগফার করতে বলা হচ্ছে, তখন অন্যান্য মুসলিমদের তো অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে ইস্তিগফারে লিপ্ত থাকা উচিত। [কাজেই এর দ্বারা এরূপ ধারণার কোন অবকাশ নেই যে, নবুওয়াতী দায়িত্ব পালনে তাঁর দ্বারা কোনো দুর্বলতা বা ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গিয়েছিল বলেই ক্ষমাপ্রার্থনার হুকুম করা হয়েছে।...]"— [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]

“হে মুহাম্মদ সা... আপনার পালনকর্তার তসবীহ ও প্রশংসা কীর্তন করতে থাকুন এবং তার নিকট ক্ষমার আকুতি ব্যক্ত করুন। (অর্থাৎ জীবনে যেসব ছোট খাটো ব্যকিক্রমী আচরণ অনিচ্ছাকৃতভাবেও প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করুন)। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তওবা কবুলকারী।”
— [মারেফুল কুরআন]
“…অত:পর আপনার প্রভুর প্রশংসার সাথে পবিত্রতা বর্ণনা করুন, আর তার দরবারে গুনাহসমুহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। কেননা তিনি গুনাহগারদের গুনাসমূহ ক্ষমা করে থাকেন।…”— [তাফসিরে জালালাইন]
“…… আর আপনি আপনার পাপের জন্য ক্ষমা চান, এবং সকাল সন্ধ্যায় আপনার প্রতিপ্রতিপালকের প্রশংসা সহকারে তসবীহ পাঠ করুন (গাফির/মুমিন ৫৫)......”
— [তাওযীহুল কুরআন]
“...প্রশ্ন হলো, রাসূল সা: এর আগে পিছের সব গুনাহ তো মাফ, এমতাবস্থায় তাকে ক্ষমা চাওয়ার হুকুম দেয়ার অর্থ কি? এরুপ প্রশ্ন একবার আয়েশা রা: করলে তার সওয়ালের জবাবে রাসুল সা বলেন—আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?
'রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতের নামাজে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে তাঁর পা ফেটে যেত। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তারপরও আপনি কেন এত কষ্ট করেন?' তিনি বললেন: 'أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا' — 'তাহলে আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? (সহিহ আল-বুখারি: হাদিস ৪৮৩৭)'”
— [তাফসীরুল কুরআন আসাদুল্লাহ গালিব]
“…. এই বিজয় উৎসব পালনের সঠিক তরিকা হচ্ছে, আল্লাহর গুনগান করা, কেবল তারই হামদ আর শুকর গোজার করা। সেই সংগে এই কঠিন দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে গিয়ে মানবিক দুর্বলতার কারণে যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে তার জন্য আল্লাহর দরবারে ইস্তেগফার করা। ….”
— [তাফসিরে ফাতহুল মাজিদ]
কুরআনে রাসুল (সা)-কে ইঙ্গিত করে এরকম কোন উদ্ধৃতি আছে কি?
চলুন এবার কুরআন থেকে দেখি এমন কোন আয়াত আছে, যেখানে আল্লাহ নবীকে তার নিজের কোন ইজতিহাদি ভুলের জন্য (যা গুনাহ হিসেবে গন্য হয় নি) ক্ষমা চাইতে বলেছেন কি না বা এ সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত আছে কি না বা থাকলেই সেটা দ্বারা আসলে কি বুঝানো হয়েছে?
সূরা মুহাম্মদের ১৯ আয়াতে, আল্লাহ বলেন:
আয়াতটির প্রসিদ্ধ অনুবাদসমূহ:
- অতএব জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা চাও তোমার ও মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। [আল-বায়ান]
- “সুতরাং (হে রাসূল!) জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই আর ক্ষমা প্রার্থনা কর নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য এবং মুসলিম নর-নারীর জন্যও। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও তোমাদের অবস্থানস্থল সম্পর্কে জানেন।” [মুফতী তাকী উসমানী]
- কাজেই জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার ভুলত্রুটির জন্য আর মু’মিন ও মু’মিনাদের জন্য, আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত। [তাইসিরুল]
- সুতরাং জেনে রেখ, আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই; ক্ষমা প্রার্থনা কর তোমার এবং মু’মিন নর নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। [মুজিবুর রহমান]
উপরের এই আয়াতটির ব্যাখ্যা যদি বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থ থেকে বের করে দেখা হয়, তবে আপনি একই রকমের কাছাকাছি ব্যাখ্যাই পাবেন। আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে আমি একটি তাফসিরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখাচ্ছি—
...পয়গম্বরসূলভ পবিত্রতার কারণে রসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে যদিও এর বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু পয়গম্বরগণ গোনাহ্ থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও স্থল বিশেষে ইজতিহাদী ভুল হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। শরীয়তের আইনে ইজতিহাদী ভুল গোনাহ্ নয়। বরং এই ভুলেরও সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু পয়গম্বর গণকে এই ভুল সম্পর্কে অবশ্যই অবহিত করে দেওয়া হয় এবং তাঁদের উচ্চমর্যাদার পরিপ্রেক্ষিতে এই ভুলকে ذنب তথা গোনাহ্ শব্দের মাধ্যমেও ব্যক্ত করা হয়, যেমন - সূরা আবাসায় রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে অবতীর্ণ কঠোর সতর্কবাণী এই ইজতিহাদী ভুলেরই একটি দৃষ্টান্ত। সূরা আবাসায় এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে যে, সেই ইজতিহাদী ভুল যদিও গোনাহ ছিল না। বরং এরও এক সওয়াব পাওয়ার ওয়াদা ছিল।”
— [ত্বাকী উসমানি]
কুরআনে সূরা ফাতহের ২ নং আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন:
আয়াতটির প্রসিদ্ধ অনুবাদসমূহ:
- যেন আল্লাহ তোমার পূর্বের ও পরের পাপ ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নিআমত পূর্ণ করেন আর তোমাকে সরল পথের হিদায়াত দেন। [আল-বায়ান]
- যাতে আল্লাহ তোমার আগের ও পিছের যাবতীয় ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নি‘মাত পূর্ণ করেন এবং তোমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন। [তাইসিরুল]
- যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। [মুজিবুর রহমান]
সূরা ফাতহের ২ নং আয়াতের বিখ্যাত তাফসীরগুলোর ব্যাখ্যা:
আয়াত বিশ্লেষণ: ‘লিয়াগফিরা’ (لِّيَغْفِرَ)-তে ‘লাম’ অক্ষরটি কারণ বর্ণনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, সুস্পষ্ট এই বিজয় দানের তিনটি কারণ আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। এটা ত্রুটি মার্জনার কারণ এই জন্য যে, এই সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা বহু বেড়ে যায়। যার ফলে নবী করীম (সাঃ)-এর মহা পুণ্য ও সওয়াব খুব বর্ধিত হয়। আর পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মোচন করে দেয়।”
— [আহসানুল বাইয়ান]
'সরল পথে পরিচালিত করার' অর্থ: এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে, নবী (সাঃ) তো শুরু থেকেই সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য হেদায়েতের উৎস ছিলেন। তাহলে বিজয়ের মাধ্যমে সরল পথে পরিচালিত হওয়ার অর্থ কী?
'হিদায়াহ' বলতে কাউকে পথ দেখানো অথবা তার গন্তব্যস্থলে কোমল ও সদয়ভাবে পরিচালিত করাকে বোঝায়। মানুষের আসল গন্তব্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করা। আধ্যাত্মিক অর্জনের এই স্তর সীমাহীন। প্রথম সূরায় সঠিক পথনির্দেশনার জন্য প্রার্থনা করার নির্দেশ কেবল উম্মতের জন্য নয়, বরং মহানবী (সাঃ)-এর জন্যও—যাতে তিনি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মর্যাদার আরও উচ্চতর শিখরে উন্নীত হতে পারেন।”
— [তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন]
— [মুফতী তাকী উসমানী, তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন]
মূল তাফসিরের তুলনা ও নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ
আসুন, আমরা কোনো পূর্বধারণা বা অন্ধ পক্ষপাত ছাড়া সরাসরি মূল তাফসিরগ্রন্থগুলোর বক্তব্য মুখোমুখি রেখে তা বিশ্লেষণ করে দেখি।
১. মূল তাফসিরগুলোর হুবহু বক্তব্য ও তুলনা
- তাফহীমুল কুরআন (মাওলানা মওদূদী): সূরা নাসরের ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর দ্বীনের যত বড় কাজই আঞ্জাম দেওয়া হোক না কেন, মানুষের মনে কখনো এই অহংকার আসা উচিত নয় যে সে আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে। বরং মানবীয় সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্ব পালনে অজান্তে কোনো ঘাটতি বা ভুলত্রুটি থেকে গেল কিনা—সেই অনুশোচনা থেকে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাওয়া এবং বিনয়ী হওয়াই হলো আল্লাহর শেখানো শিষ্টাচার।
- তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন (মুফতী শফী র.): "আপনার পালনকর্তার তাসবীহ ও প্রশংসা কীর্তন করতে থাকুন এবং তাঁর নিকট ক্ষমার আকুতি ব্যক্ত করতে থাকুন। (অর্থাৎ জীবনে যেসব ছোটখাটো ব্যতিক্রমী আচরণ অনিচ্ছাকৃতভাবেও প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো থেকেও ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তওবা কবুলকারী)।"
- তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন (মুফতী তাকী উসমানী): "যদিও মহানবী (সা.) সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে পবিত্র ও মাসুম ছিলেন এবং তাঁর অত্যুচ্চ মর্যাদার দৃষ্টিতে কোনো ভুলচুক হয়ে গেলেও সূরা ফাতহ (৪৮:২)-এ আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন, তা সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উম্মতকে একথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, যখন মহানবী (সা.)-কে পর্যন্ত ইস্তেগফার করতে বলা হয়েছে, তখন অন্যান্য মুসলিমদের তো অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে ইস্তিগফারে লিপ্ত থাকা উচিত।"
শব্দগত সূক্ষ্মতা ও আকিদাগত বাস্তবতা:
লক্ষ্য করার বিষয় হলো, মাওলানা মওদূদী (রহ.) বা দেওবন্দি আকাবিরদের কেউই কিন্তু কোথাও নবীজি (সা.)-এর জন্য 'গুনাহ' (পাপ) শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং উভয় পক্ষই ব্যবহার করেছেন 'কোতাহী' (হক আদায়ে অজান্তে থেকে যাওয়া কমতি), 'লগজিস' (অনৈচ্ছিক পদস্খলন) এবং 'ভুলত্রুটি' শব্দগুলো—যা আকিদাগতভাবে কোনো গুনাহ নয়, বরং মহান আল্লাহর শানের সামনে বান্দার পরম বিনয় ও শিষ্টাচার প্রকাশের মাধ্যম।
২. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: অভিযোগ বনাম বাস্তবতা
| বিষয় | সমালোচকদের অভিযোগ | মূল তাফসীর ও জুমহুর উলামাদের বক্তব্য |
|---|---|---|
| মূল দাবি | মাওলানা মওদূদী (রহ.) নবীজিকে অপরাধী বা গুনাহগার বানিয়েছেন। | তিনি স্পষ্ট করেছেন যে এটি কোনো পাপ নয়, বরং চরম বিনয় প্রকাশ ও উম্মতকে আদব শেখানোর মাধ্যম। |
| শব্দ চয়ন | 'ভুল-ত্রুটি' শব্দ ব্যবহারে আকিদা ভ্রষ্টতার অভিযোগ। | মাআরেফুল কুরআনে "ব্যতিক্রমী আচরণ", তাওযীহুল কুরআনে "ভুলচুক" এবং আল-ফিকহুল আকবারে "খতা ও জিল্লাহ (অনৈচ্ছিক পদস্খলন)" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। |
| আকিদাগত অবস্থান | নবীদের মাসুম (নিষ্পাপ) হওয়ার নীতি অস্বীকার। | সুন্নী আলেমদের মতোই তিনি নবীজিকে শ্রেষ্ঠ ও মাসুম মেনে মানবীয় নমনীয়তা ও ইস্তিগফারের ইসলামী তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। |
আকায়েদের কিতাবের দৃষ্টিকোণ (ইছমাতুল আম্বিয়া বা নবীদের নিষ্কলুষতা)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর 'আল-ফিকহুল আকবার' এবং এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'শারহুল ফিকহিল আকবার' (মোল্লা আলী ক্বারী ও মাগনিসাবী) সহ সালাফদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:
"নবীরা কবিরা ও সগিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত (মাসুম)। তবে তাঁদের থেকে মানবীয় অনৈচ্ছিক ভুল-ত্রুটি, পদস্খলন (খতা ও জিল্লাহ) বা উত্তমটি ছেড়ে অনুত্তমটি গ্রহণ করা (খিলাফে আওলা) সম্ভব, যা তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী ইস্তিগফারের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।"
— [ফিকহুল আকবার, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)]আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মূলনীতি ও আকিদার অন্যান্য সর্বজনমান্য প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলোতেও নবীদের 'ইছমত' (নিষ্পাপতা) এবং ইজতিহাদী 'খতা' বা 'যাল্লাত' (অনৈচ্ছিক পদস্খলন) সম্পর্কে একই সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে:
- ইমাম তাফতাজানী (রহ.) [শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ]: নবীগণ ওহী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এবং কবিরা বা ঘৃণ্য গুনাহ থেকে সর্বসম্মতিক্রমে মাসুম। ইচ্ছাকৃতভাবে ছগীরা বা ছোট গুনাহও তাঁদের থেকে প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়। তবে অনৈচ্ছিক ভুলবশত (খতা ও যাল্লাত হিসেবে) ছগীরা বিষয় ঘটে যাওয়া সম্ভব, যা ঘটে যাওয়া মাত্রই আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে সংশোধন করে দেন।
- ইমাম ইবনে আবিল ইযয আল-হানাফী (রহ.) [শারহুল আকীদাতিল তহাবিয়্যাহ]: জুমহুর (অধিকাংশ) উলামায়ে কেরাম ও সালাফদের মতে, নবীরা রেসালাত পৌঁছানো ও কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। তবে তাঁদের থেকে অনিচ্ছাকৃত পদস্খলন (যাল্লাত) বা ইজতিহাদী খতা হওয়া সম্ভব, যা হওয়ার সাথে সাথেই ওহীর মাধ্যমে সংশোধন করে তাঁদের ইস্তিগফারের তৌফিক দেওয়া হয়।
- ইমাম কাযী ইয়াজ (রহ.) [আল-শিফা] & মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) [শরহু শাফা]: নবীগণের পদস্খলন (যাল্লাত) এবং অনিচ্ছাকৃত ভুল (খতা) সাধারণ মানুষের পাপের মতো নয়। এটি মূলত 'খিলাফে আওলা' (সর্বোত্তমটি ছেড়ে অনুত্তমটি গ্রহণ)। নবীদের সুউচ্চ মর্যাদার সাপেক্ষে আল্লাহ তাআলা এই সামান্য ইজতিহাদী বিচ্যুতিকেও 'ذَنب' (ত্রুটি) শব্দে উল্লেখ করেছেন এবং সেটির জন্য ইস্তিগফার করার হেদায়েত দিয়েছেন।
- শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) [মাজমুউল ফাতাওয়া]: সমগ্র উম্মতের সালাফ ও আলিমগণ একমত যে, নবীরা রেসালাতের প্রচার এবং কবিরা গুনাহ থেকে মাসুম। তবে ইজতিহাদী বিষয়ে তাঁদের থেকে 'খতা' হতে পারে, যার ওপর তাঁদের বহাল রাখা হয় না; বরং ওহীর মাধ্যমে সত্য স্পষ্ট করে দেওয়া হয়।
অতএব, সার্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাওলানা মওদূদীর বক্তব্যটি ধ্রুপদী মুফাসসিরদের তাফসির কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুরো লেখা পাঠ না করে বিচ্ছিন্ন বাক্য ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণার পরিচয় বহন করে না। এই জাতীয় অপপ্রচারের বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন আমাদের নিবন্ধ মওদূদীবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও যাচাই নীতি।
একটি সাধারণ সংশয় ও তার স্পষ্ট জবাব:
প্রশ্ন: নবুয়তের দায়িত্ব পালনে 'কোতাহী' (কমতি) বা 'ইজতিহাদী ভুল' মানলে কি রেসালাতের দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায় না?
উত্তর: মোটেই নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহ তাআলার সোপর্দ করা রেসালাতের অর্পিত দায়িত্ব ১০০% আমানতদারিতার সাথে পূর্ণ করেছেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অসীম শান, অজস্র নিয়ামত ও আজমতের হকের তুলনায় কোনো সৃষ্টি বা বান্দার পক্ষেই পূর্ণাঙ্গ শুকরিয়া বা হক পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব নয়। তাই তাফসিরবিদগণ স্পষ্ট করেছেন যে, এখানে দায়িত্বের অসম্পূর্ণতা বোঝানো হয়নি; বরং বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তেও মন থেকে অহংকার দূর করে মহান আল্লাহর অসীম শানের সামনে পরম বিনয়, দাসত্ব ও শিষ্টাচার (আদব) প্রকাশের শিক্ষাই প্রদান করা হয়েছে।
পাঠক ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান:
যদি 'অনভিপ্রেত বা ইজতিহাদী ভুল-ত্রুটি' শব্দের কারণে মাওলানা মওদূদীর আকিদা খারাপ হয়ে যায়, তবে জুমহুর (অধিকাংশ) ফুকাহা ও মুফাসসিরীন—যাঁরা একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন—তাদের আকিদা সম্পর্কে আমরা কী বলব?
বাস্তবতা হলো, এটি আকিদাগত কোনো বিচ্যুতি নয়; বরং কোনো লেখকের পুরো বই বা প্রেক্ষাপট না পড়ে, মূল লেখা থেকে দুই-একটি বাক্য বিচ্ছিন্নভাবে (Out of context) কেটে নিয়ে ট্রোল বা সমালোচনা করার একটি অপসংস্কৃতি।
তাই বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে আমাদের উচিত:
- মূল উৎস বা প্রাইমারি সোর্স থেকে নিজে পড়ে সত্যতা যাচাই করা।
- কারো ব্যক্তিগত ভুল থাকলে তা সংশোধন করা, কিন্তু ঢালাওভাবে আকিদাভ্রষ্ট ট্যাগ না দেওয়া।
- অহেতুক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করে উম্মাহর মধ্যকার ঐক্য ও সহনশীলতা বজায় রাখা।
সিরিজের অন্যান্য পর্ব ও সম্পর্কিত আর্টিকেল:
উপসংহার
মাওলানা মওদূদী (র.)-এর তাফসির পাঠ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, তিনি নবীজি (সা.)-এর নবুওয়াত বা মাসুম হওয়ার আকিদাকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি উম্মতের শিক্ষা, দায়িত্ব পালনের বিনয় এবং আল্লাহর হকের সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতার দিকটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।
যেকোনো তাফসিরি আলোচনাকে বিচার করার ক্ষেত্রে মূল লেখকের বক্তব্য ও সার্বিক প্রেক্ষাপট বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আকিদাগত অবস্থান ও সাধারণ শব্দচয়নের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করতে পারলে অনভিপ্রেত বিতর্ক এড়ানো সম্ভব। তাই আমাদের উচিত নিরপেক্ষভাবে সঠিক তথ্য জানা, যেকোনো ভুল বর্জন করা এবং গবেষণাধর্মী মনোভাব নিয়ে সত্য অনুসন্ধান করা।
তথ্যসূত্রসমূহ (যাচাইকৃত):
- তাফহীমুল কুরআন, আবুল আলা মওদূদী (রহ:)।
- আল-কামালাইন শরহে তাফসিরে জালালাইন (ব্যাখ্যাগ্রন্থ)।
- তাফসীরে কাবীর, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী (রহ:)।
- তাফসীরে মাজহারি, আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.)।
- তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন, মুফতি ত্বাকি উসমানী।
- মারেফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)।
- তাফসিরে জালালাইন, জালালুদ্দিন সূয়তী (রহ.) ও জালালুদ্দিন মহল্লী (রহ)।
- তাওযীহুল কুরআন, শায়খ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ।
- তাফসিরুল কুরআন, আসাদুল্লাহ গালিব।
- তাফসিরে ফাতহুল মাজিদ, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী।
- সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ১৯।
- সূরা ফাতহ, আয়াত ২।
- আহসানুল বায়ান, আল্লামা হাফেজ সালাহুদ্দিন ইউসুফ (রহ.)।
- সহীহ বুখারী: ৭৪৪, ৪৮৩৬, ৪৯৬৮, ৬৩০৭।
- সহীহ মুসলিম: ২৭০২, ২৮১৯, ৪৮৪, ৫৯৮।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) — আল-ফিকহুল আকবার (الفقه الأكبر)।
- ইমাম তাফতাজানী (রহ.) — শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ (شرح العقائد النسفية)
- ইমাম ইবনে আবিল ইযয আল-হানাফী (রহ.) — শারহুল আকীদাতিল তহাবিয়্যাহ (شرح العقيدة الطحاوية)
- ইমাম কাযী ইয়াজ (রহ.) — আল-শিফা বি-তারীফি হুকুকিল মুস্তফা (الشفا بتعريف حقوق المصطفى)
- মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) — শরহু শাফা (شرح الشفاء)
- শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) — মাজমুউল ফাতাওয়া (مجموع الفتاوى – আকিদা অধ্যায়)।