Mastodon
haqqfinder logo refined transparent

সফরের দোয়া: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, তাজবীদ, ফজিলত ও বিকল্প দোয়াসমূহ

Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads

Disclosure: HaqqFinder is reader-supported. When you buy through links on our site, we may earn an affiliate commission at no extra cost to you. learn more

সফরের দোয়া যানবাহনে উঠার দোয়া

মানবজীবনে ভ্রমণ বা সফর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সফর ছোট হোক কিংবা দীর্ঘ, যাত্রার সূচনায় মহান আল্লাহর স্মরণে দোয়া পাঠ করা সুন্নাত। এটি যেমন সফরের প্রতিটি পদে আল্লাহর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তেমনি যাত্রা শেষে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত বান্দাকে সব ধরনের দুর্ঘটনা ও অপছন্দনীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখে।

আজকের ব্লগে আমরা সফরের মূল দোয়া, এর সঠিক উচ্চারণ, তাজবীদ, বাংলা অর্থ, ফজিলত, সুন্নাহসম্মত নিয়ম এবং অন্যান্য বিকল্প মাসনুন দোয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সফরের মূল দোয়া (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)

যানবাহনে আরোহণ করে যাত্রা শুরুর পর এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাত।

আরবি পাঠ:

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

বাংলা উচ্চারণ:

সুবহানাল্লাযী সাখখারা লানা হাযা ওয়া মা কুন্না লাহূ মুক্বরিনীন, ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনক্বালিবূন।

বাংলা অর্থ:

“পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি এগুলোকে (যানবাহন) আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।”

তাজবীদ ও শুদ্ধ উচ্চারণের নিয়ম

সঠিক অর্থ ও সওয়াব বজায় রাখতে তাজবীদ অনুযায়ী দোয়া পাঠ করা আবশ্যক:

  • মাদ্দ (দীর্ঘ স্বর): الَّذِي (আল্লাযী), فِي (ফী), এবং لَمُنْقَلِبُونَ (লামুনক্বালিবূন)-এর ক্ষেত্রে ১ আলিফ পরিমাণ (স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ সময়) টেনে পড়তে হবে।
  • ইখফা ও ওয়াজিব গুনন্নাহ:
    • كُنَّا (কুন্না) শব্দে নূন মুশাদ্দাদে ওয়াজিব গুনন্নাহ করতে হবে।
    • لَمُنْقَلِبُونَ (লামুনক্বালিবূন) শব্দে নূন সাকিনের পর ক্বাফ (ق) আসায় ইখফা হবে, অর্থাৎ নূন-এর শব্দটিকে নাকের বাঁশিতে গোপন করে গুনন্নাহসহ পড়তে হবে।
  • ক্বলক্বলাህ (প্রতিধ্বনি): مُقْرِنِينَ (মুক্বরিনীন)-এ ক্বাফ (ق) সাকিন থাকায় ক্বলক্বলা অর্থাৎ ধাক্কা দিয়ে বা প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে উচ্চারণ করতে হবে।
  • মাখরাজ (উচ্চারণস্থান):
    • ذ (যাল) বর্ণটি জিভের ডগা ওপরের দাঁতের ডগার সাথে লাগিয়ে নরমভাবে উচ্চারণ করতে হবে, যাতে ‘জ’ বা ‘য’-এর মতো শক্ত না শোনায়।
    • ح (হা) বর্ণটি হলকের (কণ্ঠনালীর) মধ্যখান থেকে উচ্চারণ করতে হবে।

সফর ও সফর দোয়ার ফজিলত

সফরের দোয়ার মধ্যে রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রভূত কল্যাণ:

  • আল্লাহর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা: যানবাহন ও যাতায়াতের আধুনিক মাধ্যমে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সফরের দোয়া পাঠের মাধ্যমে সফরকারী বান্দা আল্লাহর খাস হেফাজতে চলে যায়।
  • মুসাফিরের দোয়া কবুল হওয়া: সফরের অবস্থায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করলে তা ফেরত দেওয়া হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়; তার মধ্যে অন্যতম হলো মুসাফির বা সফরকারীর দোয়া।
  • আখেরাতের স্মরণ: দোয়ার শেষ অংশ— “আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী”— বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই দুনিয়ার সফর যেমন একদিন শেষ হবে, তেমনি মূল সফর আখেরাতের দিকে।

হাদিস ও কুরআনের আলোকে রেফারেন্স

সফরের এই দোয়াটি সরাসরি পবিত্র কুরআন থেকে গৃহীত এবং তা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

১. পবিত্র কুরআনের প্রমাণ

সূরা আল-যুখরুফ-এর ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যানবাহনে ওঠার পর এই দোয়া পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন:

“যাতে তোমরা তাদের পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের রবের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা তার ওপর স্থির হয়ে বস এবং বল: ‘পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন…'”

— [সূরা আল-যুখরুফ: ১৩-১৪]

২. সহীহ হাদিসের প্রমাণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই সফরে বের হতেন এবং সওয়ারিতে (যানবাহনে) পা রাখতেন, তখন তিনি তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করতেন এবং এই দোয়াটি পড়তেন।

  • মূল গ্রন্থ: সহীহ মুসলিম
  • হাদিস নম্বর: ১৩৪২ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ৩০৯৫)
  • বর্ণনাকারী: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)
  • হাদিসের মান: সহীহ (পরম বিশুদ্ধ)

হাদিসটিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) উটের রিকাবে পা রেখে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতেন, পিঠে সোজা হয়ে বসে ৩ বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং তারপর উপরোক্ত দোয়াটি তিলাওয়াত করতেন।

সফল ও নিরাপদ সফরের অন্যান্য মাসনুন নিয়ম

  1. বিসমিল্লাহ বলে আরোহণ করা: যানবাহনে পা রাখার সময় বিসমিল্লাহ বলা।
  2. তাকবীর ও তাসবীহ পাঠ: সফরে ওঠানামা করার সময়— ওপরের দিকে ওঠার সময় আল্লাহু আকবার এবং নিচের দিকে নামার সময় সুবহানাল্লাহ বলা সুন্নাত।
  3. গন্তব্যে পৌঁছানোর দোয়া: সফর শেষে নিজ শহরে বা ঘরে ফেরার সময় বলা:آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ(আ-ইবূনা তা-ইবূনা ‘আ-বিদূনা লিরাব্বিনা হা-মিদূন)অর্থ: “আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, আমাদের রবের ইবাদতকারী এবং তাঁর প্রশংসাকারী।” (সহীহ মুসলিম: ১৩৪২)

যাত্রা ও সফর সংক্রান্ত অন্যান্য মাসনুন দোয়া

যানবাহনে ওঠার প্রধান দোয়াটি ছাড়াও যাত্রা শুরুর সময় এবং সফর অবস্থায় পড়ার মতো বেশ কয়েকটি মাসনুন ও বিকল্প দোয়া হাদিসে বর্ণিত রয়েছে:

১. বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়া

সফরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ই এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত। এটি পাঠ করলে সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে আল্লাহর নিরাপত্তা লাভ হয়।

  • আরবি:بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
  • উচ্চারণ:বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু ‘আলাল্লাহ, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
  • অর্থ:“আল্লাহর নামে বের হচ্ছি, আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ থেকে বাঁচার এবং সৎকাজ করার কোনো শক্তি কারও নেই।”
  • রেফারেন্স:সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৫, সুনানে তিরমিযী: ৩৪২৬ (হাসান/সহীহ)। হাদিসে এসেছে, এটি পড়লে ফেরেশতারা বলেন, “তোমার জন্য এটি যথেষ্ট, তুমি সুরক্ষা পেলে।”

২. সফরের সার্বিক কল্যাণ ও কষ্ট থেকে আত্মরক্ষার দোয়া

নবী কারীম (সা.) প্রধান দোয়াটি পাঠ করার পর সফর সহজ হওয়া এবং যাত্রাপথের কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য এই অংশটুকু যুক্ত করে দোয়া করতেন:

  • আরবি:اَللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اَللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ، اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالْأَهْلِ
  • উচ্চারণ:আল্লাহুম্মা হাওউইন ‘আলাইনা সাফারানা হাযা ওয়াতবি ‘আন্না বু‘দাহু; আল্লাহুম্মা আন্তাস স্বাহিবু ফিস সাফারি ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলি; আল্লাহুম্মা ইন্নী আ’উযু বিকা মিন ওয়া‘ছা-ইস সাফারি ওয়া কাআবাতিল মানযারি ওয়া সূ-ইল মুনক্বালাবি ফিল মা-লি ওয়াল আহল।
  • অর্থ:“হে আল্লাহ! আমাদের জন্য এই সফরকে সহজ করে দিন এবং এর দূরত্বকে কমিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনিই সফরে আমাদের সাথি এবং পেছনে রেখে আসা পরিবারের তত্ত্বাবধানকারী। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সফরের ক্লান্তি-কষ্ট, দুঃখজনক দৃশ্য দেখা এবং পরিবার ও ধন-সম্পদে কোনো খারাপ পরিণতি হওয়া থেকে আশ্রয় চাই।”
  • রেফারেন্স:সহীহ মুসলিম: ১৩৪২।

৩. মুসাফিরের জন্য বিদায় জানানোর দোয়া

সফরে যাওয়ার সময় কোনো স্বজন বা বন্ধুকে বিদায় জানানোর সময় অথবা নিজে বিদায় নেওয়ার সময় এই দোয়া পাঠ করা সুন্নাত:

  • আরবি:أَسْتَوْدِعُ اللَّهَ دِينَكَ وَأَمَانَتَكَ وَخَوَاتِيمَ عَمَلِكَ
  • উচ্চারণ:আস্তাওদি‘উল্লাহ দ্বীনাকা ওয়া আমানাতাকা ওয়া খাওয়া তীমা ‘আমালিক।
  • অর্থ:“আমি আল্লাহর কাছে আমানত রাখছি আপনার দ্বীন, আপনার আমানতদারী এবং আপনার শেষ আমলসমূহকে।”
  • রেফারেন্স:সুনানে আবু দাউদ: ২৬০০, সুনানে তিরমিযী: ৩৪৪২ (সহীহ)।

৪. নতুন কোনো শহর বা লোকালয়ে প্রবেশের দোয়া

সফর করতে করতে পথিমধ্যে কোনো গ্রাম, শহর বা নতুন গন্তব্যে পৌঁছালে নবীজি (সা.) এই দোয়াটি পাঠ করতেন:

  • আরবি:أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
  • উচ্চারণ:আ’ঊযু বিকালিমা-তিল্লাহিত তা-ম্মা-তি মিন শাররি মা খালাক্ব।
  • অর্থ:“আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্যসমূহের অসিলায় তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।”
  • রেফারেন্স:সহীহ মুসলিম: ২৭০৮। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি নতুন কোনো স্থানে নেমে এই দোয়া পড়ে, স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারে না।

শেষ কথা

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল মুমিন মুসলমানকে ভ্রমণের সময় সুন্নাত মেনে দোয়া পাঠ করার এবং নিরাপদ সফর লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন:

Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads

Affiliate Disclosure: HaqqFinder.com is a participant in various affiliate marketing programs. This means we may earn a small commission when you click on or make purchases through links provided in our articles, at no extra cost to you. These commissions help support the maintenance and content creation of this site. We only recommend tools, books, and services that we thoroughly evaluate and believe are helpful to our audience.

মন্তব্য করুন

Login

Fill out the form below, and we will be in touch shortly.