Mastodon

কুরআন খতমের দোয়া: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, তাজবীদসহ ফজিলত ও পড়ার নিয়ম

Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads
কুরআন খতমের দোয়া বাংলা আরবি উচ্চারণ সহ

পবিত্র কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহর কালাম। এর প্রতিটি হরফ পাঠে রয়েছে ১০টি করে নেকি। আর সম্পূর্ণ কুরআন খতম করা একজন মুমিনের জীবনে অত্যন্ত আনন্দ ও বরকতের মুহূর্ত। কুরআন খতমের পর দোয়া কবুলের এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।

সূচীপত্র

আজকের ব্লগে আমরা জানবো কুরআন খতমের দোয়া, এর বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, পড়ার সঠিক নিয়ম এবং এর অশেষ ফজিলত সম্পর্কে।

কুরআন খতমের পর দোয়া কবুলের ফজিলত

কুরআন খতমের পর আল্লাহ তাআলার দরবারে করা দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়।

  • ফেরেশতাদের দোয়া: হাদিস শরিফে এসেছে, যখন কোনো বান্দা কুরআন খতম করে, তখন হাজার হাজার ফেরেশতা তার মাগফিরাত ও রাহমাতের জন্য দোয়া করতে থাকেন।
  • দোয়া কবুলের বিশেষ সময়: হযরত আনাস (রা.) যখন কুরআন খতম করতেন, তখন তিনি নিজ পরিবার ও সন্তানদের একত্র করে বিশেষ দোয়া করতেন, কারণ এই সময়ে রহমত নাজিল হয়।

কুরআন খতমের প্রচলিত মূল দোয়া (আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ)

কুরআন খতম শেষে বিভিন্ন দোয়ায় মাছুরাহ ও সালাফদের প্রচলিত দোয়া পড়া যায়। নিচে সবচেয়ে বহুল পঠিত ও অর্থবহ দোয়াটি উপস্থাপন করা হলো:

আরবি পাঠ:

اَللَّهُمَّ ارْحَمْنِي بِالْقُرْآنِ، وَاجْعَلْهُ لِي إِمَامًا وَنُورًا وَهُدًى وَرَحْمَةً، اَللَّهُمَّ ذَكِّرْنِي مِنْهُ مَا نَسِيتُ، وَعَلِّمْنِي مِنْهُ مَا جَهِلْتُ، وَارْزُقْنِي تِلَاوَتَهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ، وَاجْعَلْهُ لِي حُجَّةً يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ।

বাংলা উচ্চারণ:

আল্লাহুম্মার হামনী বিল কুরআন, ওয়াজ‘আলহু লী ইমামাওঁ ওয়া নূরাওঁ ওয়া হুদাওঁ ওয়া রাহমাহ। আল্লাহুম্মা যাক্কিরনী মিনহু মা নসীতু, ওয়া ‘আল্লিমনী মিনহু মা জাহিলতু, ওয়ারযুক্বনী তিলাওয়াতাহূ আনা-আল্লাহলি ওয়া আত্বরাফান নাহার, ওয়াজ‘আলহু লী হুজ্জাতাঁই ইয়া রাব্বাল ‘আলামীন।

বাংলা অর্থ:

“হে আল্লাহ! কুরআনের বারাকাত ও ওসিলায় আমার ওপর রহম করুন। কুরআনকে আমার জন্য পথপ্রদর্শক, নূর (আলো), হেদায়েত ও রহমত বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! কুরআনের যে বিষয়গুলো আমি ভুলে গেছি তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিন, আর যা আমি জানি না তা আমাকে শিক্ষা দিন। দিন ও রাতে আমাকে এটি তিলাওয়াত করার তাওফিক দিন। আর হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! এই কুরআনকে (কিয়ামতের দিন) আমার পক্ষে প্রমাণ ও নাজাতের মাধ্যম বানিয়ে দিন।”

তাজবীদ ও শুদ্ধ উচ্চারণের নির্দেশনা

কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া পাঠে তাজবীদ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে অর্থের কোনো পরিবর্তন না ঘটে:

  1. ইদগাম ও গুনন্নাহ:
    • إِمَامًا وَنُورًا (ইমামাওঁ ওয়া নু-রাঁও) — এখানে তনবীনের পর ‘ওয়াও’ আসার কারণে মিলিয়ে গুনন্নাহসহ পড়তে হবে।
    • حُجَّةً يَا (হুজ্জাতাঁই ইয়া) — তনবীনের পর ‘ইয়া’ আসায় ইদগামে বা-গুনন্নাহ হবে।
  2. মাদ্দ (দীর্ঘস্বর):
    • الْقُرْآنِ (আল-কুরআন) এবং الْعَالَمِينَ (আল-‘আলামীন) উচ্চারণ করার সময় শেষের দিকে ৩ আলিফ পরিমাণ টেনে পড়তে হবে।
  3. মাখরাজ (উচ্চারণস্থান):
    • ح (হা) বর্ণটি কণ্ঠনালীর মধ্যখান থেকে পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করতে হবে, যাতে সাধারণ ‘হ’ এর সাথে মিলে না যায়।
    • ع (আইন) বর্ণটি কণ্ঠনালীর মাঝখান থেকে চেপে উচ্চারণ করতে হবে।

কুরআন খতম করার ও দোয়া পড়ার সঠিক নিয়ম

  1. সূরা নাস-এর পর প্রথম ৫ আয়াত পড়া: কুরআন তিলাওয়াত শেষ করে সূরা নাস পড়ার পর পুনরায় সূরা বাক্বারা-র প্রথম ৫ আয়াত (আলিফ-লাম-মীম…) এবং সূরা ফাতেহা পাঠ করা মুস্তাহাব। একে হাদিসের ভাষায় “আল-হাল্লু ওয়ার রাহেল” (ভ্রমণ শেষ করে পুনরায় যাত্রা শুরু করা) বলা হয়।
  2. পরিবারকে সাথে নেওয়া: সম্ভব হলে পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের সাথে নিয়ে একত্রে দোয়া করা উত্তম।
  3. কিবলামুখী হয়ে হাত তোলা: খতম শেষে অযু অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে বিনয়ের সাথে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মুনাজাত করা।
  4. হামদ ও দরূদ পাঠ: দোয়ার শুরুতে আল্লাহর হামদ (প্রশংসা) এবং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরূদ পাঠ করা ও শেষে দরূদ দিয়ে দোয়া শেষ করা।

এই দোয়াটি কি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত? 

কুরআন খতমের পর বহুল পঠিত এই দোয়াটি (اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي بِالْقُرْآنِ...) সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।

নিচে এর হাদিসভিত্তিক স্থিতি এবং সহীহ হাদিসের আলোকে কুরআন খতম ও দোয়ার ফজিলত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:

১. দোয়াটির হাদিসভিত্তিক অবস্থান

  • উৎস ও সনদের মান: এটি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত কোনো সহীহ মারফু হাদিস নয়।
  • মূল রেফারেন্স: আল্লামা বকর আবু যাইদ (র.) তাঁর ‘মারভিয়্যাতু দুআ-ই খাতমিল কুরআন’ (مرويات دعاء ختم القرآن) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই দোয়াটি বেশ কিছু সময় ধরে ছাপানো মুসহাফ বা কুরআনের শেষে মুদ্রিত হয়ে আসছিল এবং অনেকে এটি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (র.)-এর দিকে নিসবত (সম্পর্কিত) করতেন। তবে এটি রাসূলুল্লাহ (সা.) বা ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ—কারো সাথেই কোনো প্রমাণিত সনদে বা সূত্রে প্রমাণিত নয়।
  • শারয়ী অবস্থান: শেখ ইবনে বাজ (র.) সহ প্রধান প্রধান মুহাদ্দিসগণের মতে, এই দোয়ার শব্দমালা ও অর্থ অত্যন্ত সুন্দর ও শরীয়াহসম্মত হওয়ায় তা পাঠ করা জায়েজ, তবে একে “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা নির্দিষ্ট দোয়া” মনে করা যাবে না।
  • মূল উৎস: এটি মূলত পরবর্তী যুগের আলেম ও সালাফদের (পূর্বসূরিদের) চয়ন করা একটি অর্থবহ ও সুন্দর দোয়া। যেহেতু এর অর্থ শরীয়তের মূলনীতির সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ (কুরআনের মাধ্যমে রহমত, হেদায়েত ও আলো চাওয়া), তাই আলেমগণ কুরআন খতমের পর এই দোয়াটি পড়া জায়েজ ও উত্তম মনে করেন।

২. সহীহ হাদিসের আলোকে কুরআন খতমের ফজিলত

কুরআন খতমের নির্দিষ্ট কোনো বাঁধাধরা দোয়া সহীহ হাদিসে না থাকলেও, কুরআন খতম করা এবং খতমের পর দোয়া করার বিশেষ ফজিলত সহীহ ও হাসান সনদের হাদিস এবং সাহাবিদের আমল দ্বারা সুপ্রমাণিত:

ক. কুরআন খতমের পর দোয়া কবুল হওয়া ও সাহাবিদের আমল

i. হযরত আনাস (রা.)-এর আমল

মূল আরবি পাঠ ও বর্ণনা:عَنْ ثَابِتٍ الْبُنَانِيِّ، قَالَ: «كَانَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ إِذَا خَتَمَ الْقُرْآنَ جَمَعَ وَلَدَهُ وَأَهْلَ بَيْتِهِ فَدَعَا لَهُمْ»(ছাবিত আল-বুনানী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) যখন কুরআন খতম করতেন, তখন তিনি তাঁর সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের একত্র করতেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করতেন।)

মূল গ্রন্থ: সুনানে আদ-দারিমী (سنن الدارمي), হাদিস নম্বর: ৩৪২৪।

সনদ ও মান: সনদের দিক থেকে এটি ‘হাসান’ (ভালো/গ্রহণযোগ্য) পর্যায়ের।

ii. তাবেঈদের আমল ও উক্তি
  • মূল গ্রন্থ: আল-মুসান্নাফ – ইবনে আবী শাইবাহ (مصنف ابن أبي شيبة), বর্ণনাক্রম: ৩০৫৯১ ও ৩০৫৯২।
  • সনদ: তাবেঈ মুজাহিদ ইবনে জাবর (র.) থেকে বিশুদ্ধ (সহীহ) সূত্রে বর্ণিত।
  • বর্ণনা: মুজাহিদ (র.) বলেন, কুরআন খতমের সময় আল্লাহর রহমত নাজিল হয়, তাই সালাফগণ (পূর্বসূরিগণ) কুরআন খতমের মজলিসে উপস্থিত হওয়া পছন্দ করতেন।

৩. কুরআন খতম ও তিলাওয়াতের ফজিলতের সহীহ হাদিসসমূহ

ক. কিয়ামতের দিন কুরআনের সুপারিশ

  • মূল গ্রন্থ: সহীহ মুসলিম (صحيح مسلم), হাদিস নম্বর: ৮০৪ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ১৭৫৬)।
  • সনদের মান: সহীহ (পরম বিশুদ্ধ)।
  • রাবী (বর্ণনাকারী): হযরত আবু উমামাহ আল-বাহিলী (রা.)।
  • শব্দাবলী:اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ (তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো; কারণ কিয়ামতের দিন এটি তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে।)

খ. ‘কুরআনের লোক’ আল্লাহর খাস বান্দা

  • মূল গ্রন্থ: সুনানে ইবনে মাজাহ (سنن ابن ماجه), হাদিস নম্বর: ২১৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর: ১২২৩৪।
  • সনদের মান: সহীহ (ইমাম আলবানী ‘সহীহ ইবনে মাজাহ’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)।
  • রাবী (বর্ণনাকারী): হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)।
  • শব্দাবলী:إِنَّ لِلَّهِ أَهْلِينَ مِنَ النَّاسِ … أَهْلُ الْقُرْآنِ هُمْ أَهْلُ اللَّهِ وَخَاصَّتُهُ(মানুষের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর আপনজন… কুরআনের সাথীরাই হলো আল্লাহর আপনজন এবং তাঁর খাস বান্দা।)

গ. অন্তরের প্রশান্তির জন্য সহীহ সূত্রে বর্ণিত দোয়া

  • মূল গ্রন্থ: মুসনাদে আহমাদ (مسند أحمد), হাদিস নম্বর: ৩৭১২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নম্বর: ৯৭২।
  • সনদের মান: সহীহ (ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এবং আল্লামা আলবানী একে সহীহ বলেছেন)।
  • রাবী (বর্ণনাকারী): হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
  • দোয়ার অংশ:… أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجَلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي(…আপনি কুরআনকে বানিয়ে দিন আমার অন্তরের বসন্ত, আমার বক্ষের জ্যোতি, আমার বিষাদ দূরীকরণের উপায় এবং চিন্তাভাবনা দূর করার মাধ্যম।)

কুরআন খতমের প্রচলিত দোয়ার বিকল্প দোয়াসমূহ

১. মাসনুন দোয়া (সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষাদ, দুশ্চিন্তা ও অন্তরের প্রশান্তির জন্য এই দোয়াটি শিখিয়েছেন। কুরআন খতম শেষে পড়ার জন্য এটি অন্যতম সেরা ও অর্থবহ বিকল্প:

আরবি পাঠ:

اَللَّهُمَّ اجْعَلِ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجَلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي।

বাংলা উচ্চারণ:

আল্লাহুম্মাজ‘আলিল কুরআনা রবী‘আ ক্বালবী, ওয়া নূরা সদরী, ওয়া জালা-আ হুযনী, ওয়া যাহাবা হাম্মী।

অর্থ:

“হে আল্লাহ! কুরআনকে বানিয়ে দিন আমার অন্তরের বসন্ত, আমার বক্ষের জ্যোতি, আমার বিষাদ দূরীকরণের উপায় এবং দুশ্চিন্তা দূর করার মাধ্যম।”

— [মুসনাদে আহমাদ: ৩৭১২, সহীহ]

২. কুরআনে বর্ণিত মাছূর দোয়া (কুরআনের দোয়া)

কুরআন তিলাওয়াত বা খতম শেষে কুরআনেরই কিছু চমৎকার দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত উত্তম ও সওয়াবের কাজ:

ক. আমল কবুলিয়াতের দোয়া (সূরা আল-বাকারা: ১২৭)

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ – وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

উচ্চারণ: রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আনতাস সামী‘উল ‘আলীম। ওয়া তুব ‘আলাইনা ইন্নাকা আনতাত তাওয়াবুর রাহীম।

অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে (এই তিলাওয়াত ও আমল) কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। আর আমাদের ক্ষমা করুন, নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।”

খ. দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের দোয়া (সূরা আল-বাকারা: ২০১)

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা ‘আযাবান নার।

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।”

গ. ইমান দৃঢ় রাখার দোয়া (সূরা আলে-ইমরান: ৮)

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

উচ্চারণ: রাব্বানা লা তুযিগ ক্বুলূবানা বা‘দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুঙ্কা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।

অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে সত্যচ্যুত করবেন না এবং আপনার কাছ থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহা দাতা।”

৩. সালাফ ও আলেমদের সুনির্দিষ্ট বিকল্প সংকলন

প্রচলিত দোয়ার বিকল্প হিসেবে বিখ্যাত আলেম আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (র.) ও অন্যান্য সালাফগণ নিচের সার্বিক দোয়াটি পাঠ করতেন:

আরবি পাঠ:

اَللَّهُمَّ انْفَعْنَا وَارْفَعْنَا بِالْقُرْآنِ الْعَظِيمِ، اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِمَّنْ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ فَيَرْتَقِي، وَلَا تَجْعَلْنَا مِمَّنْ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ فَيَشْقَى، اَللَّهُمَّ ارْزُقْنَا تِلاَوَتَهُ عَلَى النَّحْوِ الَّذِي يُرْضِيكَ عَنَّا।

বাংলা উচ্চারণ:

আল্লাহুম্মানফা‘না ওয়ারফা‘না বিল কুরআনিল ‘আজীম। আল্লাহুম্মাজ‘আলনা মিম্মাঁই ইয়াক্বরাউল কুরআনা ফায়ারতাক্বী, ওয়া লা তাঝ‘আলনা মিম্মাঁই ইয়াক্বরাউল কুরআনা ফায়াশক্বা। আল্লাহুম্মারযুক্বনা তিলাওয়াতাহূ ‘আলান নাহউইল্লাযী ইউরদীক্বা ‘আন্না।

অর্থ:

“হে আল্লাহ! মহান কুরআনের মাধ্যমে আমাদের উপকৃত করুন এবং আমাদের মর্যাদাকে উন্নত করুন। হে আল্লাহ! আমাদের সেই সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা কুরআন পাঠ করে মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে; আর তাদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না যারা কুরআন পাঠ করেও (আমল না করার কারণে) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হে আল্লাহ! আমাদের এমনভাবে কুরআন তিলাওয়াতের তাওফিক দিন যা আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হয়।”

৪. নিজ ভাষায় সাধারণ কিন্তু পূর্ণাঙ্গ দোয়া

দোয়া করার সবচেয়ে মূল বিষয় হলো অন্তরের আকুতি ও বিনয়। আরবি না জানলে বা মুখস্থ না থাকলে নিজের মাতৃভাষাতেও সুন্দরভাবে দোয়া করতে পারেন:

“হে আল্লাহ! আমি যে কুরআন খতম করলাম, এতে আমার কোনো ভুলত্রুটি, উচ্চারণ বা তাজবীদে ত্রুটি থাকলে তা আপনার নিজ গুণে ক্ষমা করে দিন। এই তিলাওয়াতকে কবুল করে এর সওয়াব প্রিয় নবীজি (সা.)-এর রূহ মোবারকে এবং আমার পিতামাতা ও সকল ঈমানদারের কাছে পৌঁছে দিন। হে আল্লাহ! এই কুরআনকে আমার জীবনের হেদায়েতের আলো বানিয়ে দিন, কবরের আজাব থেকে রক্ষার মাধ্যম করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশকারী বানিয়ে দিন। আমিন।”

কুরআন খতমের পর কীভাবে দোয়া করবেন?

যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো বাক্য রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে নির্ধারিত নেই, তাই সুন্নাহসম্মত নিয়ম হলো:

  1. যেকোনো ভালো দোয়া করা: নিজের ভাষায় বা কুরআন-হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য সহীহ ও গ্রহণযোগ্য দোয়ার মাধ্যমে নিজের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ চাওয়া।
  2. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো বিখ্যাত দোয়া: যেমন— اللَّهُمَّ اجْعَلِ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجَلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي (হে আল্লাহ! কুরআনকে বানিয়ে দিন আমার অন্তরের বসন্ত, আমার বক্ষের জ্যোতি, আমার দুঃখ দূরীকরণের উপায় এবং চিন্তাভাবনা দূর করার মাধ্যম।)— [মুসনাদে আহমাদ: ৩৭১২, সহীহ]
  3. পরিবারসহ দোয়া করা: হযরত আনাস (রা.)-এর অনুসরণে পরিবারকে সাথে নিয়ে আল-হামদুলিল্লাহ ও দরূদ শরীফ পাঠপূর্বক হাত তুলে মুনাজাত করা।

শেষ কথা

কুরআন খতম কেবল একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন নয়, বরং এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার একটি পথ। খতমের দোয়া পাঠের সময় অন্তরে যেন গভীর অনুসূচনা, বিনয় ও আখিরাতের মুক্তি কামনার অনুভূতি থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করার এবং এর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন:

Facebook
X
LinkedIn
Pinterest
Reddit
WhatsApp
Tumblr
Telegram
Threads

মন্তব্য করুন

Login

Fill out the form below, and we will be in touch shortly.